গণভোট এবং জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশকে বিএনপি মুখে স্বাগত জানালেও দলটি ভেতরে ভেতরে নাখোশ। জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানালেও ভেতরে ভেতরে সন্তুষ্ট। সনদ বাস্তবায়ন আদেশ তারা মেনে নিয়েছে। কোনো দলই আদেশ-গণভোট প্রত্যাখ্যান বা আন্দোলনের দিকে যাচ্ছে না।
দল তিনটির সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের পর সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। এটি জাতির উদ্দেশে ভাষণে তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
আদেশ অনুযায়ী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন এবং গণভোট হবে। এটিই ছিল বিএনপির প্রধান দাবি। এ দাবি পূরণ হওয়ায় আট সংস্কার প্রস্তাবে থাকা দলটির নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) গণভোটে না রাখার বিরোধিতা করতে পারছে না বলে বিএনপি সূত্র জানায়। দলটি আদেশ জারি এবং আগামী সংসদের এমপিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনেরও বিপক্ষে ছিল।
সূত্র জানায়, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আটকে যেতে পারে আশঙ্কায় আদেশ জারি এবং পরিষদ গঠনের বিধানের বিরোধিতা না করে প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানানোর সিদ্ধান্ত হয় বৃহস্পতিবারের বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে।
জামায়াতের প্রধান দাবি ছিল, নির্বাচনের আগে গণভোট। এটি পূরণ না হওয়ায় দলটি সমমনাদের নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানাচ্ছে। কিন্তু বিএনপির নোট ডিসেন্ট উপেক্ষা করে পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ, সনদে বর্ণিত উপায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা খর্ব করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের মতো সংস্কার প্রস্তাব গণভোটে দেওয়ায় জামায়াতের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে। এতে সন্তুষ্ট বলে জানিয়েছে জামায়াত সূত্র। সমমনা আট দলের মূল্যায়ন, বিএনপির তুলনায় তাদের দাবি বেশি পূরণ হয়েছে। না ভোটের প্রচার চালালে বিএনপিকে সংস্কারবিরোধী হিসেবে ভোটের মাঠে তুলে ধরে নির্বাচনে সুবিধা আদায় করা যাবে। আবার বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হলেও গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার প্রস্তাব উপেক্ষা করতে পারবে না।
এনসিপি আওয়ামী লীগ মনোনীত রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে আদেশ জারির বিরুদ্ধে ছিল। তাদের দাবি ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারকে গণঅভ্যুত্থানের ক্ষমতা বলে আদেশ জারি করতে হবে। এ দাবি পূরণ না হওয়ায় দলটি প্রকাশ্যে ক্ষোভ দেখালেও, আদেশে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিধান থাকায় এনসিপিও সন্তুষ্ট। পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ, সনদে বর্ণিত উপায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের সংস্কার প্রস্তাব গণভোটে যাওয়ায় এ দলটি ভেতরে ভেতরে উচ্ছ্বসিত বলে সূত্র জানিয়েছে।
মেনে নিয়ে ধন্যবাদ দিতে হয়েছে বিএনপিকে
প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি সনদ বাস্তবায়ন আদেশের সমালোচনা করেছিল। সরকারপ্রধান নিজের স্বাক্ষরিত সনদ থেকে সরে গেছেন বলেও অভিযোগ তোলা হয়। কিন্তু রাতে স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানানো হয় লিখিত বক্তব্যে। বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে এই বক্তব্য পাঠ করে উঠে যান বিএনপি নেতারা। কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি তারা। এই বক্তব্যে ১৭ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত সনদে থাকা নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী গণভোট আয়োজনে সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় বিএনপি।
সংবিধান সংস্কার করতে হবে এমন ৪৮ সংস্কার প্রস্তাব যাচ্ছে গণভোটে। এর মধ্যে পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন; তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন পদ্ধতি; সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি), ন্যায়পাল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং দুদকে সাংবিধানিক কমিটির মাধ্যমে নিয়োগসহ ১৫ সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। দলটির দাবিতে তা সনদে যুক্ত করা হয়। বিএনপি অবস্থান ছিল, যে দল যে বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, ক্ষমতায় গেলে সেভাবে সংস্কার করতে পারবে।
কিন্তু সনদ বাস্তবায়নে তা পুরো রাখা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী দলীয় প্রধান পদে থাকতে পারবেন না– এই সংস্কার প্রস্তাবেও বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। গণভোটের ব্যালটে থাকবে, এটিসহ মোট ১০টি সংস্কার প্রস্তাব দলগুলো প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে পারবে। গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে উচ্চকক্ষে পিআর, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগসংক্রান্ত আট সংস্কার প্রস্তাব সনদ অনুযায়ী বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা থাকবে।
বিএনপি এর ঘোর বিরোধী। তারপরও কেনো বিএনপি প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ দিয়ে আদেশ ও গণভোট মেনে নিয়েছে– এ প্রশ্নে দলটির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানান, এসব নিয়ে নেতাকর্মীদের তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং ক্ষোভ থাকলেও নির্বাচনের স্বার্থে মানতে হয়েছে।
বিএনপি গণভোটেরও বিপক্ষে ছিল শুরু থেকেই। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সংলাপে মধ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দলটির অবস্থান ছিল, আগামী সংসদ প্রতিশ্রুত সংস্কার করবে। কিন্তু ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে বিএনপিকে প্রতিনিধিত্ব করা নেতারা দলীয় ফোরামে আলোচনা ছাড়াই গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো গণভোট মেনে নেন। বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, এ কারণেই পরের বিষয়গুলোও মানতে হয়েছে। এসব জামায়াতের অনুকূলে গেছে।
বৃহস্পতিবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন সদস্য বলেছেন, আদেশ ও গণভোট প্রত্যাখ্যান করলে বিএনপিকে সংস্কারবিরোধী আখ্যা দিয়ে জামায়াত ভোটের মাঠে ফায়দা তুলত কিংবা এই ইস্যুকে ব্যবহার করে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করত। বিএনপি মনে করছে– কোনোভাবেই নির্বাচন ব্যাহত হতে দেওয়া যাবে না। তাতে অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, গণতন্ত্র ব্যাহত করবে। এই সুযোগ না দিতেই বিএনপি আদেশ এবং গণভোটে রাজি হয়েছে বলে দাবি এই নেতার।
বিএনপির স্থায়ী কমিটি সূত্র জানায়, নির্বাচনের পথ বাধাহীন রাখতে আদেশকে স্বাগত জানানো হয়েছে। তবে নিজেদের দাবির পক্ষে অবস্থান ধরে রাখতে স্বাক্ষরিত সনদের ওপর গণভোটের আহ্বান জানিয়েছে।
গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট থাকা আট এবং ঐকমত্য হওয়া ৩০ সংস্কার প্রস্তাব আগামী সংসদ বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে বলে বিধান রয়েছে আদেশে। গতকাল শুক্রবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আরোপিত আইন বা আদেশ দিয়ে সংসদের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। নির্বাচন ও গণভোট একদিনে আয়োজনকে স্বাগত জানিয়েছি। কিন্তু গণভোটের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করা হয়ে যাবে না, সংবিধান সংশোধন হয়ে যাবে না।
জামায়াত ওপরে নাখোশ ভেতরে খুশি
জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ আট দল গতকালও দাবি জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে গণভোট করতে হবে। এ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে দলটি সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগ করেছে, বিএনপিকে খুশি করতে সরকার ১০টি সংস্কার প্রস্তাব গণভোটের পরও নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী বাস্তবায়নের সুযোগ রেখেছে।
গতকাল জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কার এবং নির্বাচন চেয়েছিল জাতি। কিন্তু একটি দলের স্বার্থে সরকার আঁতাত করে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ করা আদেশে পরিবর্তন এনেছে। তার পরও জামায়াতসহ আট দল আদেশকে গ্রহণ করছে।
নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি পূরণ না হলেও আদেশ প্রত্যাখ্যান করছেন না জানিয়ে ডা. তাহের বলেছেন, জাতির আগামী ফেব্রুয়ারিতে সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রয়োজন। নির্বাচনের পরিবেশের স্বার্থে জামায়াত আদেশকে গ্রহণ করছে। আদেশ জারির মাধ্যমে সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত হয়েছে। ফলে অসন্তোষ থাকলেও জামায়াত তা মেনে নিচ্ছে।
জামায়াতের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেছেন, গণভোট যখনই হোক পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, সনদ অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিশ্চয়তা আদেশে থাকায় তারা সন্তুষ্ট। বিএনপির বিরোধিতার পরও সরকার আদেশ জারি করেছে, তা স্বস্তির। গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারে নোট অব ডিসেন্ট না রাখা এবং সাংবিধানিক আদেশ জারি জামায়াতের জন্য বড় বিজয়।
ক্ষোভ দেখালেও এনসিপি সন্তুষ্ট
রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে আদেশ জারিতে রাগ দেখালেও, সনদের আইনি ভিত্তিতে এনসিপিও খুশি। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে দলটির মুখ্য সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, সরকার আদেশে বিএনপি এবং জামায়াতকে ভাগ দিয়েছে। জনগণকে কিছু দেয়নি। আর রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে সই করিয়ে আদেশকে অপবিত্র করেছে।
তবে সংলাপে এনসিপির প্রতিনিধিত্ব করা দুই নেতা বলেছেন, আদেশ অনুযায়ী আগামী সংসদের এমপিদের নিয়ে কন্সটিটুয়েন্ট ক্ষমতাসম্পন্ন সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এটি এনসিপির প্রধান দাবি ছিল। এই দাবি পূরণের মাধ্যমে এনসিপির বিজয় হয়েছে। উচ্চকক্ষে পিআর, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের সংস্কার প্রস্তাবে থাকা বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট উপেক্ষা করে এগুলো গণভোটে দেওয়াও এনসিপির জন্য জয়। তবে রাজনৈতিক কারণে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের বিরোধিতা করছে।