সালিশের নামে শিক্ষার্থীসহ ৫ জনের মাথা ন্যাড়া করলেন ইউপি সদস্য

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের মধ্য চতলাখালী গ্রামে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের উপস্থিতিতে এবং নির্দেশে পাঁচ তরুণের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রবিবার সকালে প্রায় শতাধিক লোকের সামনে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে ও ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী, ঘটনার পটভূমি ছিল জমিজমা সংক্রান্ত শত্রুতা। মনির গোলদার ও মোজাম্মেল মৃধার মধ্যে পূর্বের জমিজমা সূচক বিরোধ এবং এর জেরে একপর্যায়ে তাদের ছেলে-পুল্লেরা বিবাদে জড়ায়। শনিবার রাতে দু’পক্ষের কথা কাটাকাটির পর রোববার সকালে ইউপি সদস্য রেশাদ খলিফা উপস্থিতিতে খুতির বাজারে সালিশ বসে। সালিশে ওই ইউপি সদস্য পাঁচ তরুণ—রাব্বি (১৮), রিয়ান (২১), রাতুল (১৭), শাকিল (১৯) ও নয়ন সরদার (১৮)—কে ‘বখাটে’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের চুল কেটে দেয়ার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নাপিত ডেকে এনে সদস্য নিজে উপস্থিত থেকে মাথা ন্যাড়া করানো হয়; ঘটনাটি ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগীদের বয়ান অনুযায়ী তারা বানানবিরোধ থামানোর উদ্দেশ্যে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন, কিন্তু সালিশের নামে তাদের নিজেদেরই অপমান করা হয়েছে। নয়ন সরদারের মা ঝর্ণা বেগম কেঁদে বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো অপরাধ করেনি; তিনি মারামারি থামাতে গিয়েছিলেন। নিয়োমিতভাবে আমাকে ডেকে জানানো হতো কিন্তু কেউ ডাকেনি—শুধু এসে আমার ছেলের চুল কেটে ফেলা হয়েছে।’ রাব্বির মা মাহফুজাও বলছেন, মূল বিরোধের সূত্রই জমিজমা; তাদেরই উপর অতিরিক্ত মানহানি করা হয়েছে।
অভিযুক্ত ইউপি সদস্য রেশাদ খলিফা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি ছিলাম না, আমি জানি না’—তথ্যসমূহ সম্পর্কে তিনি নিজেকে দুর্বল অবস্থায় উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে সালিশ (গ্রাম আদালত) পরিচালনার স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, ইউনিয়ন পরিষদের বাইরে সালিশ বসানো অনুচিত ও আইনবিরোধী; গ্রাম আদালত পরিচালনারও নির্দিষ্ট বিধি-নির্দেশনা রয়েছে এবং তা লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
রাঙ্গাবালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামীম হাওলাদার ঘটনাটি শুনেছেন বলে নিশ্চিত করে বলেন, ‘খোঁজখবর নিচ্ছি; সত্যতা প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজিব দাশ পুরকায়স্থও ঘটনার তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন এবং প্রমাণ সাপেক্ষে প্রয়োজনে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। স্থানীয় আইনজীবীরা এই ধরনের জনসম্মুখে অপমানে দণ্ড দেওয়া—কোনও আইনগত শাস্তি নয়—বলেই মন্তব্য করেছেন; তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, এটি ব্যক্তিগত মর্যাদা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন।
স্থানীয়দের অভিমত—জনপ্রতিনিধি কিংবা দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি নিজেই আইনবহির্ভূত কর্মে অংশগ্রহণ করেন, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় ন্যায়বিচার খুঁজবে? বহু পরিবারের সদস্যরা লজ্জায় ও উদ্বেগে ভেঙে পড়েছেন; কিছু পরিবার এই ঘটনায় আইনি পথে বিচার চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ কেউ স্থানীয় প্রভাবের ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না।
আইনগত বিশ্লেষণ করেছে স্থানীয় অ্যাডভোকেটরা—গ্রাম আদালতের মাধ্যমে জরিমানা বা মধ্যস্থতা করা গেলেও কাউকে জনসম্মুখে অপমান করা, জোর করে চুল কাটা বা প্রকাশ্যে হেয় করা বাংলাদেশের আইনের চোখে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে। যাদের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঘটনাস্থলের সামাজিক পরিবেশ বিবেচনায় স্থানীয় নেতারা ও মানবাধিকারকর্মীরা প্রশাসনকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে—যাতে ভবিষ্যতে কোনো জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজের বিচার-হাতে তুলে না নিতে পারে এবং গ্রামের সাধারণ মানুষ নিরাপদে ন্যায়বিচার পাবেন।
এ ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে; তদন্ত শেষে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে সিদ্ধান্ত নেবে তা সবার সামনে প্রকাশ করা হবে এবং প্রমাণিত দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম








