বরগুনার উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্যজীবীরা শত বছরের পুরনো দাদন প্রথার ফাঁদে আটকে পড়েছেন, যা তাদের জীবনের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যারা বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন, তারা আজও অর্থনৈতিক মুক্তি পায়নি। দাদন প্রথার কারণে তাদের আয় এবং জীবনযাত্রা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে, যা এক ধরনের শেকল হিসেবে তাদের জীবনকে বাঁধিয়ে রেখেছে।
বরগুনার প্রায় ৯৫% জেলে এই দাদনের শেকলে বন্দী। যদিও তারা বছরে কোটি টাকার মাছ ধরেন, কিন্তু তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। এই প্রথা তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করে, এবং অনেকেই পেশা ত্যাগ করার চিন্তা করছেন।
উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো জেলের জীবনে টিকে থাকা এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে মহাজনের চক্র—এই দুটি কারণে তারা দিশেহারা। এদের মুক্তির জন্য প্রয়োজন টেকসই ও ন্যায়সংগত মৎস্যনীতি এবং সরকারি সহায়তা, যাতে তারা দাদনের খুঁটিনাটি থেকে মুক্তি পেতে পারে।
দাদন প্রথার ফলে, জেলেরা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়ে মাছ ধরেন, এবং বাধ্য হয়ে নির্দিষ্ট আড়তে মাছ বিক্রি করতে হয়। এতে তাদের লাভ কমে যায় এবং তারা ন্যায্য দাম পায় না। বরগুনার ৭২ বছরের জেলে মো. আলম ফিটার বলেন, “এত বছরেও কিছুই পাল্টায়নি জীবনে। প্রতি বছর ঝড়ের কবলে পড়ে বঙ্গোপসাগরে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরতে যেতে হয়, আর দাদনের বোঝা বহন করতে হয়।”
ট্রলার মালিকরা জানাচ্ছেন যে, দাদন প্রথার কারণে তাদের ক্ষতিও হয়, কারণ অনেক সময় জেলেরা আনা মাছের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ এনে দিতে পারেন না। এমনকি জেলেদের অপহরণের মতো ঘটনা ঘটলেও, ট্রলার মালিকরা চাঁদা দিয়ে তাদের মুক্ত করেন, তবে জেলেরা কখনো সেই টাকা শোধ করতে পারেন না।
বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী জানান, “সাগরে মাছ কমে যাওয়ায় জেলে ও ট্রলার মালিকরা লোকসানে পড়ছেন, এবং ব্যাংক বা এনজিও ঋণ না দেওয়ার কারণে দাদনই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
অর্থনীতিবিদ ড. শহিদুল জাহিদ বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক যদি রিফাইন্যান্স ফান্ড গঠন করে, তাহলে উপকূলীয় জেলেদের স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া সম্ভব, যাতে তারা মহাজনের ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে মাছ শিকার করতে পারে।”
বরগুনা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মহসীন জানান, “জেলেদের স্বাবলম্বী করতে সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্রদান করছে, কিন্তু নগদ অর্থ সহায়তার ব্যবস্থা নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা এই সমস্যা তুলে ধরব।”
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, “দাদন প্রথা বন্ধে কার্যকরী পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, যাতে জেলেরা সরকারি সহায়তা পেতে পারে।”
এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /