মো:আল-আমিন, পটুয়াখালী : কুয়াকাটা পাড়ার খেনচান এবাপদাদার পেশা ধরে আছে । এক শার্ট পিস তৈরি করতে তিন দিন লাগে। বিক্রি করে ৫০০-৬০০ টাকা। নিজের দোকানে বসে বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। সরকারি পৃষ্টপোষকতার অভাব, কাঁচামাল ও উপকরণের দাম বৃদ্ধি, বাজার সঙ্কট, আধুনিক যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের অভাব এবং পুঁজিসঙ্কটে সম্ভাবনাময় এ শিল্প বন্ধ হওয়ার উপক্রম ।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পায়রা সমুদ্রবন্দর, ১৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র, নৌঘাঁটি, দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন ও কুয়াকাটা পর্যটনকেন্দ্রের অনেক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ সব উন্নয়নের সুফলভোগী হচ্ছেন স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায়ও। তাদের উৎপাদিত পণ্যের বিপণন, বিভিন্ন সেক্টরে কর্মসংস্থান ও জমির মূল্য বেড়ে যাওয়ায় তাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।
পটুয়াখালী অঞ্চলের রাখাইন নারী তাঁতীদের উৎপাদিত চাদর, শার্ট পিস, ব্যাগ, শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছাসহ বিভিন্ন বস্ত্রের কদর রয়েছে দক্ষিণাঞ্চলসহ সারা দেশে। রঙ-বেরঙের সুতা দিয়ে হস্তচালিত তাঁতে তৈরি কারুকাজ করা বস্ত্রের শীত ও ঈদে ব্যাপক চাহিদা দেখা যায়। এই শিল্পের ওপর এ অঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার রাখাইন মানুষের জীবন নির্ভর করছে ।
কলাপাড়ায় বসবাসরত ২৬টি রাখাইন পল্লীতে রয়েছে ৩১৮ পরিবার এবং জনসংখ্যা ১১৭৪ জন। তাদের বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি, ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, প্রথা ও উৎসব বাঙালিদের মুগ্ধ করে। নানাবিধ সমস্যা ও আর্থ সামাজিক প্রতিযোগিতায় হোঁচট খেতে খেতে এ অঞ্চল থেকে রাখাইন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমতে থাকে।
১৮৮৪ সালের পর থেকে পটুয়াখালীর গলাচিপা ও কলাপাড়া উপজেলার কালাচানপাড়া, গোড়াআমখোলাপাড়া, দিয়ারআমখোলাপাড়া, নয়াপাড়া, নাইউরী পাড়া, মংথয়পাড়া, থঞ্জুপাড়া, মিশ্রিপাড়া, লক্ষীপাড়া, বৌলতলীপাড়া, পক্ষীয়াপাড়া, কেরানীপাড়া এবং বরগুনার তালতলী উপজেলার ছাতনপাড়া, গোড়াঠাকুরপাড়া, মনুসেপাড়া, অংকোজানপাড়া ও তালুকদারপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় রাখাইনরা স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করে। গত শতকের চল্লিশ দশকের শেষ ভাগে এ অঞ্চলগুলোতে ২৪২টি রাখাইন পল্লী ছিল।
সে সময়ে বরগুনা ও পটুয়াখালীতে ৬০ হাজারের বেশি রাখাইন বসবাস করত। বর্তমানে ১০ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। বহু রাখাইন পাড়া বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
বরগুনার তালতলীর ছাতনপাড়া, মনুখেপাড়া, নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের সওদাগর পাড়া, তালুকদার পাড়া ও সোনাকাটা ইউনিয়নের কবিরাজ পাড়া, নামিষে পাড়া ও অংকুজান পাড়াসহ রাখাইন পাড়াগুলোতে ১২ থেকে ১৪টি করে শতাধিক হস্তচালিত তাঁত রয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় একই পরিবারে দুই থেকে তিনটিও তাঁত রয়েছে। কলাপাড়া, কুয়াকাটা ও গলাচিপায় রয়েছে আরো দুই শতাধিক তাঁত। এসব তাঁতে ছয় শতাধিক পেশাদার নারী তাঁত কাপড় বুনন করে থাকেন।
রাখাইনদের তাঁতে প্রথম দিকে পরিবারের চাহিদা মেটাতে কাপড় বোনা হতো। পরে তারা বাণিজ্যিক পরিসরে এ কাজ শুরু করলে দেশব্যাপী তার কদর বাড়ে ঠিকই তবে যথার্থ পদ্ধতিতে বিপণন বা রফতানি করতে না পারায় এবং সীমিত সংখ্যক ক্রেতা ও চাহিদার কারণে এ শিল্প বেশি দূর যেতে পারেনি। বর্তমান সময়ে যোগাযোগ মাধ্যমের উন্নতির সাথে সাথে তাদের পণ্যের প্রসার ঘটবে বলে রাখাইনরা আশা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের বৃহত্তর বরিশাল আঞ্চলিক সভাপতি মংচোথিন তালুকদার জানান, এ অঞ্চলে বসবাসরত রাখাইন সম্পাদ্রয়ের লোকসংখ্যা দিন দিন কমে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল কর্মসংস্থানের অভাব। বর্তমান সরকারের আন্তরিকতায় এ অঞ্চলের উন্নয়ন হচ্ছে। আমরা আমাদের ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবো বলে মনে করছি।