সফর শেষে প্রধান উপদেষ্টাকে যে বার্তা দিলো জাপান

আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করেছে জাপান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইশিবা শিগেরু এ বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। গত ৩০ মে শুক্রবার, টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এ আলোচনা হয়।
বৈঠকে দুই নেতা অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, মানবসম্পদ উন্নয়ন, রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা করেন। আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রসঙ্গে শিগেরু জানান, জাপান চায় বাংলাদেশ এমন একটি অবস্থান নিক যেখানে আঞ্চলিক ঐকমত্য ও শান্তি বজায় থাকে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমদ মনে করেন, জাপানের এই বার্তার পেছনে রয়েছে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক। করিডর সংক্রান্ত কিছু বিষয় এবং আরাকান আর্মি ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানের প্রতি ইঙ্গিত করে জাপান চায় আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাংলাদেশ সমন্বয় রেখে চলুক।
ছয়টি সমঝোতা স্মারক ও ঋণ-অনুদান চুক্তি
প্রধান উপদেষ্টার সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
- বাংলাদেশ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ও জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (JBIC) মধ্যে চুক্তি
- বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (BSEZ)-এ জমি ইজারা নিয়ে ওনোডা ইনকরপোরেশন এবং ন্যাক্সিস কোম্পানি লিমিটেড-এর সঙ্গে পৃথক দুটি চুক্তি
- গ্লাগিট, মুসাশি সেইমিৎসু ও বিআইডিএ-এর মধ্যে শিল্প খাত উন্নয়ন সংক্রান্ত চুক্তি
- সাইফার কোর কোম্পানির ২০ মিলিয়ন ডলারের তথ্য নিরাপত্তা বিনিয়োগ
- জাইকা ও বিআইডিএ-এর মধ্যে প্রশাসনিক সহযোগিতা চুক্তি
১০৬ কোটি ৩০ লাখ ডলারের ঋণ ও অনুদান
জাপান সরকার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, রেল উন্নয়ন ও জলবায়ু স্থিতিশীলতায় ১০৬ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে—
- ৪১ কোটি ৮০ লাখ ডলার উন্নয়ন নীতি ঋণ (জলবায়ু ও অর্থনৈতিক সংস্কারে)
- ৬৪ কোটি ১০ লাখ ডলার জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী রেলপথকে ডুয়াল গেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরের জন্য
- ৪২ লাখ ডলার বৃত্তি বাবদ অনুদান
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা
যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বিষয়ে বাংলাদেশ ও জাপান নীতিগতভাবে একমত হয়েছে এবং দ্রুত চুক্তি সম্পন্নের প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে। একইসঙ্গে, বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে পাঁচটি টহল নৌকা সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান।
ইন্দো-প্যাসিফিক ও কৌশলগত অংশীদারত্ব
দুই দেশই মুক্ত, শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের লক্ষ্যে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছে। এ ছাড়া, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (EPA) দ্রুত সম্পন্ন করতে আলোচনার গতি বাড়াতে সম্মত হয়েছে উভয়পক্ষ।
বিনিয়োগে উৎসাহ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগকে আরও উৎসাহিত করতে বিডা’র ওয়ান স্টপ সার্ভিস, প্রিপেইড গ্যাস মিটার, ব্যাটারিচালিত সাইকেল কারখানা এবং তথ্য নিরাপত্তার পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন সংক্রান্ত এমওইউ-গুলোকে স্বাগত জানানো হয়।
মানবসম্পদ ও বাস্তুচ্যুত জনগণ
উভয়পক্ষ বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা আরও বাড়াতে সম্মত হয়েছে। রোহিঙ্গা শব্দটি উল্লেখ না করে যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, বাস্তুচ্যুত জনগণের নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
কৃতজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতা
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস জাপান সরকারের প্রতি বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প বৃদ্ধি বেল্ট (BIG-B) এবং মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগ (MDI)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অব্যাহত সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-জাপান কৌশলগত সম্পর্ক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। উভয় দেশই দ্বিপাক্ষিক অংশীদারত্বকে আরও জোরদার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।








