বিগত দেড় মাসে শহরে চলমান একের পর এক মহাসড়ক অবরোধে বরিশালের জীবনযাত্রা মারাত্মক ঝামেলায় পড়েছে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় আট কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে দাবি করেছেন পরিবহন ও ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিরা।
বরিশাল জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি মো. মোশারফ হোসেন জানান, মহাসড়ক অবরোধের কারণে পরিবহন খাতের দৈনিক গড়ে ক্ষতি প্রায় ৪০ লাখ টাকা। এই হার ধরে একেবারে ২০ দিন অবরোধ চলার ফলে মোট ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ≈৮০,০০,০০০ টাকা (আট কোটি টাকা)। তিনি বলেন, “সারা দেশে থেকে এখানে প্রতিদিন প্রায় ৪০০-৫০০টি উচ্চ দূরপাল্লার গাড়ি আসে। অবরোধ হলে শুধু মালিকদের না—যাত্রী ও সাধারণ মানুষেরও অসীম কষ্ট লাগছে। আন্দোলন করা উচিত, কিন্তু রাস্তা আটকিয়ে নয়।”
সংবাদ অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় মাসে মোট অন্তত ২০ দিন বিভিন্ন দাবি নিয়ে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাত আন্দোলন নিয়ে মহাসড়ক ছয় দিন বন্ধ ছিল; বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা অবকাঠামো দাবিতে পাঁচ দিন অবরোধ করে; পরীক্ষা পেছানোর প্রতিবাদে ছাত্রদের দ্বিদিনব্যাপী রাতের অবরোধ ছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও বড় দাবি মেনে নেওয়ার দাবিতে অগণিত দিন একাধিক সময় মহাসড়ক আটকা পড়ে। অবরোধ চলাকালীন সারা দেশের সঙ্গে বরিশালের সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে ভেঙে পড়ে এবং খাদ্য ও কাঁচামালের সরবরাহ ব্যাহত হয়, ফলে ব্যবসায়িক ও কৃষিপণ্য নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ব্যবসায়ীদের শোকেসতা তুলে ধরে বরিশাল বিভাগের ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য সচিব শেখ আব্দুর রহিম বলেন, “আন্দোলন আমরা করব, কিন্তু সড়ক আটকে করে নয়। এক দিন অবরোধ থাকলে স্ট্যান্ডগুলোতে বিপুল লোকসান হয়; শাক-সবজি, মাছসহ কাঁচা পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনায় বৈকল্পিক সমাধান বের করা উচিত।”
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (সদর দফতর) সুশান্ত সরকার বলেন, “সড়ক অবরোধ জনদুর্ভোগের বড় কারণ। যখন অবরোধ দীর্ঘ হয় আমরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি সমাধানে চেষ্টা করি এবং বিকল্প পথ চালু করি। তবে সেই বিকল্প পথও সীমিত। আন্দোলনের যৌক্তিকতা থাকলেও পথ অবরোধের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ানো উচিত নয়।”
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও বলেছেন—যৌক্তিক দাবি থাকলে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে দাবি দাখিল ও ঐতিহ্যগত আন্দোলন পদ্ধতি অবলম্বন করলে জনদুঃখ ও আর্থিক ক্ষতি কমানো সম্ভব। মিজানুর রহমান (বরিশাল নাগরিক সমাজ) বলেন, “দাবি রাখুন, কিন্তু জনগণের দুর্ভোগ বাড়িয়ে নয়; সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে আলোচনায় বসাতে হবে।”
যাত্রীদের কাঁঠালের মতো অভিজ্ঞতাও কষ্টসঙ্কুল। একজন যাত্রী সোহরাব হোসেন জানান, “ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়; শিশুসহ অনেকেই ভীষণ কষ্ট পান। আন্দোলন করলে মানববন্ধন, অনশন ও সহমর্মিতা দেখিয়ে করা উচিত—রাস্তা আটকে নয়।” চালক ও হেলপাররা বলছেন, অবরোধে তারা টিকেট কেটে যাত্রী ওঠার পর অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে নামলে টাকার ফেরত দিতে হয়, যার ফলে মালিক-চালক-হেলপার প্রত্যেকে আর্থিক ও মানসিক ক্ষতিগ্রস্ত হন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহন ও সামাজিক গ্রুপগুলো প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে—মাল্টি-স্টেকহোল্ডার আলোচনার মাধ্যমে বিকল্প আন্দোলন কৌশম তৈরি করলে নগরের অর্থনীতিকে সংরক্ষণ করা সম্ভব এবং জনদুর্ভোগ কমবে।
এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫