ইতালিতে বসবাসের অনুমতি (রেসিডেন্স পারমিট) পাওয়া দেশের তালিকায় বাংলাদেশিরা এখন শীর্ষ তিনে অবস্থান করছে। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৫৪ লাখ বিদেশি নাগরিক বসবাস করছেন, যাদের মধ্যে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত কারিতাস-মিগ্রান্তেস ফাউন্ডেশনের অভিবাসন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য।
রোমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইতালির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ২ শতাংশই বিদেশি, যা দেশটির অর্থনীতি ও জনসংখ্যার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কর্মক্ষেত্রে বিদেশিদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য—মোট কর্মশক্তির ১০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ বিদেশি নাগরিক।
রোমানিয়া, মরক্কো, আলবেনিয়া, ইউক্রেন ও চীন ঐতিহ্যগতভাবে ইতালিতে বিদেশিদের প্রধান উৎস দেশ হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশির সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বেড়েছে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে দেশটির অর্ধেকেরও বেশি প্রদেশে নতুন রেসিডেন্স পারমিটপ্রাপ্ত নাগরিকদের মধ্যে বাংলাদেশিরা শীর্ষ তিনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতালিতে বসবাসরত বেশিরভাগ বিদেশি দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে অবস্থান করছেন। তবে অনিয়মিত অভিবাসীরা ছড়িয়ে আছেন দক্ষিণের গ্রাম থেকে শুরু করে উত্তরাঞ্চলের শহর পর্যন্ত। তাদের আবাসন পরিস্থিতি অনেক অনিশ্চিত, যা বৈষম্য ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বাড়িয়ে তুলছে।
কারিতাস ও মিগ্রান্তেসের এক যৌথ জরিপে দেখা গেছে, ইতালিতে এখন আবাসন সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিদেশিরা বৈষম্য ও অর্থনৈতিক চাপে পড়ছেন, যা তাদের সামাজিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
অন্যদিকে, ইতালিতে জনসংখ্যা হ্রাসের মাঝেও অভিবাসীরা জন্মহার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। ২০২৪ সালে দেশটিতে জন্ম নেয়া ৩ লাখ ৭০ হাজার শিশুর মধ্যে ২১ শতাংশের বেশি শিশুর অন্তত একজন অভিভাবক বিদেশি। এ ছাড়া ২০২৪ সালে ২ লাখ ১৭ হাজারের বেশি অভিবাসী ইতালির নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন, যা দেশের জনসংখ্যা কাঠামোয় ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।
এ বছর ইতালিতে কর্মরত মোট মানুষের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ, যার মধ্যে ২৫ লাখের বেশি বিদেশি কর্মী। অর্থাৎ দেশটির মোট কর্মশক্তির ১০ শতাংশেরও বেশি অংশ বিদেশিদের। কর্মসংস্থানে বিদেশিদের অংশগ্রহণ বাড়লেও বৈষম্য রয়ে গেছে—ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের নাগরিকদের মধ্যে কর্মসংস্থানের হার ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ, যেখানে ইতালীয়দের মধ্যে এটি ৬২ দশমিক ২ শতাংশ।
তবুও ২০২৪ সালে বিদেশিদের জন্য নতুন চাকরির চুক্তি বেড়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে কর্মসংস্থান সবচেয়ে বেশি, যেখানে বিদেশিদের অংশগ্রহণ ২১ শতাংশের বেশি। দক্ষিণাঞ্চলেও এই প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে দ্রুত (১৩ দশমিক ৬ শতাংশ)।
শিক্ষাক্ষেত্রেও বিদেশিদের ভূমিকা দিন দিন বাড়ছে। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ইতালিতে ৯ লাখ ১০ হাজারেরও বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, যা মোট শিক্ষার্থীর ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। নতুন প্রজন্মের অভিবাসীরা এখন ইতালির সমাজে আরও গভীরভাবে মিশে যাচ্ছে—তাদের অনেকেই ইতালিতে জন্ম নিয়েছে, বড় হচ্ছে ইতালীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে।
এই পরিবর্তনগুলো শুধু ইতালির জনসংখ্যা নয়, বরং অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থায়ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশি নাগরিকদের এই উত্থান এখন ইতালিতে অভিবাসন প্রবণতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম





