২১ ফেব্রুয়ারি, মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) রসুলপুর এলাকায় শিশুদের নিয়ে শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে চলে আসা একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজনে পরিণত হয়েছে। ভাষা শহীদদের স্মরণে এবং একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিবছর রসুলপুরের শিশু-কিশোররা মাটি, কাঠ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করে। এর মাধ্যমে তারা তাদের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হয় এবং দেশপ্রেমের অনুভূতি জাগ্রত হয়।
এ বছরও রসুলপুরে অনুষ্ঠিত হওয়া এই শহীদ মিনার নির্মাণ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় শতাধিক শিশু। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা তাদের হাতে তৈরি শহীদ মিনারগুলোতে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে এবং নিজেদের সৃজনশীলতার প্রদর্শনী করেছে। শহীদ মিনারের কাঠামো ও নির্মাণ প্রক্রিয়ায় ছোট ছোট শিশুদের কাজ করার মাধ্যমে তাদের মধ্যে ইতিহাস সচেতনতা ও জাতির প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি হচ্ছে। এটি শিশুদের জন্য একটি অনুপ্রেরণার উৎস এবং তাদের মধ্যে ইতিহাসচেতনতা বাড়ানোর একটি বড় মাধ্যম।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের পক্ষ থেকে এবারের আয়োজনে সভাপতিত্ব করেন বরিশাল মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক সুজন আহমেদ। তিনি বলেন, “শহীদ মিনার নির্মাণের মাধ্যমে আমরা শিশুদের শুধু ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানাচ্ছি না, বরং তাদের মধ্যে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করছি। তারা মাটি-কাঠ দিয়ে তৈরি এসব শহীদ মিনারের মাধ্যমে দেশের প্রতি তাদের ভালোবাসা এবং জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করবে।” তিনি আরও জানান যে, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট গত ১৪ বছর ধরে রসুলপুরসহ অন্যান্য প্রান্তিক এলাকায় ভাষা দিবসের চেতনা ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং শিশুদের মধ্যে দেশের ইতিহাস চর্চায় উৎসাহিত করছে।
শহীদ মিনার নির্মাণ প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারি ব্রজমোহন কলেজের শিক্ষক রণজিৎ মল্লিক, বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষক ইসরাত জাহান লিপি এবং সংস্কৃতিজ্ঞানী মোস্তাফিজুর রহমান। তারা শহীদ মিনারগুলোর নির্মাণ কৌশল এবং সৃজনশীলতা দেখে প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে আরও এমন আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
এদিকে, চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী শিশুরা তাদের আঁকা চিত্রের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলন এবং শহীদদের স্মরণ করে তাদের শিল্পকর্মে নতুন কিছু উপস্থাপন করেছে। বিভিন্ন বয়সের শিশুদের মাঝে এই ধরনের সৃজনশীল কার্যক্রম ভাষা দিবসের সত্যিকার অর্থ উপলব্ধি করতে সাহায্য করে এবং তাদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ তৈরি করে।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ডাঃ মনীষা চক্রবর্তী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ বরিশাল জেলার সদস্য সচিব। তিনি বলেন, “প্রান্তিক এলাকায় ভাষা আন্দোলনের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। রসুলপুরের মতো এলাকায় শিশুদের মাঝে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস শেখানো হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধের সৃষ্টি করবে।” এছাড়া, বাসদ কেন্দ্রীয় বর্ধিত ফোরামের সদস্য ইমাম হোসেন খোকন, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সহ-সভাপতি জোহরা রেখা এবং শ্রমিক ফ্রন্টের দপ্তর সম্পাদক শহিদুল ইসলাম সহ অনেকেই এ আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন।
বক্তারা আরও বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা থেকেই ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছে, যা মুক্তিযুদ্ধের বৈষম্য দূর করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বক্তারা সরকারের কাছে রসুলপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ এবং সকল নিম্নবিত্ত কলোনিতে পাঠাগার নির্মাণের দাবি জানান। তারা বলেন, সরকারিভাবে এসব উদ্যোগ গ্রহণ করলে শিশুদের মধ্যে আরো উন্নত সাংস্কৃতিক চর্চা এবং ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস শিখানো সম্ভব হবে।
আলোচনা সভা শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে শহীদ মিনার নির্মাণ প্রতিযোগিতা এবং চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিশুদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। এই আয়োজনের মাধ্যমে তাদেরকে উৎসাহিত করা হয় এবং আগামী দিনে আরও ভালো কাজ করার জন্য প্রেরণা প্রদান করা হয়। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের এই আয়োজনে শিশুদের মধ্যে একুশের চেতনা এবং ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সমাজে আরো বেশি সচেতনতা তৈরি হবে এবং ভবিষ্যতে শিশুদের মধ্যে জাতির প্রতি দায়িত্ববোধ আরও গভীর হবে।
মো: তুহিন হোসেন,
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম