পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় ভুল প্যাথলজি রিপোর্টের কারণে শিশুসহ একাধিক রোগী গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন। বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের গাফিলতিতে রোগ নির্ণয়ে সঠিকতা না থাকায় সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এতে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, জীবননাশের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
দুমকি উপজেলার নিউ লাইফ ডিজিটাল মেডিকেল সার্ভিসেস সেন্টারে ৬ বছর বয়সী নাজিফা নামের এক শিশুর আইএসও টেস্ট রিপোর্টে স্বাভাবিক মাত্রা ২০০’র পরিবর্তে ৬০০ দেখানো হয়। নিশ্চিত হওয়ার জন্য বরিশালের জাহানারা ক্লিনিকে রিপোর্ট করালে সেখানে আইএসও মাত্রা পাওয়া যায় ২০০। তবুও নিউ লাইফের রিপোর্টের ভিত্তিতে শিশুটিকে অ্যান্টিবায়োটিকসহ বেশকিছু ওষুধ খাওয়ানো হলে তার স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হয়। পরে জাহানারা ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানান, এমন ওষুধ শিশুটিকে বিকলাঙ্গ করে দিতে পারে।
এছাড়া, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) এক শিক্ষার্থী টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছেন ভেবে নিউ লাইফ ডিজিটাল মেডিকেল সার্ভিসেস এর রিপোর্ট অনুযায়ী চিকিৎসা নেন। উপজেলা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. জিএম এনামুল হক টাইফয়েডের চিকিৎসা দেন। এতে ওই শিক্ষার্থীর অবস্থার আরও অবনতি হয় এবং বরিশালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে পরীক্ষা করে টাইফয়েডের অস্তিত্ব না পাওয়ায় আগের রিপোর্ট ভুল প্রমাণিত হয়। ওই শিক্ষার্থী আইসিইউতে দুই সপ্তাহ চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন।
চাঞ্চল্যকর বিষয় হচ্ছে, ডা. জিএম এনামুল হক নিজেই নিউ লাইফ ডিজিটাল মেডিকেল সার্ভিসেস-এর মালিকদের একজন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরকারি চাকরি থাকা অবস্থায় নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্রাইভেট হাসপাতালের ব্যবসা করছেন এবং নিজের হাসপাতালের রোগীদের সেই প্রাইভেট সেন্টারে পরীক্ষার জন্য পাঠাচ্ছেন। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানাতে গেলে তাদের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে একটি অডিও ক্লিপ প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।
নাজিফার দাদি সখিনা বেগম ২২ জুলাই নিউ লাইফ ডিজিটাল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন পটুয়াখালী সিভিল সার্জনের কাছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. আরিফুল ইসলাম দাবি করেন, রিপোর্ট ভুল ছিল না। ব্যক্তিগত কোনো ভুল হলেও প্রতিষ্ঠান দায় নেবে না।
উপজেলা হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. মীর শহিদুল হাসান শাহীন জানান, অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অদক্ষ টেকনিশিয়ান থাকার কারণে রিপোর্টে ভুল হয়। উপজেলা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ মজিবুর রহমান টিটু বলেন, যদি কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টার রিপোর্টে ভুল করে, সেই দায় ওই সেন্টারের, অ্যাসোসিয়েশন নয়।
পটুয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন ডা. খালেদুর রহমান মিয়া জানিয়েছেন, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি মেয়াদোত্তীর্ণ কি না এবং রিপোর্টে ভুল হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে। দ্রুত সব ক্লিনিক পরিদর্শন করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. এজাজুল হক বলেন, ভুল রিপোর্টের কারণে চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটলে এবং অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য, দুমকি উপজেলা শহর ও লেবুখালী এলাকায় বর্তমানে প্রায় ১৩টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজি রয়েছে। এসব সেন্টারে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার রোগ নির্ণয় পরীক্ষা হয়। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ সেবায় যদি গাফিলতি থাকে, তাহলে তা হতে পারে মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ।
মো: আল-আমিন স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম





