বরিশাল অফিস :: বরিশাল জেলার বানারীপাড়া উপজেলার বিশারকান্দি ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারের ওয়ার্কশপ মিস্ত্রি গোলাম মোস্তফা। ২ বছরের বেশি সময় ব্যয় করে প্রকৌশল শাস্ত্রে গোলাম মোস্তফার কোনো একাডেমিক জ্ঞান ছাড়াই তিনি তৈরি করেছেন অভিনব এক বাহন। যা দেখতে অনেকটা বিমানের মতো তবে এই বিমান আকাশে নয় জলে বা পানিতেই চলে। দূর থেকে বিমান মনে হলেও এটি আসলে অবসর কাটানোর নৌযান। তার ছোট মেয়ের নামের সাথে নামকরণ করে রাখা হয় সুবর্ণা এক্সপ্রেস-২। দিনের চেয়ে রাতের চলাচলের সময় লাল-নিলসহ বিভিন্ন বাতি থাকায় এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায় আরো কয়েক গুণে ।
লোহা-লক্করের সঙ্গেই গোলাম মোস্তফার বন্ধুত্ব প্রায় ৩০ থেকে ৩২ বছরের। ওয়ার্কশপে কাজ করতে গিয়েই যতটুকু শিখেছেন তা দিয়েই তিনি অজোপাড়া গাঁয়ের এই মিস্ত্রি গতানুগতিক কাজে যখন হাঁপিয়ে ওঠেন তখন নিজের মতো করে নতুন কিছু তৈরি করেন। কখনো কৃষকের জন্য, কখনো জেলের জন্য, কখনো আনন্দের ভ্রমনের জন্য। তবে তিনি এবার বিমান তৈরি করতে গিয়ে প্রথমে বিভিন্ন মানুষ তাকে সমালোচনার করলেও এখন এলাকাজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে প্রশংসায় ভাসছেন ।
বিশারকান্দিতে গোলাম মোস্তফার চেয়ে মোস্তফা ফিটার বা ফাইন্ডার নামেই বিখ্যাত তিনি। ইঞ্জিনের দক্ষ মেকানিককে ফিটার বা ফাইন্ডর বলা হয় । অনেকে আবার ওস্তাদ বলেও ডাকে তাকে ।
ক্ষুদে বিজ্ঞানী গোলাম মোস্তফা চন্দ্রদ্বীপ নিউজকে বলেন, আমি একদিন রাতে নদীর পাড়ে দাড়িয়ে ছিলাম তখন আকাশ থেকে বিমান যাচ্ছিল। তারপরের দিন আমি পরিকল্পনা করে ঠিক করি এমন একটি বিমান তৈরি করবো । আমরা গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ। চাইলেইতো আর বিমানে উঠতে পারতেছি না। বিমানে ঘুরে বেড়ানো ব্যয়বহুল। অনেক টাকা-পয়সা দরকার। অত টাকা আমি পাব কোথায় চিন্তা করলাম বিমানে উঠার সক্ষমতা না থাকলেও নিজে একটা বিমানে তৈরি করি। যেটি নদীতে চলবে। নিজেও চড়তে পারলাম পরিবার নিয়ে আর লোকজন বলবে বিমান আসছে। একেবারেই খেয়াল খুশিতে এটি তৈরি করেছি।

তিনি বলেন, এক সময় আমি অন্যের ওয়ার্কশপে কাজ করতাম। এখন আমার গ্রামের চৌমুহনী বাজারে নিজের ওয়ার্কশপ আছে। কাজের চাপ না থাকলে স্টিল বা লোহা দিয়ে নিজের মনের মতোই কিছু তৈরি করি। এর আগে স্টিলের লাঙল বানিয়েছি। সাধারণত কৃষকরা ভালো ও মজবুত লাঙলের সংকটে থাকেন। তাছাড়া বছরে বছরে কাঠের লাঙল বদলাতে হয়। স্টিলের লাঙল দীর্ঘস্থায়ী। ধারালো হওয়ায় সহজেই গভীরভাবে জমি চাষ করা যায়।
গোলাম মোস্তফা চন্দ্রদ্বীপ নিউজকে বলেন, আমাদের দক্ষিণাঞ্চল নদী প্রধান হওয়ায় নৌকা এখনো জনপ্রিয় পরিবহন। কিন্তু দেখা যায় অধিকাংশ নৌকা কয়েক বছরের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। নৌকা যদি কাঠের বডি না হয়ে লোহার বডি হয় তাহলে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়। এই কথা চিন্তা করে আমি লোহার নৌকাও তৈরি করেছি।
তিনি বলেন, অনেক অঞ্চলে ধানের জমিতে পানির উচ্চতা বেশি হওয়ায় সাধারণ ট্রাক্টর চাষ দিতে পারে না। সঠিক সময়ে চাষ না দিলে ফসল উঠাতেও দেরি হয়। ভালো ফসলও পাওয়া যায় না। নিম্নাঞ্চলের কথা চিন্তা করে আমি ভাসমান ট্রাক্টর বানিয়েছি। তারই ধারাবাহিকতায় নদীর প্লেন তৈরি করি। ২০২২ সালে মাথায় চিন্তা আসে বিমান বানালে কেমন হয় । কিন্তু আকাশে উড়তে পারবে এমন বিমানতো আমার দ্বারা বানানো সম্ভব না। বিকল্প হিসেবে বায়ুর জগত বাদ দিয়ে পানির জগতে বিমান তৈরির পরিকল্পনা করি। একটু একটু করে প্রায় ২ বছর কাজ করে বিমানটির কাজ শেষ করি।
প্রথমে মানুষ অনেক প্রশ্ন করতো, কী বানাচ্ছি? । গ্রামের মানুষ অনেক কথা বলতো তবে পূর্ণাঙ্গ করার আগ পর্যন্তও মানুষ ধারণা করতে পারেনি আসলে কী হচ্ছে, তারপর পানিতে নামানোর পড়ে সকলের কাছেই ভালো লাগে । বিমানটি তৈরি করতে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আমি মনে করি সঠিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমি মানুষের উপকারে আসে এমন টেকসই বাহন আরো উদ্ভাবন করতে পারব।
গোলাম মোস্তফার বিমানে ১৮ জন যাত্রী নিয়ে ২৪ ঘণ্টাই নৌপথে চলাচলের সক্ষমতা, প্রতি ঘন্টায় ১৬ কিলোমিটার এর সর্বোচ্চ গতিবেগ রয়েছে । ইঞ্জিনচালিত এই বাহনটি এখন পর্যন্ত নিজেই পরিচালনা করছেন তিনি। বর্তমানে দর্শনার্থীদের ভমণের ও এলাকার বিভিন্ন মানুষের সেবায় যাতায়াতের জন্য এটি ব্যবহার করা হয় ।
বিমানে বিষয় নিয়ে মো: চুন্ন হাওলদার চন্দ্রদ্বীপ নিউজকে বলেন ,গোলাম মোস্তফা ভাইয়ের বিমান এটা অনেক সুন্দার এমন বিমান আর কোথাও দেখি নাই । আমি এই বিমানে এখনো না চড়লেও যারা বিমানে উঠছে তারা বলছেন এটি খুব দ্রুতগতিতে চলে । তিনি ছোট বেলা থেকেই মানুষের সেবা করে আসছেন। তার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা রয়েছে কোথাও কোন একটি জাহাজ ডবলে,নেীকা ডবলে পানির নিচে আগে মেশিন ছাড়া ডুবিয়ে উদ্ধার করতো এখন তার নিদের দক্ষতায় স্পেশাল মেশিন তৈরি করে নিয়েছেন তা দিয়ে উদ্ধার করে । এ ছাড়াও গ্রামের কবিরাজি করে থাকেন তিনি ।
বিশারকান্দি ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারের মো: ইলিয়াস নামের এক যুবক চন্দ্রদ্বীপ নিউজকে বলেন, বিমানটি দেখে আমরা খুব আনন্দবোধ করছি আমাদের খুব ভালো লাগতে আছে । আমাদের গ্রামে এমন একটি বিমান তৈরি করছে আমরা টাকা দিয়ে বিমানে কখনো উঠি নাই তবে টাকা ছাড়া গোালাম মোস্তফা ভাইয়ের এই বিমানে উঠছি এলাকায় খুব আলোরণ সৃস্টি করছেন তিনি ।

মেহেদী হাচান শান্ত নামের আর এক যুবক চন্দ্রদ্বীপ নিউজকে বলেন, বিমানটি অনেক সুন্দর, দেখলে মনে হয় বাস্তবের আকাশের বিমানের মতো ,আর এটি পানিতে চলেও খুবদ্রুত। এই বিমান দেখেতে প্রতিনিয়ত অনেক মানুষ ভিড় করছেন তাদের কাছে এটা আকাশের বিমানের সমান মনে করে এটিতে ঘুরছেন বা কেউ কেউ ছবি তুলছেন । আকাশের বিমানে উঠতে ভিসা টিকিট লাগে আর এই বিমানে কিছুই লাগে না ।
চৌমুহনী বাজারের আবদুল মাালেক হাওলাদার চন্দ্রদ্বীপ নিউজকে বলেন, গোলাম মোস্তাফা ভাই আমাদের গ্রাামের সন্তান এটা আমাদের গর্ভের বিষয় কারণ তিনি সব সময় মানুষের বিপদে পাশে থাকেন তার মধ্যে অনেক রকমের প্রতিভা রয়েছে । তিনি সমাজের সকল সামাজিক কাজের সাথে জরিত তার মতো লোক আমাদের গ্রামে অতুলনীয় । তিনি বিভিন্ন সময় পানিতে কিছু হারিয়ে গেলে বা ডুবে গেলে উদ্ধার করেন । তিনি বিভিন্ন সময় নতুন প্রযুক্তি তৈরি করে এলাকায় আলোরণ সৃস্টি করনে পানিতে বিমান তৈরি করে নতুন করে সকলের প্রশংসায় ভাসছেন । আমরা আশা করবো তার প্রযুক্তিগুলো সরকারী বা মালিকানা পৃষ্ঠপোষকতায় পেলে দরিদ্র এই গোলাম মোস্তফা আরো নতুন কিছু করতে আগ্রহী হবেন ।
গোলাম মোস্তফার বিমান দেখেতে আসা এক শিক্ষার্থী জিহাদুল ইসলাম জিহাদ চন্দ্রদ্বীপ নিউজকে জানান, আমি বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে দ্বাদশ শ্রেণিতে লেখা পড়া করতেছি, আমাদের গ্রামের গোলাম মোস্তফা কাকায় বিভিন্ন সময় নতুন প্রযুক্তি তৈরি করেন যা আমাদের কাছে অনেক ভালোই লাগে। আমারও ছোট বেলা থেকে ইচ্ছে আছে নতুন কিছু আবিষ্কার বার তৈরি করার। আজকের তার বিমানটি দেখতে আসলাম বিমানে উঠলাম ও ছবি তুললাম অনেক ভালো লাগলো আর এই প্রযুক্তি তৈরি করায় আমাদের নতুন কিছু করতে উৎসাহ জাগায়।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহযোগী অধ্যাপক প্রকৌশলী ড. মোঃ শফিউল আলম চন্দ্রদ্বীপ নিউজকে জানান,গোলাম মোস্তফার তৈরিকৃত লোহার নৌকা,ভাসমান ট্রাক্টর, বর্তমানের পানিতে চলে বিমান সকল প্রযুক্তিই অবশ্যই প্রশংসনীয়। আমরা তার সম্পর্কে জেনেছি প্রযুক্তি বিষয়ে জেনে ভালো কিছু হলে তা নিয়ে কাজ করব ।
গোলাম মোস্তফার ছেলে মো: মেহেদী হাচান চন্দ্রদ্বীপ নিউজকে বলেন, বিমানটিতো এখন তো মানুষ দেখতে আসছে, একটা সময় যখন আমরা তৈরি করতে গেছি অনেক হাসাহাসি করতে ছিল তারা বলেতো এটা কেনো ভানাইতেছে এটা দিয়ে কী হবে এটার পিছনে টাকা বিফলে যাবে । তখন তাদের হাসাহাসি অপেক্ষা করে আজ আমরা শেষ প্রান্তে এসেছি । এখন এটা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে । সেই মানুষ গুলোই এখন বাহবা দিচ্ছে ।
এ বিষয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসক মো.শহিদুল ইসলাম চন্দ্রদ্বীপ নিউজকে জানান,দরিদ্র পরিবার থেকে গোলাাম মোস্তাফা যে সব জিনিস তৈরি করতে আছেন আসলেই তা অবিশ্বাস্য । আমরা খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে তার সাথে কথা বলে কৃষি প্রযুক্তি বা অন্য প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে সরকার থেকে তাকে ঋণও সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে ।





