৫ আগস্ট ২০২৪— বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি লাল অক্ষরে লেখা দিন।
এই দিনেই দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসন, শোষণ ও নির্যাতনের অবসান ঘটে। অবসান ঘটে একটি একনায়কতান্ত্রিক সরকারের। জন্ম হয় এক নতুন বাংলাদেশের— যা অনেকেই বলছেন, “দ্বিতীয় স্বাধীনতা”, কেউ বলছেন “পুনর্জন্ম”।
আন্দোলনের সূচনা হয় শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার নিয়ে বিক্ষোভের মাধ্যমে। কিন্তু দিন গড়াতে গড়াতে তা রূপ নেয় একদফা দাবিতে— “শেখ হাসিনার পদত্যাগ চাই”।
যেখানে ছাত্রদের মুখে একটাই স্লোগান ধ্বনিত হচ্ছিল—
> “দফা এক, দাবি এক— শেখ হাসিনার পদত্যাগ”।
শুধু শিক্ষার্থী নয়, একে একে সর্বস্তরের মানুষ এই আন্দোলনে যুক্ত হন। স্বৈরাচারী দমননীতি, সীমাহীন দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব আর ভারতীয় হস্তক্ষেপ— সব কিছুর বিরুদ্ধে যেন একসাথে বিস্ফোরণ ঘটে।
এই আন্দোলনকে কবি সুকান্তের ভাষায় তুলনা করা যায় “একটি দেশলাই কাঠির” সাথে, যার আগুনে পুড়ে যায় পুরো শাসনব্যবস্থা।
রাষ্ট্র যখন গণতন্ত্রহীন একনায়কতন্ত্রে রূপ নেয়, তখন এই আন্দোলন হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের মুক্তির আশা।
গুম, খুন, নির্যাতন— কিছুই এই তরুণদের থামাতে পারেনি। বরং তারা এগিয়ে গেছে দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে।
এই দিনটির তাৎপর্য আরও গভীরভাবে অনুধাবন করতে হলে ফিরে তাকাতে হয় ২০১৮ সালের দিকে, যখন “নিরাপদ সড়ক আন্দোলন” শুরু হয় রাজধানীর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর।
তারপর আসে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন।
দুইটি আন্দোলনের ভিন্ন লক্ষ্য থাকলেও, পদ্ধতি ও প্রভাব ছিল অভিন্ন—
ছাত্ররা নিজেদের অধিকার আদায়ে রাজপথে নেমে আসে, রাজনীতির বাইরে গিয়েও তাদের কণ্ঠ হয়ে ওঠে জাতির চেতনার প্রতীক।
২০১৮ সালে শেখ হাসিনা সরকার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমনের নামে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকরিতে কোটা পুরোপুরি বাতিল করে। যদিও এতে সমাধান আসেনি বরং তৈরি হয় নতুন বৈষম্য।
এ সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে ২০২৪ সালের ৫ জুন উচ্চ আদালত পূর্ববর্তী আদেশকে ‘সংবিধান পরিপন্থি’ ঘোষণা করে।
ফলে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল হয়। আর এখানেই যেন আগুনে ঘি পড়ে।
৬ জুন থেকেই শুরু হয় প্রতিবাদ। ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ঈদের বিরতির পর, ১ জুলাই থেকে শুরু হয় পূর্ণাঙ্গ “বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন”।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সমাবেশ, বিক্ষোভ ও দাবিনামা পেশ করা হয়।
তাদের আল্টিমেটাম ছিল— ৪ জুলাইয়ের মধ্যে দাবি না মানলে দেশজুড়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
দাবি না মানায় ৫ আগস্ট পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয়। জনগণের চাপ আর ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ অবস্থান—
সবকিছুর সামনে ভেঙে পড়ে একনায়কতান্ত্রিক আওয়ামী রেজিম।
ছাত্র-জনতার ৩৬ দিনের দীর্ঘ লড়াইয়ে অর্জিত এই মুক্তির দিন ইতিহাসে জায়গা করে নেয় “৩৬ জুলাই” নামে।
এটি শুধু একটি আন্দোলনের দিন নয়—
এটি একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর ঘোষণা, একটি নতুন ভোরের সূচনা।
—
এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /