এস এম পারভেজ (পিরোজপুর) : গ্রামের নাম বিন্না।এটিকে সবাই চেনে ‘ক্রিকেট ব্যাটের গ্রাম’ হিসেবে। পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের অবহেলিত এ জনপদ আধুনিকতার কোন ছাঁপ পড়েনি এখনও । তবে বসে নেই এ গ্রামের সংগ্রামী নারী-পুরুষ। ক্রিকেট ব্যাট তৈরী করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে এখানের হাজারও মানুষের।
দীর্ঘ এক যুগ ধরেই কাঠ ব্যবসার সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে ব্যাপক পরিচিত নেছারাবাদের ইন্দেরহাট, বিন্না, জিলবাড়ি, চামি, ডুবি, উড়িবুনিয়া, পঞ্চবটি ও বলদিয়াসহ আরও পনেরটি গ্রাম। নিভৃত এসব গ্রামেই গড়ে ওঠেছে অসংখ্য ক্রিকেট ব্যাট তৈরির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কারখানা। বর্তমানে কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় অর্ধ শতাধিক। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছে অন্তত আড়াই তে থেকে তিন হাজার মানুষ। প্রতিদিন এসব গ্রাম থেকে শত শত ব্যাট তৈরী করে পাঠানো হচ্ছে ঢাকাসহ বিভিন্ন ক্রীড়া সরঞ্জামাদির দোকানে। এখান থেকে দেশের শতকরা ৭০ ভাগ তৈরী ব্যাটের চাহিদা পূরণ হয়।
নেছারাবাদের বেলুয়া নদের তীরে অবস্থিত উড়িবুনিয়ার ছুঁতোর পরিবারে জন্ম নেয়া অতি দরিদ্র আব্দুল লতিফ মিয়া। তিনি মাত্র ২৯ বছর বয়সে কাজের সন্ধানে ঢাকায় গিয়ে কাঠ মিস্ত্রী হিসেবে জুরাইনের ‘খেলার সাথী’ নামে একটি কাঠের কারখানায় কাজ পান। আর সেখান থেকেই বিভিন্ন খেলার সামগ্রী যেমন -প্রাইজ শিল্ড, ক্রিকেট ব্যাট, ক্যারমবোর্ড ও হকি ষ্টীক মেরামতের কাজ রপ্ত করেন তিনি। এরপর থেকেই লতিফের মাথায় চেপে বসে ক্রিকেট ব্যাট তৈরির নেশা। বিদেশী ব্যাট তৈরীর সমমানের স্থানীয় গাছের সন্ধান করতে থাকেন তিনি। খুঁজে বের করেন দেবদারু, কদম ও বাইনসহ নানা প্রজাতি গাছের কাঠ দিয়ে শুরু করেন ক্রিকেট ব্যাট তৈরীর কাজ। সস্তায় ব্যাট তৈরীর লক্ষ নিয়ে ঢাকা ছেড়ে চলে আসেন নিজ গ্রাম বিন্নায়। নিজ বাড়ীতে গড়ে তোলেন ব্যাট তৈরীর ক্ষুদ্র কারখানা। ঢাকার বাইরে নেছারাবাদে এটাই ব্যাট তৈরীর আদি কারখানা। আব্দুল লতিফ মিয়া মারা গেলেও তার শুরু করা ব্যবসা এখন গ্রামবাসীর জীবীকার অবলম্বন।
ব্যাট তৈরীর কারিগর আরেক কারগির আবুল কালামের স্ত্রী নিলুফা ইয়াসমিন ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্র ঋণ সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে অংশ নিয়েছিলেন স্বামীর ক্রিকেট কারখানার অন্যতম মালিক হিসেবে। কানাডার হ্যালিফ্যাক্সে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে নিলুফা যোগদেন নোবেল বিজয়ী ড. মোঃ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে।
‘পদক্ষেপ’ নামের একটি এনজিওর ক্ষুদ্র ঋণ গ্রুপের সফল শিল্প উদ্যোক্তা নিলুফ ইয়াসমিন। ওই বছরই নিলুফা ঢাকায় সিটি গ্রুপ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পুরস্কার পান। কানাডার সম্মেলন থেকে অন্যান্য পুরস্কার ছাড়াও নিলুফাকে ৪ হাজার মার্কিন ডলার নগদ অর্থ উপহার হিসেবে দেয়া হয়। বাংলাদেশী ২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা সমমানের এ উপহারের অর্থ দিয়ে কালাম-নিলুফা দম্পত্তি জমি কিনে বাড়ী ও ব্যাট কারখানা গড়ে তুলেন।
ব্যাটের কারিগররা জানান, প্রাথমিকভাবে গাছ চেরাই করে ব্যাট উৎপাদন করলেও সেগুলোকে পরবর্তীতে ঢাকায় প্রেরন করা হত এবং সেখানেই ঘসামাজা, বার্নিস এবং লেবেল লাগিয়ে বিক্রয় করা হত। কিন্তু বর্তমানে সেই কাজ গ্রামে বসেই করছে আর এক পর্যায়ের ব্যাট ব্যাবসায়ীরা। পরে সেই ব্যাটগুলোকেই ঢাকাসহ পিরোজপুর, বরিশাল ও খুলনায় বিক্রয়ের জন্য পাঠানো হচ্ছে।
উৎপাদনকারী স্থানীয় ব্যাট কারিগররা ‘চন্দ্রদীপ নিউজ ২৪’-কে জানান, প্রকারভেদে বিভিন্ন গাছের ব্যাট বার্নিস, রং, লেবেল ও হাতলে প্লাস্টিকজাতীয় এক ধরনের টেপ লাগিয়ে বিক্রয় করা হয় ১৫০ টাকা থেকে ৩00 টাকায় ।
নেছারাবাদের ব্যাট শিল্প এবং অত্র শিল্পের কারিগরদেরকে নিজ পেশায় টিকিয়ে রাখতে হলে পর্যাপ্ত ঋন সুবিধাসহ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, কাচাঁ মালের মূল্য কমানো ও যোগাযোগ ব্যাবস্থার উন্নয়নের প্রয়োজন বলে মনে করছেন ব্যবসায়িরা ।