ধানের দামে ধস, মাঠের ঘামে ভাসছে হতাশা পটুয়াখালীর হাটে কৃষকের কান্না

Views: 39

ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙে কৃষকের। কাঁধে নেমে আসে বছরের পর বছরের ক্লান্তি, হাতে তুলে নেয় ঘামের ফসল—ধানের বস্তা। আশা থাকে, আজ হয়তো পরিশ্রমের ন্যায্য দাম মিলবে। কিন্তু পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের সাপ্তাহিক ধান হাটে সেই আশাই ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। এখানে ধানের বস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আজ কৃষকের চোখে শুধু হতাশা, মুখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ছায়া।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকাল থেকেই হাটে জড়ো হন শত শত কৃষক। নৌকা, ভ্যান কিংবা কাঁধে করে বস্তাবন্দি ধান নিয়ে তারা অপেক্ষায় থাকেন ক্রেতার। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে একে একে ফিরছেন বিমর্ষ মুখে। বাজারে এক মণ ধানের দাম ঘুরপাক খাচ্ছে মাত্র ১,১০০ থেকে ১,১৫০ টাকার মধ্যে—যেখানে উৎপাদন খরচই উঠে না।

গলাচিপা উপজেলার উলানিয়া এলাকার ষাট বছর বয়সী কৃষক আবু জাফর বলেন, “চাল, তেল, ডাল—সব কিছুর দাম বাড়ছে। কিন্তু ধানের দাম বাড়ছে না। একজন শ্রমিক খাটাতে দিনে ৭০০-৮০০ টাকা দিতে হয়, সঙ্গে তিন বেলা খাবার। এক মণ ধান বিক্রি করেও সেই খরচ ওঠে না। এভাবে চলতে থাকলে কিছুদিন পর আমরা আর খাইতেই পারব না।”

কালাইয়া হাটের আরেক কৃষক কাওসার আলী (৫৬) ভাঙা কণ্ঠে জানান, “এই বছর যে দামে ধান বিক্রি হচ্ছে, তাতে লাভ তো দূরের কথা, খরচই ওঠে না। ১,১৫০ টাকায় এক মণ ধান বিক্রি করে কী হবে? যদি এমন চলতে থাকে, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই জমি বিক্রি করে খেতে হবে।”

হাটে ঘুরে দেখা যায়, সারি সারি ধানের বস্তা। কেউ বসে আছেন বস্তার ওপর, কেউ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন সম্ভাব্য ক্রেতার দিকে। কিন্তু মুখে কারও হাসি নেই। কৃষকদের অভিযোগ, চলতি মৌসুমে সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর দাম বেড়েছে। অথচ ধানের বাজারদর সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে প্রতিদিনই তারা পড়ছেন আর্থিক চাপে।

চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চর ডিয়ারা গ্রামের কৃষক আরিফুর রহমান (৩৫) জানান, ১৯০ কড়া জমিতে ধান করেছি। আজ ৪০ মণ ধান বিক্রি করতে এনেছি। কিন্তু বাজারদর আর উৎপাদন খরচের হিসাব মিলালে লাভ তো নেই-ই, বরং লোকসান। প্রতিদিনের পরিশ্রমের মূল্য না পেয়ে ভীষণ হতাশ লাগছে।”

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন বলেন,“চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৩৪ হাজার ৭১০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার মেট্রিক টন। কৃষক যেন তার পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পায়, সে বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। সার, বীজ ও অন্যান্য উপকরণ সহজলভ্য রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।”

তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। হাটের প্রতিটি ধানের বস্তা যেন কৃষকের জীবনের গল্প বহন করছে—ঘাম, শ্রম আর অনিশ্চয়তার গল্প। ন্যায্য দাম না পেলে সেই গল্প যে আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠবে, তা বুঝতে কারও বাকি নেই।


এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫

image_pdfimage_print

Posted on: January 13, 2026 | Author: Chandradip News24