চন্দ্রদ্বীপ নিউজ:চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ডিজেল সরবরাহের জন্য নির্মিত বহুল আলোচিত পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরির চেষ্টা হয়েছে। এই ঘটনার পর জ্বালানি নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নটিই সামনে এসেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ১৫ নম্বর ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের হাদী ফকিরহাট রাস্তার পশ্চিম পাশে। সেখানে মাটির প্রায় ১০ ফুট গভীরে থাকা ডিজেল পরিবহন পাইপলাইনে ছিদ্র করা হয়। ছিদ্র দিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে তেল বেরিয়ে এসে সড়কে ছড়িয়ে পড়লে ৮ জানুয়ারি বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় সঙ্গে সঙ্গে ওই লাইনে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে গত রোববার সকালে আবার ডিজেল সরবরাহ শুরু করা হয়।
বিপিসি ও পুলিশ সূত্র জানায়, পাইপলাইনের ঠিক ওপরেই একটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. আফসার। পরে ঘরটি তিনি ভাড়া দেন খুলনা সিটি করপোরেশনের সোনাডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা নাসির উদ্দিনের ছেলে আমিরুল ইসলামের কাছে। অভিযোগ রয়েছে, ঘর ভাড়া নেওয়ার পর আমিরুল পরিকল্পিতভাবে মাটি খুঁড়ে পাইপলাইন পর্যন্ত পৌঁছান এবং সেখানে ছিদ্র করেন। এরপর পাইপলাইনের সঙ্গে আলাদা একটি পাইপ ও মিটার বসিয়ে তেল চুরির প্রস্তুতি নেন।
পাইপলাইনের ছিদ্রের ঘটনা সরেজমিন দেখতে যান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কয়েকজন কর্মকর্তা। তাঁদের একজন বলেন, তেল চোর চক্র মূল পাইপলাইনের সঙ্গে অন্য একটি পাইপ ও মিটার সংযুক্ত করতে চেয়েছিল। তবে সংযোগস্থলে ঝালাই করতে গিয়ে তারা নিয়ন্ত্রণ হারায়। পাইপলাইনে তেলের চাপ বেশি থাকায় ছিদ্র দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল বেরিয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যান অভিযুক্ত ব্যক্তি। সেই তেল সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনায় কাউকে হাতেনাতে তেলসহ আটক করা না গেলেও প্রশ্ন উঠেছে, এত গভীরে থাকা একটি পাইপলাইনে কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে খোঁড়াখুঁড়ি করা সম্ভব হলো। স্থানীয় প্রশাসন, বিপিসি কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থার চোখ এড়িয়ে এই প্রস্তুতি কীভাবে চলেছে, তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। বিপিসি এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে এখনো ওই কমিটির প্রতিবেদন জমা পড়েনি।
বাংলাদেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের গড় বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ টন। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরবরাহ করা হয়েছে ৬৮ লাখ টন, যার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচ, শিল্প ও পরিবহন—সব খানেই ডিজেলের ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি।
ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইনের মাধ্যমে বছরে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ এ একটি পাইপলাইন দেশের মোট ডিজেল চাহিদার বড় অংশ বহন করে। ফলে এই অবকাঠামোতে সামান্য বিঘ্ন–জাতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনে প্রতি পাঁচ কিলোমিটার পরপর একজন করে লোক বসিয়ে পাহারা দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা যদি মূলত মানুষের চোখের ওপর নির্ভর করে, তাহলে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তার দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইপলাইনের ওপর অবৈধ স্থাপনা, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের দৌরাত্ম্য এবং দুর্বল নজরদারি মিলিয়ে একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শুধু উচ্ছেদ অভিযান বা ভবিষ্যতে প্রযুক্তি চালু করলেই এই ঝুঁকি কমবে না। এখন থেকেই নিরাপত্তাকে গুরুত্ব না দিলে এমন ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, মিরসরাইয়ের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত এবং দুর্বল নজরদারিরই প্রতিফলন। হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই এই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো দ্রুত পাইপলাইনকে প্রকৃত অর্থে নিরাপদ করা এবং দায় নির্ধারণে কোনো ছাড় না দেওয়া।





