চিংগরিয়া খাল উদ্ধারে জোর দাবিতে মাঠে প্রশাসন ও পরিবেশকর্মীরা

পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌরসভার প্রাণপ্রবাহ হিসেবে পরিচিত চিংগরিয়া খাল আজ দখল, ভরাট ও শ্রেণি পরিবর্তনের শিকার হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় আদালতের রুলের পর এখন আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি শুরু হয়েছে স্থানীয়দের সামাজিক আন্দোলন। পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের সমন্বয়ে।
সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, খাল হিসেবে নিবন্ধিত জমি পরবর্তীতে ‘নাল’ শ্রেণিতে পরিবর্তন করে কয়েকটি সেটেলমেন্ট কেসের (৮২-কে/৮০-৮১, ৯০-কে/৮৬-৮৭, ৭৭৯-কে/৮৬-৮৭ ও ৭৭৭-কে/৮৬-৮৭) মাধ্যমে ব্যক্তি মালিকানায় বন্দোবস্ত করা হয়। এরপর বাঁধ নির্মাণ, মাছ চাষ ও স্থাপনা তৈরির কারণে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ৪০ থেকে ৬০ ফুট প্রশস্ত খালটি সংকুচিত হয়ে মাত্র ১০ থেকে ২০ ফুটে নেমে এসেছে।
এই কারণে বর্ষাকালে কলাপাড়া পৌর এলাকা ও আশপাশের শত শত একর জমি পানিবন্দি থাকে। জলাবদ্ধতায় কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে ফসলি জমিতে, এবং পৌরবাসীর দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।
পরিবেশ সংরক্ষণে বেলার উদ্যোগে ২০২৩ সালে রিট পিটিশন (নং ১৪৭২৯/২০২৩) দায়ের করা হয়। এতে আদালত জানতে চান—কেন ৫.৪৬ একর খালভূমি উদ্ধারের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে না এবং ‘নাল’ শ্রেণিতে রূপান্তর কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি, আদালত ছয় মাসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
এই মামলার পর থেকে এলাকায় শুরু হয় ব্যাপক গণআন্দোলন। বেলার সহায়তায় স্থানীয়রা মানববন্ধন, সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান অব্যাহত রাখেন। এর প্রভাবে সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসন কিছু অংশে বাঁধ কেটে দেয়ায় খালের পানির প্রবাহ অনেকটাই ফিরে এসেছে।
তবে এলাকাবাসী দাবি করছে—চিংগরিয়া খালের পূর্ণ উন্মুক্তকরণ, অবৈধ লীজ বাতিল এবং উৎসমুখে স্থায়ী সেতু নির্মাণ জরুরি। তারা আরও বলেছে, সব খালের সীমা নির্ধারণ করে বাঁধ ও স্থাপনা সরিয়ে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে, পাশাপাশি খাল খনন, বনায়ন ও দেশীয় মাছ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
এই দাবিগুলো সামনে রেখে ২২ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে কলাপাড়া উপজেলা সম্মেলন কক্ষে বেলার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় উপকারভোগী সমন্বয় সভা। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব কাউছার হামিদ, সভাপতিত্ব করেন পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক মেজবাহ উদ্দিন মান্নু। বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী জনাব লিঙ্কন বায়েন স্বাগত বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
সভায় ইউএনও বলেন, “আমরা আইন মেনে কাজ করি। আদালতের নির্দেশই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কেউ যেন সরকারি খাল বা নদী দখল করতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি।”
অন্যদিকে পরিবেশকর্মী মেজবাহ উদ্দিন মান্নু বলেন, “খাল দখল রোধে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। সবাই মিলে না নেমে এই নদীখাল রক্ষা সম্ভব নয়।”
বেলার পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন ও খালের প্রাকৃতিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারে আইনগত সহায়তা এবং মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।
খাল দখলমুক্ত হয়ে প্রবাহ ফিরে এলে কলাপাড়া পৌর এলাকা আবারও বাঁচবে জলাবদ্ধতা থেকে, আর মানুষের জীবনে ফিরবে স্বস্তি ও নিরাপত্তা।
মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম












