বরিশাল অফিস :: অধিক লাভের আশায় স্বাদ ও পুষ্টিগুনে পরিপূর্ন ফল ড্রাগন এখন পরিনত হয়েছে বিষে। কয়েক বছর ধরে ড্রাগন ফল বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর বিদেশী এ ফলটি এখন বাংলাদেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। দেশের প্রায় সব স্থানে এই ফলটির চাষ হলেও বরিশালের ফলের আড়তে বেশিরভাগ ড্রাগন ফল আসে রাজধানী থেকে এবং এগুলো উৎপাদন হয় দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায়। তবে প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত কোন ড্রাগন ফল খুজে পওয়া যায়নি বরিশালের ফলের আড়ৎসহ কোন ফলের দোকানে। কম দামে হলেও সব স্থানে বিক্রি হচ্ছে বিষাক্ত টনিক ব্যাবহার করে উৎপাদন করা ১ থেকে দের কেজি পর্যন্ত ওজনের এক একটি ড্রাগন ফল। ক্রেতারা না চেনায় আর দামে সস্তা হওয়ায় পকেটের টাকা দিয়ে এখন বিষ কিনে খাচ্ছে নগরীর ক্রেতারা। বিক্রেতাদের দাবি চাইলেও বিক্রি করতে পারছেন না প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত ড্রাগন ফল। কারন লাভ বেশি হওয়ায় ও না বোঝা ক্রেতাদের প্রাকৃতিক এর থেকে টনিক দেয়া ড্রাগনের প্রতি আকর্ষন বেশি থাকায় এখন তারাও বিক্রি করছেন। চিকিৎসকদের মতে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বাইরে কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত যেকোনো পণ্যেরই স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকে। আর টনিক ব্যাবহৃত ড্রাগন অবশ্যই মারাত্মক ক্ষতিকর।
সূত্র মতে, দেশের কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ড্রাগন ফলের আলাদা চারটি প্রজাতিও উদ্ভাবন করেছেন। এগুলো হচ্ছে বারি-১, যা কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট উদ্ভাবন করেছে। এছাড়া কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ ও জার্মপ্লাজম সেন্টার মিলিতভাবে তিন প্রজাতির ড্রাগন ফল উদ্ভাবন করেছে। এগুলো হচ্ছে বাউ ড্রাগন-১, বাউ ড্রাগন-২ এবং বাউ ড্রাগন-৩। দেশীয়ভাবে উৎপাদন বাড়ার কারণে দামও কমে এসেছে এক সময়ের দামি এই ফলটির। তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘টনিক’ ব্যবহার করে উৎপাদিত ড্রাগন ফল এবং এর স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে। অনেকে বলছেন, এসব ফল থেকে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুকি দেখা দিতে পারে।
একজন ড্রাগন ফল চাষীর সাথে আলাপ করে জানা গেছে, ১০ বছর আগে ২০১৪ সালে ইউটিউব দেখে ড্রাগন ফল গাছের চারা সংগ্রহ করে বাগান গড়ে তোলেন তিনি। একবার ড্রাগন ফলের বাগান করলে এবং সেটি সঠিকভাবে চাষাবাদ করা হলে প্রায় এক শতাব্দী ধরে ফল পাওয়া সম্ভব।‘যে ডালটা পুরাতন হয়ে যাবে, ওই ডালটা কেটে দিলে উপর দিয়ে নতুন ডাল বের হয়। এভাবে রি-শাফল করে যদি কেউ কাটে সেক্ষেত্রে গাছ যতদিন চান ততদিন রাখতে পারবে।’ জুনের পর থেকে বছরের বাকি সময় ড্রাগন ফলের বেশ ভালো দাম পাওয়া যায় বলেও জানান তিনি। টনিক ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, টনিক ব্যবহার করে ড্রাগন ফল চাষ করেন এমন কয়েকজন চাষির সাথে পরিচয় রয়েছে তার। আর তাদের সাথে আলাপ করেই নিজের বাগানে টনিক ব্যবহার করেন না তিনি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, যে চাষিরা ব্যবহার করেছে তাদের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, এই টনিক ব্যবহার করলে প্রথমে এক-দুই বছর ভালো ফলন পাওয়া গেলেও পরে ফলন কমে যায়। এছাড়া গাছও দুর্বল হয়ে পড়ায় সার ও খাবার বেশি দিতে হয়। একইসাথে বড় ড্রাগন ফলের তুলনায় ছোট ড্রাগন ফলে ভালো দাম পাওয়া যায় বলেও জানান এই চাষী। তিনি বলেন, ‘এই টনিক সম্ভবত ভারত থেকে আসে। চুয়াডাঙ্গা, কালীগঞ্জের দিকে এই টনিক বেশি ব্যবহার হয়।
কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের সূত্র মতে, সম্প্রতি ড্রাগন চাষে এই টনিক ব্যবহারের বিষয়টি জানতে পেরেছেন তারা। সীমান্ত এলাকার কিছু কৃষক এই টনিক ব্যবহার করছে। এরইমধ্যে এই ড্রাগন ফল এবং যে টনিক ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলোর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলোর রাসায়নিক পরীক্ষা করে দেখা হবে। টনিকটা হচ্ছে এক ধরণের হরমোন। এটা গাছে ব্যবহার করলে তার বৃদ্ধি বেশি ও দ্রুত হয়। এই পদ্ধতির ব্যবহার বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট উৎসাহিত করে না। ড্রাগন ফল উৎপাদনের জন্য যে টনিক ব্যবহার করা হচ্ছে তার নাম হচ্ছে জিএ৩ বা জিবারেলিক এসিড থ্রি। এটি মূলত এক ধরণের হরমোন। তবে এটি টনিক নামেই ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছে। ‘এটি মূলত গ্রোথ হরমোন। তবে টনিক হিসেবে যেটি ব্যবহার করা হয় সেটিতে হরমোন ছাড়াও এর সাথে আরো কিছু উপাদানও মিশ্রিত করা হয়। এগুলো খুব র্যাপিড এক্সপ্যানশন করে ফ্রুটসের। অনেকগুলো বাগানেই এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। সাধারণ ও প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত ড্রাগন ফলের ওজন আড়াই শ’ থেকে সর্বোচ্চ তিন শ’ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর টনিক ব্যবহার করে উৎপাদিত ড্রাগন ফলের ওজন তিন শ’ গ্রাম থেকে শুরু করে নয় শ’ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। টনিক ব্যবহার করে উৎপাদিত ফলের বাহ্যিক আকার উদ্ভট হয়ে যায়। এই ড্রাগন ফলের রঙ পার্পেল বা লাল রঙ হয় থাকে না। সহজ করে বলতে গেলে, পুরো ফলটি আর এক রঙা থাকে না। পার্পেল বা লাল রঙের সাথে সবুজ রঙের মিশ্রণ থাকে। এক পাশে বা কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ সবুজ থাকে। কারণ পুরো এক রঙের হওয়া পর্যন্ত গাছে রাখা হলে সেটি পঁচে যায়। আর এক সাথে চার-পাঁচদিনের মধ্যে বিক্রি না হলে পুরোটাই হলুদ রঙের হয়ে যাবে। টনিক ব্যবহার করে উৎপাদিত ড্রাগন ফল হবে পানসে। মিষ্টি একেবারেই হবে না। এছাড়া স্বাদেও বেশ ভিন্ন হবে।
নগরীর একাধিক ফল বিক্রেতার সাথে আলাপ করে জানাযায়, বরিশালের কোথাও এখন টনিক ছাড়া ড্রাগন পাওয়া যায় না। টনিক দেয়া ড্রাগনের একটির ওজনই প্রায় কেজির কাছাকাছি বা তার থেকে বেশিও হয়ে থাকে। ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে এগুলো বিক্রি হয়। আর প্রকৃতিক উপায়ে উৎপদিত ড্রাগনের একটির ওজন হবে সর্বোচ্চ ৩০০ গ্রাম এবং দামও হবে কমপক্ষে ৪০০ টাকা কেজি। বেশিরভাগ ক্রেতারাই আসল ও নকলের পার্থক্য বোঝেনা। দাম কম হলেই কিনে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক না নিয়ে বেছে নেয় কম দামের টনিক ব্যাবহৃত ড্রাগন ফল। ক্রেতারা সচেতন হলে আরা বাজারে এমন ফল না এলে তারাও বিক্র করবেন না বলে দাবি করেন বিক্রেতারা।
টনিক ব্যাবহৃত ড্রাগনের স্বাস্থঝুকির বিষয়ে চিকিৎসকরা বলেন, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বাইরে কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত যেকোনো পণ্যেরই স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিভিন্ন রাসায়নিক নিরাপদ উপায়ে ব্যবহারের মাত্রা ঠিক করে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা মানা হয় না। বেশি পরিমাণে হরমোন বা রাসায়নিক ব্যবহার করা হলে তা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। অতি দ্রুত এমন ফলের উৎপাদন বিক্রয় ও বাজারজাত করন বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহন প্রযোজন।