বৈরী আবহাওয়ায় টানা দুই দিন ধরে পটুয়াখালীর উপকূলীয় দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালী মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে সব ধরনের লঞ্চ, স্পিডবোট ও ট্রলার চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করায় অন্তত দুই লাখ মানুষ দ্বীপের ভেতরেই আটকে পড়েছেন। বুধবার (২৮ মে) থেকে শুরু হওয়া এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি শুক্রবার (৩০ মে) পর্যন্তও অব্যাহত থাকায় মানুষের মধ্যে চরম ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। যাতায়াত ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় সাধারণ জীবনযাত্রা যেমন থমকে গেছে, তেমনি বন্ধ হয়ে গেছে চিকিৎসাসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জরুরি যোগাযোগ। এদিকে গত তিনদিন ধরে পুরো উপজেলাজুড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে, যা মানুষকে আরও বড় দুর্দশায় ফেলে দিয়েছে।
রাঙ্গাবালী মূলত সমুদ্র ও নদীবেষ্টিত একটি দুর্গম দ্বীপ। এখানকার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা জলপথ। কলাপাড়া বা গলাচিপা হয়ে এই অঞ্চলে প্রবেশ করতে হয় নৌপথে। কিন্তু বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে এই দ্বীপের মানুষ এখন ‘বন্দি’ অবস্থায় রয়েছে। বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থ মানুষের জন্য এই অবস্থা যেন এক ভয়াবহ যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে রাঙ্গাবালীতে একটি পূর্ণাঙ্গ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স না থাকায় মানুষকে গুরুতর অসুস্থতা বা জটিল সমস্যায় পড়লে জেলা শহর পটুয়াখালী বা নিকটবর্তী গলাচিপায় নিতে হয়। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে কোনো ধরনের যানবাহনই চালু না থাকায় জরুরি রোগীদের চিকিৎসা পাওয়া এখন একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. কাশেম মিয়া জানান, ‘গতকাল আমার ছোট ভাই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। বরিশাল নিয়ে যেতে চাইলেও কোনো ট্রলার বা স্পিডবোট পাওয়া যায়নি। অসহায় হয়ে তাকিয়ে আছি।’
স্থানীয়রা জানান, যোগাযোগ বন্ধ থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। কারণ বাইরের কোনো পণ্য দ্বীপে প্রবেশ করতে পারছে না। যদিও এখনো সম্পূর্ণ সংকট দেখা না দিলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে, যদি আবহাওয়া আরও দুই-একদিন এমন থাকে, তাহলে খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পণ্যে ঘাটতি দেখা দেবে। ব্যবসায়ী ও দোকানদাররা বলছেন, পণ্যের চাহিদা থাকলেও যোগান না থাকায় তারা বিপাকে পড়েছেন।
দ্বীপজুড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় উপজেলার প্রতিটি বাজার কার্যত অচল হয়ে গেছে। ফ্রিজে সংরক্ষিত মাছ, মাংস, দুধসহ নানা খাদ্যপণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। কম্পিউটার ও অনলাইনভিত্তিক সেবাদানকারী দোকানগুলোও বন্ধ। বাহেরচর বাজারের ব্যবসায়ী প্রিন্স মাহমুদ বলেন, ‘প্রতিদিন নানা ধরনের কাজ করি, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় সব বন্ধ। ল্যাপটপে সীমিত সময় কাজ করা গেলেও প্রিন্টার চালাতে পারছি না। দোকান খোলা থাকলেও লাভ হচ্ছে না।’
বাড়িঘরে রাখা খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন অনেক গৃহিণীও। পূর্ব বাহেরচর গ্রামের রোজিনা বেগম বলেন, ‘এক সপ্তাহের বাজার একসঙ্গে করি। ফ্রিজে রাখলেও বিদ্যুৎ না থাকায় সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আবার কিনতে হবে, অথচ বাজারে জিনিসপত্রের দামও বেশি।’
বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল চার্জ দিতে না পারায় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বন্ধ, কর্মজীবীরা কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। এক কথায়, পুরো রাঙ্গাবালী যেন অচল হয়ে পড়েছে।
রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইকবাল হাসান জানিয়েছেন, মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থেই নৌযান চলাচল সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে পুনরায় চলাচল চালু হবে। জরুরি প্রয়োজনে নৌপুলিশ বা কোস্টগার্ডের সহায়তায় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ এখনো সক্রিয়। ঝোড়ো হাওয়া ও দমকা বাতাস অব্যাহত রয়েছে। ফলে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। নদীপথে ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেতও জারি রয়েছে।
উপজেলার এই বিচ্ছিন্নতা একবারেই তাৎক্ষণিক নয়, বরং এটি অবকাঠামোগত দুর্বলতার দীর্ঘমেয়াদি ফল। স্থলপথ না থাকায় একটি সাধারণ দুর্যোগও এখানকার মানুষের জীবনযাত্রাকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। জরুরি মুহূর্তে চিকিৎসা, শিক্ষা ও যোগাযোগের মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে না পারায় রাঙ্গাবালীর জনগণ নিয়মিত দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এখন প্রয়োজন দ্বীপাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের।
####
মো: আল-আমিন