‘জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার হবেই’—নারায়ণগঞ্জে ড. আসিফ নজরুল

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত গণহত্যার বিচার দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে এবং এ বিচার বর্তমান সরকারের মেয়াদকালেই সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।

সোমবার (১৪ জুলাই) বিকেল ৪টায় নারায়ণগঞ্জের হাজীগঞ্জ এলাকায় জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন শেষে এক বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই সরকারের শাসনামলেই জুলাই গণহত্যার বিচার হবে। এতে কোনো গাফিলতি থাকবে না।”

শহীদ পরিবারের উদ্দেশে ড. নজরুল বলেন, “আপনাদের অন্তরে যে আর্তনাদ—ভাইদের চোখ উপড়ে ফেলা, অঙ্গহানি, নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার কোথায়—আমি আপনাদের জানাতে চাই, এই হত্যার বিচার হবেই।”

জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে তিনি বলেন, “গত বছরের জুলাইয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা মাত্র দুই সপ্তাহেই জনগণের আন্দোলনে ভেঙে পড়ে।”

আইজিপিসহ বিভিন্ন অপরাধের মামলার অগ্রগতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, “নারায়ণগঞ্জের মামলাগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে আমি খোঁজ নিয়েছি। এসপি সাহেব জানিয়েছেন, চার্জশিট দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ৫ আগস্টের আগেই অনেক মামলার চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হবে। প্রয়োজনে দ্রুত বিচার আইনে এসব মামলার বিচার করা হবে।”

ড. আসিফ নজরুল আরও বলেন, “আমরা এক সময় পরিবারের মতো ঐক্যবদ্ধ ছিলাম—দুঃখ, ক্ষোভ, সাহস ও আত্মত্যাগে। সেই ঐক্য থেকেই আমরা একটি শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন, প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে চাই।”

সাম্প্রতিক চাঁদাবাজি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, “জুলাইয়ের মতো ঐক্য থাকলে চাঁদাবাজ ও বিশৃঙ্খল শক্তিকে প্রতিহত করা সম্ভব। সরকার যেমন দায় নেবে, তেমনি জনগণকেও স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রশাসন এতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।”




এদেশে ভারত-পাকিস্তানপন্থি নয় বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি হতে হবে: নাহিদ ইসলাম

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশে ভারত কিংবা পাকিস্তানপন্থি কোনো রাজনীতি চলবে না। বাংলাদেশপন্থাই হবে একমাত্র রাজনীতির পথ। তিনি বলেন, “এক সময় পাকিস্তানপন্থিদের পুনর্বাসন করা হয়েছিল, এখন আবার মুজিববাদ ও চাঁদাবাজদের পুনর্বাসন চলছে। তবে বাংলাদেশে মুজিববাদ ও চাঁদাবাজদের রাজনীতি চলতে দেওয়া হবে না।”

সোমবার (১৪ জুলাই) বরগুনা সদর রোডে প্রেসক্লাব-সংলগ্ন এলাকায় ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত এক পথসভায় এসব কথা বলেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরাই সেই তরুণ যারা জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়ে শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিলাম। বিগত ১৬ বছর ধরে দেশে এক ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায় ছিল, যারা গুম, দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ সব অপকর্ম করেছে। সেই স্বৈরাচারী সরকার থেকে দেশকে মুক্ত করতে ছাত্র-তরুণরা রাজপথে নেমেছিল।”

তিনি অভিযোগ করেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের পর চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজরা আবারও ক্ষমতা দখল করেছে। আমরা যে ব্যবস্থার পতন চেয়েছিলাম, সেই ব্যবস্থাকেই আবার টিকিয়ে রাখা হচ্ছে।”

গণতন্ত্র ও সুশাসনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা সংস্কার চাই, গণহত্যার বিচার চাই, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন চাই এবং প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার আওতায় আনতে চাই। বাংলাদেশে আর কোনো স্বৈরাচার ফিরে আসবে না।”

সোহাগ হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, “বরগুনার সন্তান সোহাগকে ঢাকায় নির্মমভাবে পাথর মেরে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যার পেছনে রয়েছে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা ও একটি দলের চাঁদাবাজদের প্রশ্রয়। দেশের প্রতিটি নাগরিককে এই ঘটনার প্রতিবাদ করতে হবে।”

বরগুনার অবহেলিত উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বরগুনাবাসী দুর্যোগ, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে প্রতিনিয়ত টিকে থাকছে। কিন্তু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে বরগুনায় তেমন কিছুই হয়নি। লবণাক্ততা কৃষিকে ধ্বংস করছে, সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে।”

তিনি আরও বলেন, “বঙ্গোপসাগর আমাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার জায়গা। বরগুনাকে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। উপকূল সুরক্ষা, নদী রক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নয়নে এনসিপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

পথসভায় উপস্থিত ছিলেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাসনীম জারা, দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা।




সংরক্ষিত নারী আসন দ্বিগুণ ও বিদ্যমান পদ্ধতিতে ভোট চায় বিএনপি: সালাহউদ্দিন

সংরক্ষিত নারী আসন দ্বিগুণ করে ১০০টি করার প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে দলটি সংবিধানে বিদ্যমান পদ্ধতিতেই এসব আসনে ভোটের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে।

সোমবার (১৪ জুলাই) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বৈঠক শেষে এক ব্রিফিংয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, “নারীর ক্ষমতায়ন ও সংসদে প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে আমরা সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০-তে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছি। তবে আমরা চাই এসব আসনে নির্বাচন হোক বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী বিদ্যমান পদ্ধতিতে।”

বিএনপি নেতা জানান, সরাসরি নারী আসনের জন্য নতুন করে ১০০টি আসন নির্ধারণ বাস্তবসম্মত নয়। একই সঙ্গে রোটেশন পদ্ধতি ও আসনের সীমারেখা নিয়ে এখনও অস্পষ্টতা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, “আমরা এখনও দলের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখতে পারিনি। আমাদের সমাজে ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে নারীরা সরাসরি রাজনীতিতে অংশ নিতে দ্বিধা বোধ করেন। তাই ধাপে ধাপে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে চাই।”

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে বিএনপি তাদের পূর্বঘোষিত ৩১ দফা প্রস্তাবের উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমরা উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছি, যাতে সমাজের মেধাবী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে পারেন।”

তবে ৬৪ জেলা ও ১২ সিটি করপোরেশন থেকে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাবকে ‘জেলা পরিষদ বা প্রাদেশিক ব্যবস্থার মতো’ উল্লেখ করে বিএনপি নেতা বলেন, “বাংলাদেশ একটি ইউনিটারি সরকার কাঠামো অনুসরণ করে। তাই এ ধরনের নির্বাচন সঠিক নয়।”

বৈঠকে উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আংশিক ঐকমত্য থাকলেও নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিন বাম দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যাচারের’ অভিযোগ আনা হয়। তবে বিএনপি এ অভিযোগের সঙ্গে একমত নয় বলে জানান সালাহউদ্দিন।




শেয়ারবাজার পুনর্গঠনে ‘দুষ্টচক্র’ ভাঙার আহ্বান আমীর খসরুর

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে সক্রিয় ও বিনিয়োগবান্ধব করে তুলতে ‘দুষ্টচক্র’ থেকে বের হয়ে ‘ভালোচক্রে’ প্রবেশের আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সোমবার (১৪ জুলাই) রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) ও ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত একটি কর্মশালায় তিনি এ কথা বলেন।

আমীর খসরু বলেন, “আমাদের পুঁজিবাজার একটি দুষ্টচক্রে পরিণত হয়েছে। এটিকে সদাচার ও নৈতিকতার চর্চার মাধ্যমে একটি সুস্থ ধারায় আনতে হবে। তবেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসবে।”

তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান বাজার কাঠামো অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রিত ও সীমাবদ্ধ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকে একটি পেশাদার ও স্বচ্ছ সংস্থায় রূপান্তর করার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ জনবল দিয়ে সংস্থাটি পরিচালনার ওপর জোর দেন।

তিনি আরও বলেন, “ভালো মানের কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং দুর্বল ও অপ্রয়োজনীয় কোম্পানিগুলোকে বাজার থেকে সরিয়ে দিতে হবে। তবেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখাবেন।”

বিএনপি ক্ষমতায় এলে বিএসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পদে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

পুঁজিবাজারকে সরকারের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ক্যাপিটাল সোর্সিং’ মাধ্যম হিসেবে আখ্যায়িত করে আমীর খসরু বলেন, “শুধু বেসরকারি খাত নয়, সরকারও এই বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনা করতে পারে। তবে সঠিক ধারণা ও কাঠামো ছাড়া তা সম্ভব নয়।”

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন—ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এ কে এম হাবিবুর রহমান, ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান, ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম এবং ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের সভাপতি গোলাম সামদানী ভূঁইয়া। সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা।




দিনপঞ্জির পাতায় আন্দোলন: ১৪ জুলাই

১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। এরপর রাতেই দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।

গণভবনে অনুষ্ঠিত সেই সংবাদ সম্মেলনে পূর্বনির্ধারিত কিছু সাংবাদিক—বিশেষ করে প্রভাষ আমিন ও ফারজানা রূপা—প্রশংসাসূচক প্রশ্ন করলে তার জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর এত ক্ষোভ কেন? মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতি চাকরি পাবে না, তাহলে রাজাকারের নাতিপুতি পাবে?” এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান আন্দোলনকারীরা।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাত ১১টার পর রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন। স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে টিএসসি এলাকা। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা মশাল মিছিল নিয়ে পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করেন।

বিশেষত রোকেয়া হলের শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এই মিছিলে। তাঁরা বলেন, “আমাদের অধিকার নিয়ে কথা বললেই যদি রাজাকার তকমা দেওয়া হয়, তাহলে এ দেশ কার?”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও রাতভর বিক্ষোভ হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাত ১২টার দিকে তাঁতীবাজার অবরোধ করে। চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ মিছিল বের করলে বাধা দেয় ছাত্রলীগ। এতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ মারধরের শিকার হন। তিনি বলেন, “আমরা অধিকার চেয়েছি, আর শেখ হাসিনা আমাদের রাজাকার বললেন। প্রতিবাদ করতেই ছাত্রলীগ হামলা করেছে।”

একই দিনে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি পেশ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল শুরু করে দুপুরে গুলিস্তান পৌঁছে সেখানে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন তারা। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিবের কাছে স্মারকলিপি জমা দেয়।

সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “সরকার কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে এক দফা দাবির বাস্তবায়নে ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছি। প্রয়োজনে জরুরি সংসদ অধিবেশন ডেকে আইন পাস করতে হবে।”

ঢাকার বাইরে অধিকাংশ জেলাতেও শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে কর্মসূচি পালন করেন। তবে গাইবান্ধা সরকারি কলেজে ছাত্রলীগ হামলা চালিয়ে ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে এবং শিক্ষার্থীদের মারধর করে। এতে অন্তত ৫ জন আহত হন।

 




দিনপঞ্জির পাতায় আন্দোলন: ১৩ জুলাই

সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কার দাবিতে আন্দোলনের শুরু থেকে শিক্ষার্থীদের ভয় দেখিয়ে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়। ছাত্রলীগ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হলে তালাবদ্ধ করে রাখার অপচেষ্টা হয়। তাতেও কাজ না হওয়ায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও ভিক্টোরিয়া কলেজসহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করানো হয়। তবে এসব অপকৌশল শুধু যে, ব্যর্থ হয় তাই নয় উল্টো শিক্ষার্থীদের আরও বেশি বিক্ষুব্ধও করে তোলে।

এরই ধারাবাহিকতায় সরাসরি পুলিশকে ব্যবহার করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর আঘাত ও যানবাহন ভাঙচুরের অভিযোগে রাজধানীর শাহবাগ থানায় মামলা করা হয়। অজুহাত হলো শাহবাগে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে শিক্ষার্থীদের অবস্থান নেওয়া। অন্যদিকে এদিন আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসরদের বেশ সরব দেখা যায়। তারা বিভিন্ন মাধ্যমে পরামর্শ দিতে থাকে যে, ‘এখন আন্দোলন থামিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরা উচিত’।

তবে অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যুবরা ২৪ ঘন্টার মধ্যে পুলিশের মামলা প্রত্যাহার এবং কোটাবৈষম্য নিরসনে সংসদে আইন পাসের লক্ষ্যে জরুরি অধিবেশন আহ্বানের দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

১৩ জুলাই শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে সংবাদ সম্মেলনে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন হাসনাত আবদুল্লাহ।

তিনি বলেন পরের দিন, বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে গণপদযাত্রা শুরু হয়ে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে গিয়ে স্মারকলিপি প্রদান করা হবে।

গণপদযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, নজরুল ইসলাম কলেজ, তিতুমীর কলেজ, বদরুন্নেসা সরকারি কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করবেন বলেও জানানো হয়। আর অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ নিজ পদযাত্রা নিয়ে একই দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দেবে।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, চলমান বাংলা ব্লকেড কর্মসূচিকে জনভোগান্তির কারণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে। আমরা বলতে চাই, যদি প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করতে না পারেন, তাহলে একটি সন্তানবিবর্জিত পৃথিবী হবে। সুতরাং, সুন্দর পৃথিবীর জন্য সাময়িক যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে।’

মামলার বিষয়ে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেছিলেন, কোনো ধরনের ক্ষতি হয়নি। তাহলে হঠাৎ অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দেওয়া হলো কেন, সে বিষয়ে আমরা জবাবদিহি চাইছি। ছাত্রসমাজকে এ রকম মামলা-হামলার ভয় দেখিয়ে লাভ হবে না বলেও সাফ জানিয়ে দেন নাহিদ ইসলাম।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার পুলিশের রমনা জোনের এডিসি শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আমাদের সাঁজোয়া যান ছিল, শিক্ষার্থীরা তার পাশে দাঁড়িয়ে নাড়িয়ে ছবি তুলেছে। এখানে কোনো ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।

অথচ এর পরেরদিন সরকারি কাজে বাধা, পুলিশ সদস্যদের ওপর আঘাত ও যানবাহনের ক্ষতি করার অভিযোগে শুক্রবার মামলা দায়ের হয়। এতে আসামির সংখ্যা ও নাম-পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি।

এজাহারে বলা হয়, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ছিল। সে জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে অজ্ঞাতনামা ছাত্ররা জড়ো হয়ে বিভিন্ন হলে ঘুরে বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে শাহবাগ মোড়ের দিকে আসে। একপর্যায়ে তারা শাহবাগ মোড় অতিক্রম করে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলে এবং সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়। কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও এলোপাতাড়ি মারধর করে।

এজাহারে আরও বলা হয়, সেদিন দুটি যানের প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।

এদিন, ছাত্রদের আন্দোলন থামানো উচিত বলে বক্তব্য দেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেন, জনদুর্ভোগ মেনে নেওয়া হবে না। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে না ফিরলে তাদের ঘরে ও ক্লাসে ফেরাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকার।

আরও এক ধাপ বাড়িয়ে এদিন, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে ক্ষমতা, আমরা সেটাই করব। তিনি আরও বলেন, আন্দোলনে অনুপ্রবেশকারী ঢুকেছে কিনা, ঘটনাটি অন্যদিকে ধাবিত করার চেষ্টা চলছে কিনা-এসব নিয়ে ডিবির টিম ও পুলিশ কাজ করছে।

১৩ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রলীগ সরকারি চাকরিতে কোটা ইস্যু নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তাবনা সংগ্রহ, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয় এমন কর্মসূচি পরিহার করার জন্য ‘পলিসি অ্যাডভোকেসি’ ও ‘ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন’ শুরু করে।

এসময় তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের সভাপতি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পেশাদার আন্দোলনকারীরা হিসেবে অভিহিত করে বলে, এরা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের জন্য রাজপথে রয়েছে।

তবে এমন কর্মসূচিকে আন্দোলন দমনের পাল্টা কর্মসূচি বলেই মনে করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। অন্যতম সমন্বয়ক বাকের মজুমদার জানান, শিক্ষার্থীরা যেন কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নিতে না পারেন, সেজন্য একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে কর্মসূচি দিয়ে রাখে ছাত্রলীগ। সেখানে অংশ না নিলে রাতে সেই শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ছাত্রলীগের পাশাপাশি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

এদিন, দুপুরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের সঙ্গে দেখা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। দুপুরে প্রক্টরের সঙ্গে দেখা করার পর কোটা সংস্কারের আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান সেখানকার নেতারা। তবে অন্য শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে জড়ো হওয়া শুরু করলে মূল ফটকে তালা লাগিয়ে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ সময় প্রশাসনের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের বের হতে নিষেধ করা হয়।

অপরদিকে, মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালসহ সাত দফা দাবিতে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন ও প্রজণা ৭১-এর সভাপতি আজিজুর রহমান।




জিয়াউর রহমানের আদর্শ দল থেকে হারিয়ে গেছে: হেফাজতের কড়া সমালোচনা বিএনপিকে

রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। একইসঙ্গে, সংগঠনটি বিএনপিকে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজির রাজনীতি থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।

শনিবার হেফাজতে ইসলামের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব সাজেদুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, “বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর লাগাম টেনে না ধরলে চাঁদাবাজি ও খুনোখুনি রাজনীতি বন্ধ হবে না। জিয়াউর রহমানের যে আদর্শ ও নীতিবোধ, তা বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যে অনুপস্থিত।”

নেতারা আরো বলেন, “চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এখন ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারকেও পুলিশ বাহিনীতে মৌলিক সংস্কার আনতে হবে। ফ্যাসিবাদী ও দুর্নীতিবাজ সদস্যদের বরখাস্ত করে পুলিশের মধ্যে নতুন নিয়োগ দিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির দায় সরকার এড়াতে পারে না।”

তারা বলেন, “সরকার ও প্রশাসন যেখানে ব্যর্থ, সেখানে দেশপ্রেমিক জনগণ এবং ‘জুলাই বিপ্লবের’ ছাত্র-জনতা আবারও রুখে দাঁড়াবে। গত বছরের জুলাই মাসে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে দেশ। সেই বিপ্লব নতুন বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে এসেছে। সেই নতুন প্রজন্মকে অবজ্ঞা করা হলে পরিণাম ভালো হবে না।”

মঙ্গলবার রাতে মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে সোহাগ (৩৯) নামের ভাঙারি ব্যবসায়ীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, হত্যার আগে তাকে পিটিয়ে, ইট-পাথর ছুড়ে ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। এক পর্যায়ে তাকে বিবস্ত্রও করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়।

ঘটনার পর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানান, এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের একাধিক নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল হত্যায় জড়িতদের বহিষ্কার করেছে।

হেফাজতের বিবৃতিতে বলা হয়, “যারা চাঁদাবাজি ও হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে চায়, তারা জিয়াউর রহমানের আদর্শের প্রতি অবিচার করছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে নতুন প্রজন্ম আবারও রাজপথে নামবে।”

বিবৃতিতে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পরিবেশ রক্ষায় সকল পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।




“পুরোনো বন্দোবস্ত আর চলবে না, তরুণরা পরিবর্তন চায়: নাহিদ ইসলাম”

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “আমরা কোনো দলের বিরুদ্ধে কথা বলি না, বলি মাফিয়া আর চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে। যারা পুরোনো বন্দোবস্ত ও দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখতে চায়, তাদের আর মেনে নেবে না দেশের জনগণ।”

শনিবার (১২ জুলাই) রাতে ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’র অংশ হিসেবে ১২তম দিনে বাগেরহাট শহরের রেল রোড এলাকায় আয়োজিত পথসভায় এসব কথা বলেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, “এই তরুণ প্রজন্ম আর কোনো নির্বাচন ব্যবস্থার ভাগ-বাটোয়ারা চায় না। রাষ্ট্র সংস্কার ও দেশ পুনর্গঠনের যে আন্দোলন আমরা শুরু করেছি, তার দরজা সবার জন্য খোলা। কিন্তু কেউ যদি এখনও সেই সংস্কারের পথে না আসে, দুর্নীতিগ্রস্ত পুরোনো সিস্টেম ধরে রাখতে চায়, তাহলে জনগণ তাদের আর বরদাশত করবে না।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা গণঅভ্যুত্থান করেছিলাম দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও মাফিয়াদের বিরুদ্ধে। সেই সিস্টেমকে এখনো উৎখাত করা যায়নি। তাই আবারও রাজপথে নেমেছি। শহীদদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা থেকেই বলছি, এই সিস্টেমের পরিবর্তন করবই। ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করতেই হবে, আর তা জুলাই-আগস্টের মধ্যেই।”

পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “আপনাদের জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে। যদি দলবাজ প্রশাসনের মতো আচরণ করেন, তাহলে ইতিহাসের বিচার এড়াতে পারবেন না। ফ্যাসিবাদের সময় যারা দলবাজ ছিল, তাদের পরিণতি থেকে শিক্ষা নিন।”

সভায় আরও বক্তব্য রাখেন—জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম সচিব ডা. তাসনিম জারা, সিনিয়র মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আবিদ এবং এনসিপি বাগেরহাটের প্রধান সমন্বয়কারী সৈয়দ মোরশেদ আনোয়ার প্রমুখ।




মিটফোর্ড হত্যাকাণ্ডে প্রশ্ন তুললেন তারেক রহমান: “খুনিকে কেন ধরা হচ্ছে না?”

পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে সংঘটিত ব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি খুন করেছে, তাকে এখনো কেন গ্রেফতার করা হয়নি?”

শনিবার (১২ জুলাই) ছাত্রদল আয়োজিত ‘জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান, শোক ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে গুলশানের হোটেল লেকশোরে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, নিহতের সঙ্গে হয়তো যুবদলের যোগসূত্র ছিল, তবে হত্যাকারীকে অন্য জায়গা থেকে আনা হয়েছিল বলে তথ্য পেয়েছেন তারা। কিন্তু তার নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি এবং এখনও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি—এটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তিনি বলেন, “আমাদের পক্ষ থেকে কখনোই বলা হয়নি অমুককে ধরা যাবে না। বরং আমরা সব সময় বলে এসেছি, অন্যায় করলে যে-ই করুক, আইনের আওতায় তার বিচার হতেই হবে। কিন্তু প্রশাসন কেন খুনিকে ধরছে না? তাদের কী ভয় আছে?”

“আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তো বিএনপি চালায় না”—সরকারের সমালোচনা

তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তো বিএনপি নিয়ন্ত্রণ করে না। সরকারের অধীনেই তারা কাজ করে। তাহলে কেন সরকার খুনিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না? তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের ব্যর্থতায় প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে জুলাই সনদ জমা দেওয়ার দাবি

অনুষ্ঠানে তারেক রহমান জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে বিএনপি তিন মাস আগেই ‘জুলাই সনদ’ সংক্রান্ত লিখিত প্রস্তাব পেশ করেছে। তিনি বলেন, “আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নেই, কিন্তু আমাদের মতামত চাওয়া হয়েছিল, আমরা স্পষ্টভাবে তা লিখিতভাবে জমা দিয়েছি।”

ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত, স্বৈরাচারের ভূতের উপস্থিতি

তিনি বলেন, “আজও ষড়যন্ত্র চলছে এবং নতুন করে শুরু হচ্ছে।” প্রশাসনের ভেতর এখনো ‘স্বৈরাচারের ভূত’ লুকিয়ে আছে বলেও মন্তব্য করেন তারেক রহমান।

তিনি বলেন, “যদি আমরা সচেতন না হই, এই দেশ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।”

বিচারের প্রতিশ্রুতি ও জাতীয় স্বার্থে ঐক্যের আহ্বান

তারেক রহমান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা হবে। এটি বিএনপির নৈতিক প্রতিশ্রুতি।

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ কারো একার দেশ নয়। এটি ২০ কোটি মানুষের। তাই আমাদের সবাইকে একসঙ্গে চিন্তা করতে হবে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে।”

স্বাধীনতা যুদ্ধ ও রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিভিন্ন দলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। বলেন, “বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যখন স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন, তখন অনেক রাজনৈতিক দল বিদেশে পালিয়ে গিয়েছিল।”

তিনি অভিযোগ করেন, “আজও দেখা যায় কিছু দল বাংলাদেশে বসে অন্য দেশের গান গায়। কিন্তু বিএনপি সর্বদা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের ক্ষমতায় বিশ্বাস করে।”

ক্ষমতায় গেলে ৩১ দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার

অনুষ্ঠানে তিনি বিএনপির ৩১ দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সঞ্চালনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ১৪২ জনের পরিবার সদস্যরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং তাদের কষ্ট, স্মৃতি ও বিচার চাওয়ার কথা তুলে ধরেন।




তারেক রহমান: ‘হত্যা-নৈরাজ্যে সরকার মদদ দিচ্ছে, মব সৃষ্টি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চায়’

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান অভিযোগ করেছেন, দেশের সাম্প্রতিক সময়ের হত্যা ও নৈরাজ্যকারীদের সরকার প্রশ্রয় দিচ্ছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা ‘মব’ তৈরি করছে, তাদের কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না?

শনিবার (১২ জুলাই) রাজধানীর গুলশানের লেক শোর গ্র্যান্ড হোটেলে আয়োজিত ছাত্রদলের এক অনুষ্ঠানে লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে এসব মন্তব্য করেন তিনি। ‘জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে’ ছাত্রদলের শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য দেন।

পুরান ঢাকার ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, “ফুটেজে যাকে হত্যাকারী হিসেবে দেখা গেছে, তাকে কেন এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি? আমরা কী ধরে নেব, সরকার বিভিন্নভাবে মব সৃষ্টি করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চায়?”

তিনি বলেন, “ধীরে ধীরে দেশে অদৃশ্য এক শক্তির উপস্থিতি দৃশ্যমান হচ্ছে। যারা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, বিএনপি তাদের কোনো প্রশ্রয় দেবে না। এই অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।”

সব ধরনের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, “আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাসী। আমাদের পক্ষ থেকে কখনোই বলা হয়নি অমুককে ধরা যাবে না বা তমুককে ধরা যাবে না। বরং আমরা বরাবরই বলেছি—আইনের দৃষ্টিতে অন্যায়কারীর বিচার হোক। সে দলের কেউ হলেও কোনোরকম ছাড় দেওয়া হবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকার কেন এখনো অপরাধীদের গ্রেপ্তার করছে না?”

নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “নতুন করে আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। আমাদের চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন, সেই যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি।”

বিএনপি সংলাপে আপসহীন—এমন প্রচারণা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, “পত্রিকায় পড়ছি, বিএনপি সংস্কারের এই অংশটি মানছে না, সেটি মানছে না। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, কিছু দল সব কিছু মেনে নিচ্ছে। তাহলে আলোচনার দরকার কী? সরকার সরাসরি বলে দিলেই হতো যে, কী কী মানতে হবে। আলোচনা ডাকা হয়েছে, অথচ সেই আলোচনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে কিছু ব্যক্তি এবং মিডিয়ার একটি অংশ।”

তিনি আরও বলেন, “বিএনপি আলোচনায় এসেছে যৌক্তিক কারণে। সমঝোতার কথা বললেই সবকিছু মেনে নেওয়ার মানে হয় না।”