দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠী সামিট গ্রুপ এবং এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খান ও তার পরিবারের সদস্যরা বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন বলে একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই পাচার করা অর্থ দিয়ে তারা বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল বাড়ি, শিপিং ব্যবসা, হোটেল ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় বড় বিনিয়োগ করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনে, বিদেশে বিনিয়োগ করতে হলে পূর্বানুমতি আবশ্যক। তবে সামিট গ্রুপ এই নিয়ম না মেনে অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) যৌথভাবে বিষয়টি তদন্ত করছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামিটের পক্ষ থেকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এই অর্থ ব্যবহার করে তারা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে ভিলা, অ্যাপার্টমেন্ট, বিলাসবহুল হোটেল ও বিপণিবিতান প্রতিষ্ঠা করেছে।
ফোর্বস ম্যাগাজিনের ২০২৪ সালের তালিকা অনুযায়ী, আজিজ খান বর্তমানে সিঙ্গাপুরের ৪১তম ধনী ব্যক্তি। তার সম্পদের পরিমাণ ১.১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আজিজ খান সিঙ্গাপুরের স্থায়ী বাসিন্দা এবং তার পরিবারের সদস্যরাও একই দেশের নাগরিক।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে আজিজ খানের নাম উঠে আসে। তবে সে সময় দুর্নীতির অভিযোগে কার্যকর তদন্ত শুরু হলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর পুনরায় তদন্ত শুরু হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “বিদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনুমতি না নেওয়া এবং ব্যাংক চ্যানেলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অর্থ পাঠানো সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।” তিনি আরও জানান, এ ধরনের পাচারের মাধ্যমে দেশে আর্থিক ঝুঁকি বাড়ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ন কমে যাচ্ছে।
সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খান রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি পরিবারের সদস্য। তার ভাই ফারুক খান ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী। এছাড়া সামিট কমিউনিকেশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ফরিদ খান আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ) প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)–এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সামিট গ্রুপ অর্থ পাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রচুর আর্থিক অনিয়ম করেছে। বর্তমান সরকারের উচিত তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া এবং প্রকৃত তদন্ত নিশ্চিত করা।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারিভাবে মাত্র ২০টি প্রতিষ্ঠানকে বৈধভাবে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সামিট গ্রুপের বিপুল বিনিয়োগ কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে কোনো তথ্য নেই। সরকারের প্রকাশিত শ্বেতপত্র অনুসারে, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে।
এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /