বাংলার বাঘ কিংবা গরিবের ‘হক সাহেব’

‘শের-ই-বাংলা’ বা বাংলার বাঘ—এই উপাধি শুধু বাহ্যিক তর্জনে নয়, গভীর রাজনৈতিক দর্শনে, সাহসিকতায় ও নিপীড়িতদের প্রতি অগাধ ভালোবাসার কারণে যথার্থভাবে মানানসই এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন আবুল কাশেম ফজলুল হক।
তিনি ছিলেন এলিট শ্রেণির প্রতিনিধি, কিন্তু মনের ভিতরে ছিলেন খাঁটি কৃষকসমাজের বন্ধু। বাংলার সাধারণ মানুষ তাকে ভালোবেসে ডাকতো ‘হক সাহেব’ নামে।
যেভাবে শুরু…
১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বরিশালের ঝালকাঠির রাজাপুরে জন্মগ্রহণ করেন ফজলুল হক। পড়াশোনা শেষ করে হাইকোর্টে আইনজীবী, তারপর প্রশাসনে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, পরে চাকরি ছেড়ে রাজনীতির ময়দানে প্রবেশ। জীবনের প্রতিটি বাঁকে তিনি চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন, এবং নিজের আদর্শ থেকে সরে আসেননি।
রাজনীতির উদ্দেশ্য : কৃষকের মুক্তি
১৯২৯ সালে ‘নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি’ গঠন এবং ১৯৩৭ সালে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি কৃষক সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাজনীতির মাঠে শক্তভাবে দাঁড়ান। ‘লাঙল যার, জমি তার’—এই স্লোগান দিয়েই বাংলার রাজনীতিতে নতুন ধারা এনেছিলেন।
মহাজন ও জমিদারদের বিরুদ্ধে সরব কণ্ঠ
ফজলুল হক জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পদক্ষেপ নেন, প্রজাস্বত্ব আইন পাস করান, এবং চাষিদের ঋণ সুরক্ষায় ‘খাতক আইন’ সংশোধন করেন। ১৯৩৮ সালে প্রণীত ‘পাট অধ্যাদেশ’ পাটচাষিদের জন্য ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে অংশ
তিনি ছিলেন একমাত্র বাঙালি নেতা যিনি নিখিল ভারত কংগ্রেস ও নিখিল ভারত মুসলিম লীগের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। খেলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, সংবিধান প্রণয়ন—সব ক্ষেত্রেই ছিল তার অগ্রণী ভূমিকা।
শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান
তিনি ছিলেন শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। মুসলমানদের জন্য চাকরিতে ৫০% কোটা, প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা, কলেজ প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষাবৃত্তি প্রদান ছিল তার উল্লেখযোগ্য অবদান।
গল্প আর কিংবদন্তি
শের-ই-বাংলাকে ঘিরে রয়েছে নানা গল্প—এক বসায় ২০টি ডাব, ৪৫টি আম খাওয়া, খালি হাতে বাঘ মারার কাহিনি, মাতৃভাষা ছাড়াও ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় দক্ষতা। দাবা খেলায় নাকি তিনি কখনো হারেননি!
অবসান ও অনন্ত স্মৃতি
১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন বাংলার প্রিয় ‘হক সাহেব’। আজও তার জীবন, সংগ্রাম ও আদর্শ বাংলার মাটি, কৃষক এবং মানবিক রাজনীতির অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।








