বরিশাল অফিস :: বাবুগঞ্জ উপজেলার উত্তর রাকুদিয়া গ্রাম। এ গ্রামে গেলেই হলুদে চোখ জুড়িয়ে যায়। সিংহভাগ জমিতে চাষ করা হয়েছে সরিষা। এ সরিষার ফুলের মধু দিয়ে অর্থ আয় করছে টাঙ্গাইলের বাসিন্দা দুই ভাই। উত্তর রাকুদিয়া গ্রামের সরিষা ক্ষেতের পাশে চাষ করা মৌ-মাছি নিয়ে সংগ্রহ করছেন মধু। ক্ষেত থেকেই মধু কিনে নিচ্ছেন ক্রেতারা। দামে কম ও খাঁটি মধু হওয়ায় বেচা-বিক্রিও ভালো বলে জানালেন মৌ-চাষী মো. আয়নাল।
টাঙ্গাইলের গোপালপুর থানার হেমনগর ইউনিয়নের নতুন সিমলা পাড়ার বাসিন্দা মো. আয়নাল জানান, কৃষি অফিসের কর্মকর্তার মাধ্যমে জানতে পারেন রাকুদিয়া গ্রামে প্রচুর সরিষা ক্ষেত রয়েছে। সেই খবর পেয়ে গত ২৪ জানুয়ারী গ্রামে এসেছেন। তার ছোট ভাই মো. মুন্না খান প্রশিক্ষিত মৌ চাষী। ভাইয়ের মুন্না খান মৌ খামারে সহযোগিতা করেন তিনি।
আয়নাল বলেন, তাদের খামারে ১০৫টি মৌ-মাছির বাক্স রয়েছে। প্রত্যেকটি খামারে একটি করে রানী মৌ-মাছি রয়েছে। একেকটি রানী প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন হাজার ডিম দেয়। প্রতিদিনই মৌমাছির সংখ্যা বাড়ে। প্রতি সপ্তাহে একটি বাক্স থেকে ২ কেজি করে মধু সংগ্রহ করা হয়। উত্তর রাকুদিয়া গ্রাম থেকে প্রতি কেজি ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করেন। এছাড়াও ডাবর ও এপি কোম্পানীর কাছেও মধু বিক্রি করেন। গত ২১ দিনে অন্তত ১৫ মন মধু সংগ্রহ করেছেন। থাকা খাওয়ার খরচ শেষে ভালো লাভ থাকে বলে জানিয়েছেন আয়নাল। প্রত্যেকটি মৌচাকে কত মৌমাছি থাকে সঠিক হিসেব জানেন না জানিয়ে বলেন, মৌমাছি থেকে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া মোম পাওয়া যায়। ওই মোম ডাইসে দিয়ে মৌচাক তৈরি করা হয়। সেখানে মৌ-মাছিরা মধু এনে জমা করে। সেই মৌচাক এনে নিজেদের তৈরি একটি যন্ত্রের মধ্যে রেখে চাকতির মাধ্যমে ঘুরিয়ে মধু সংগ্রহ করা হয়। পরে মৌচাক আবার বাক্সে রেখে দেয়া হয়। একটি মৌচাক দিয়ে অন্তত ৪/৫ বছর মধু সংগ্রহ করা যায়।
তিনি আরো বলেন, গ্রামের মানুষ অনেক ভালো। সবাই তাদের সহযোগিতা করে। কৃষি অফিসের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সরকারী কর্মকর্তার এসে তার কাছ থেকে মধু সংগ্রহ করেছেন। প্রত্যেক সরিষা চাষীরা তাদের সহায়তা করেন। যার জমিতে মৌ-মাছির বাক্স রেখেছে মধু সংগ্রহ করেন, এই জন্য জমির মালিককে শুধু মধু দিয়েছেন।
এখানে ছাড়াও কালিজিরা, বড়ই ও লিচু ফুলের মধু সংগ্রহ করেন। এ জন্য তারা বিভিন্ন জেলায় গিয়ে অবস্থান করেন। এছাড়াও সুন্দরবন থেকেও মধু সংগ্রহ করা হয়। বছরের ৬ মাস বিভিন্ন জেলায় মৌ মাছি ও মৌচাক নিয়ে ঘুরে ঘুরে মধু সংগ্রহ করেন। বাকি ৬ মাস নিজেদের বাড়িতে চিনি খাইয়ে মধু তৈরি করেন। তবে এ বিষয়টি ব্যয়বহুল। ফুল থেকে সংগ্রহ করা মধু ভালো ও খরচ তেমন নেই বলে জানান আয়নাল।
এখান থেকে আড়াই কেজি মধু কেনা বাবুগঞ্জ উপজেলার ভুতেরদিয়া গ্রামের প্রবীন বাসিন্দা মো. আলাউদ্দিন বলেন, ঢাকায় থাকা স্বজনরা শুনেছেন রাকুদিয়া গ্রামে খাটি মধু পাওয়া যায়। বাসা থেকে মধু দেয় তারা। তারা এখান থেকে মধু পাঠাতে বলছে। তাই এখান থেকে কিনেছি ঢাকা পাঠানোর জন্য। মধু খাটি ও দামে কম বলে উচ্ছসিত আলাউদ্দিন।
উত্তর রাকুদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ৯০ বছর বয়সী মো. আব্দুল করিম বেপারী বলেন, ৯০ বছর বয়সে এভাবে মধু সংগ্রহ করা প্রথম দেখেছি। খাটি মধু হওয়ায় লোকজন এসে কিনে নিয়ে যায়।
চার কেজি মধু কেনা নতুন হাট এলাকার ব্যবসায়ী উজ্জল বলেন, কয়েকদিন আগে গ্রামে এসেছিলাম। তখন এখানে লোকজন দেখে জানতে পারলাম চাক থেকে মধু বিক্রি হয়। নিজের চোখে দেখে মধু সংগ্রহ করার জন্য এসেছি। বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহনযোগ্য। বাজারের তুলনায় দাম অনেক কম। তাই এখান থেকে নিশ্চিত্বে মধু কিনেছি। বাজার থেকে যে মধু কিনে তা তো দেখি না। দামও এক হাজার টাকা কেজি। আসল কিনা নকল তাও জানি না। এখানে সেই সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে আসবো।
বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান বলেন, সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌ-মাছির চাষে পরাগায়ন ভালো হয়। এতে ফলন বেশি পাওয়া যায়।
তিনি জানান, উত্তর রাকুদিয়া গ্রামের ১৩০ একর জমিতে এবার সরিষার আবাদ হয়েছে। বেশ ভালো ফলনও আশা করা যাচ্ছে।
উত্তর রাকুদিয়া গ্রামে মৌ-মাছির খামারের বিষয়টি তিনি দেখেছেন। সেখান থেকে মধু সংগ্রহ করেছেন জানিয়ে কৃষি কর্মকর্তা বলেন, তেল জাতীয় ফসলের আবাদ বাড়ানো হচ্ছে। তাই মধু সংগ্রহের চাষী স্থানীয়ভাবে তৈরি হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন এ কৃষি কর্মকর্তা।
বরিশাল জেলায় এবার ৬ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরন হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর জানিয়েছে।