বরগুনার তিন নদীর ভাঙনে লাখাধিক মানুষ বিপর্যস্ত

বরগুনার পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদী তীরের ভয়াবহ ভাঙনের কারণে উপকূলজুড়ে নীরব বিপর্যয় নেমে এসেছে। প্রতিদিন নদীর ঢেউয়ে বিলীন হচ্ছে ঘর-বাড়ি, স্কুল, বাজার, কৃষিজমি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। নদীভাঙনের আতঙ্কে লক্ষাধিক মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
গত কয়েক বছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বাঁধ নির্মাণ করলেও নদীর তীব্র স্রোত ও ভৌগোলিক পরিবর্তনের কারণে বাঁধগুলো টেকসই হচ্ছে না। বাঁধের লাইন তিনবার পরিবর্তন হলেও নদীর আগ্রাসী ভাঙন থামানো সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাঙনের প্রধান কারণ হলো বর্ষাকালে পানি চাপ বৃদ্ধি, অবৈধ দখল, বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি, ইটভাটা ও চর দখল, জলবায়ু পরিবর্তন, সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়ের ঘনঘন প্রভাব।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হলো পায়রা ও বলেশ্বর নদীর তীরবর্তী বরগুনা সদরের বালিয়াতলী, তেঁতুলবাড়িয়া, বুড়িরচর, গোলবুনিয়া, রায়ের তবক, নলটোনা, আজগরকাঠি, ডালভাঙ্গা, নদী বন্দর, পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা, জিনতলা, রুহিতা, কাকচিড়া, বামনা উপজেলার রামনা, বেতাগী উপজেলার সরিষামুড়ি, কালিকাবাড়ী, হোসনাবাদ, মোকামিয়া, আমতলী উপজেলার বালিয়াতলী, গুলিশাখালী, পচাকোড়ালিয়া, আরপাঙ্গাশিয়া, যোপখালী, তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া, চরপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা।
বরগুনা সদর উপজেলার ১০নং নলটোনা ইউনিয়নের নলটোনা গ্রাম ইতোমধ্যেই বিষখালী নদীর আগ্রাসনে বিপর্যস্ত। ফসলি জমি, বসতবাড়ি, বিদ্যালয় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকে বসতভিটা হারিয়ে এলাকা ত্যাগ করেছেন।
স্থানীয় চাষি ও বাসিন্দারা জানিয়েছেন, নদী ভাঙন প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সেলিম শাহনেওয়াজ বলেন, “পাউবো বরাবর হাতজোড় করে অনুরোধ করেছি, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেই।” তালতলীর মিশনবাড়িয়া গ্রামের আব্দুল জব্বার হাওলাদার বলেন, “গত বছর বীজ রোপণ করেছি, আজ সেখানে নদীর ঢেউ খেলছে। গৃহহীন হাজারো মানুষ, কৃষিজমি নদীতে বিলীন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস।”
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৮৫০ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে ৫০০ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত, সংস্কার হচ্ছে মাত্র ৩০০ কিলোমিটারে। বাকি ২০০ কিলোমিটার ঝুঁকির মুখে। অমাবস্যা-পূর্ণিমার সময় জোয়ারের পানি প্রবেশ করে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব বলেন, নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে কাজ চলছে এবং স্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দের অপেক্ষায় আছি। তবে স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, “কাগজে প্রকল্প আছে, বাস্তবে কার্যকর ব্যবস্থা নেই।”
স্থানীয়দের দাবি, উপকূল রক্ষায় টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন, দখলমুক্ত নদী প্রবাহ এবং কার্যকর বাঁধ নির্মাণ অত্যাবশ্যক। যদি এখনই পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, বরগুনার বহু জনপদ ভবিষ্যতে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে।
এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫







