গত বছরের ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতির স্মৃতি এখনও ভুলতে পারেনি বরগুনা-র মানুষ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জেলায় ডেঙ্গুতে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের দাবি, জেলার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও অন্তত ৪৩ জন। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় প্রায় ১০ হাজারে। নতুন করে ডেঙ্গুর মৌসুম ঘনিয়ে এলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম না থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
স্থানীয় বাসিন্দা, চিকিৎসক ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, গত বছরের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বর্ষা শুরুর আগেই মশক নিধন, ড্রেন পরিষ্কার ও জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা থাকলেও জেলার অধিকাংশ এলাকায় কার্যকর প্রস্তুতি চোখে পড়ছে না।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে রয়েছে সদর উপজেলার দক্ষিণ মনসাতলী এলাকা। ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অসংখ্য ডোবা-নালা ও অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে মশার বংশবিস্তার দ্রুত বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহ বলেন, জনসংখ্যা বাড়লেও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা উন্নত হয়নি। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও নতুন ড্রেন নির্মাণ না হওয়ায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
একই এলাকার বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, গত বছর প্রায় প্রতিটি পরিবারেই ডেঙ্গু রোগী ছিল। অথচ এবার এখনো প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। দ্রুত মশক নিধন কার্যক্রম শুরু না হলে পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা তার।
শুধু দক্ষিণ মনসাতলী নয়, বরগুনা পৌর শহরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো, ড্রেন পরিষ্কার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়ছে না।
পৌর শহরের বাসিন্দা মোর্শেদ সুজন বলেন, গত বছরের ভয়াবহ পরিস্থিতির পরও এবারের প্রস্তুতি সন্তোষজনক নয়। ফলে আবারও বরগুনা ডেঙ্গুর হটস্পটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে আমিনুল ইসলাম নাবিল অভিযোগ করেন, প্রশাসনিক এলাকার বাইরে সাধারণ মানুষের বসবাসকারী এলাকাগুলোতে মশক নিধন কার্যক্রম খুব কম দেখা যাচ্ছে। সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব এতটাই বেড়ে যায় যে বাইরে অবস্থান করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর মার্চের পর থেকেই বরগুনায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল-এ প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ জন পর্যন্ত রোগী ভর্তি ছিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দিতে হয়েছিল।
গত বছরের ১৫ জুন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট একটি তদন্ত দল গঠন করে। তদন্ত শেষে তারা জানায়, স্থানীয়দের অসচেতনতা এবং খোলা পাত্রে বৃষ্টির পানি জমে থাকাই ডেঙ্গু বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বরগুনার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৯ হাজার ৭৪৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হন বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে। সরকারি হিসাবে ১৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
চলতি বছরও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত জেলায় ৯১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে কয়েকজন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ বিষয়ে মনির হোসেন কামাল, বরগুনা জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের সভাপতি, বলেন যে বৃষ্টিপাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন বলেন, গত বছরের ভয়াবহ পরিস্থিতির স্মৃতি এখনো মানুষকে আতঙ্কিত করে রাখে। আগাম প্রস্তুতির অভাবে আবারও বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম, বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক, জানান যে ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো এখন অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যেসব এলাকায় গত বছর বেশি সংক্রমণ হয়েছিল, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সজল চন্দ্র শীল, বরগুনা জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পৌর প্রশাসক, জানান যে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য ফগার মেশিন কেনা হয়েছে এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ, বরগুনার সিভিল সার্জন, বলেন যে গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে হাসপাতালগুলোকে আগের চেয়ে বেশি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ল্যাব পরীক্ষার সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগ নয়, সাধারণ মানুষের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং কোথাও পানি জমতে না দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
**”এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৬”**





