ভবিষ্যতের রাষ্ট্র কাঠামোর রূপরেখা দিল এনসিপি

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রথম রাজনৈতিক দল হিসেবে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের দিক-নির্দেশনা ঘোষণা করল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শনিবার দলটি এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর জন্য ২৪ দফার একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা প্রকাশ করেছে, যেখানে জোর দেওয়া হয়েছে শাসনতান্ত্রিক সংস্কার, জনগণের ওপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রত্যাবর্তন এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ওপর।
দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই ২৪ দফা কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাংলাদেশের পুনর্গঠনের জন্য একটি কাঠামোগত রূপরেখা।
ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের অবসান চায় এনসিপি
ইশতেহারে বলা হয়েছে, একচ্ছত্র ক্ষমতার রাজনীতি নতুন বাংলাদেশে আর থাকবে না। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ করা, সংসদের বিকেন্দ্রীকরণ, প্রশাসনিক বিভাগীয় কাঠামোর গণতান্ত্রিক উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় পদে ক্ষমতার সীমা নির্ধারণে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে দলটি।
সংবিধান ও নাগরিক অধিকারে রূপান্তরমূলক প্রতিশ্রুতি
দলটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ, গণঅভ্যুত্থান ও সংবিধানের চেতনার ভিত্তিতে নতুন এক সমাজগঠনের। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, নাগরিক তথ্যের অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বৈচিত্র্যের মর্যাদা সংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করার ঘোষণা এসেছে।
গণঅভ্যুত্থান ও সেনা কর্মকর্তাদের স্বীকৃতি
একটি ব্যতিক্রমী দফায় এনসিপি বলেছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সশস্ত্র বাহিনীর যারা জনগণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের অবদানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। একইসঙ্গে অভ্যুত্থানের দিকনির্দেশনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের রাষ্ট্র পরিচালনায় সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার কাঠামোগত সংলাপ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে দলটি।
অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর ও উৎপাদনভিত্তিক পরিকল্পনা
গুটিকয়েক গোষ্ঠীর হাতে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অবসান চায় এনসিপি। তারা বলছে, উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে সম্পদের বণ্টন, একক দাতা নির্ভরতা থেকে মুক্তি, এবং শ্রমিক-কৃষকের ঐক্য ও অংশীদারিত্বভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করবে তারা।
প্রযুক্তি ও আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে প্রযুক্তিনির্ভর ন্যায্য বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয়ভাবে গবেষণা, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশে জাতীয় স্তরের প্ল্যাটফর্ম গড়ার কথাও বলা হয়েছে।
নতুন কূটনীতি ও আঞ্চলিক বন্ধুত্বের দৃষ্টিভঙ্গি
ঔপনিবেশিক প্রভাব ও পরনির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত থাকার সংকল্পে এনসিপি বলেছে, তারা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থের ভিত্তিতে ‘বন্ধুত্ব নয়, সমতা ও সংহতি’র ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিরপেক্ষ ও বিকল্প কূটনৈতিক অবস্থানের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে ইশতেহারে।
নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার
নারী-পুরুষের বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠনে সংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা জোরদার, শিশুর শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং তৃতীয় লিঙ্গসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মর্যাদা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এনসিপি।
এক নজরে এনসিপির প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলো:
- গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তিতে নতুন সংবিধান প্রণয়ন
- শাসন কাঠামোয় বিকেন্দ্রীকরণ ও বিভাগীয় স্বায়ত্তশাসন
- প্রশাসনিক সংস্কার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
- সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা ও তথ্যের অধিকার আইন
- সামরিক বাহিনীর গণমুখী রূপান্তর এবং স্বীকৃতি প্রদান
- অর্থনৈতিক গোষ্ঠীপ্রভুত্বের অবসান ও উৎপাদন-ভিত্তিক অর্থনীতি
- ধর্ম ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি
- নারীবান্ধব, শিশু-সহায়ক ও পরিবেশবান্ধব রাষ্ট্রনীতি
- প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কূটনীতি
এনসিপি জানায়, তারা এ ২৪ দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে কেবল নতুন সরকার নয়, এক নতুন রাষ্ট্র গঠন করতে চায়—যেখানে ক্ষমতা জনগণের, রাষ্ট্রের নয়।








