পটুয়াখালী প্রতিনিধি :: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের এক মাস অতিবাহিত হলেও এখনো স্বাভাবিক হয়নি পটুয়াখালীর ইউনিয়ন পরিষদগুলোর কার্যক্রম।
হামলা-মামলা, হয়রানির ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন জনপ্রতিনিধিরা। কেউ কেউ হামলার শিকার হয়ে কাতরাচ্ছেন হাসপাতালে। কোনো কোনো চেয়ারম্যানের লাগামহীন দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্ফোরণে জন রোষানল থেকে বাঁচতে এলাকা ছেড়ে রয়েছেন আত্মগোপনে। এসব জনপ্রতিনিধিদের মাসাধিকাল অনুপস্থিতিতে মানুষ শুধু সেবা বঞ্চিতই হচ্ছে না, পদে পদে হয়রানি ও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
ছাত্র-জনতার কঠোর আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সারা দেশের মতো পটুয়াখালীতেও টানটান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তখন। ছাত্র-জনতার সঙ্গে রাজপথ দখলে চলে যায় বিএনপি-জামায়াত শিবিরসহ আওয়ামীবিরোধী শিবিরের। ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতাবলে ভোটারবিহীন নির্বাচনে পটুয়াখালীর প্রায় সব ইউনিয়ন পরিষদে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা চেয়ারম্যান, সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘ ক্ষমতাকালে প্রত্যেকেই পদের প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় পুরো রামরাজত্ব কায়েম করেছেন। দলীয় এসব চেয়ারম্যান-মেম্বাররা কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিজেদেরকে জড়িয়েছেন নানা অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে।
পটুয়াখালী জেলার ৭৫টি ইউনিয়ন পরিষদের ২/৪টি ছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানই আওয়ামী লীগ মনোনীত। এর মধ্যে পটুয়াখালী সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের একমাত্র কমলাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপি দলীয়। বাকি ১২টি ইউপির চেয়ারম্যানই আওয়ামী লীগ মনোনীত ও দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। ছোটবিঘাই ও বড়বিঘাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে অপসারণ করে প্যানেল চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও মরিচবুনিয়া ইউপির চেয়ারম্যানকে অপসারণ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দায়িত্ব অর্পণের প্রস্তাব সবে পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। এ ছাড়া কোথাও এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের ঝামেলা নেই বলে জানান পটুয়াখালী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত আরা জামান ঊর্মি।
ছোটবিঘাই ইউপি সদস্য সুলতান প্যাদা বলেন, চেয়ারম্যানের কাম (কাজ) অন্য কাউকে দিয়া হয় না। এখন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে সাধারণ জনগণ। অপসারিত এই ৩ ইউপির চেয়ারম্যানই স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক।
গলাচিপার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন আল হেলাল বলেন, উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরাই এখন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে কতদিন পারব জানি না। দু’একটি ইউনিয়নের সদস্যরা তাদের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আমার কাছে মৌখিক অভিযোগ দিচ্ছে। তাদেরকে বলছি লিখিত দেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দশমিনা উপজেলার ৭টি ইউপির ২৭ আগস্ট বহরমপুর ও ৪ সেপ্টেম্বর দশমিনা সদর ইউনিয়নের এই দুই চেয়ারম্যানকে অফিসে অনুপস্থিত থাকার কারণে অপসারণ করে দশমিনা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাফিসা নাজনিরা।
দুমকি উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের মধ্যে লেবুখালী, আঙ্গারিয়া ও মুরাদিয়া ইউপির চেয়ারম্যান এলাকায় অনুপস্থিত রয়েছেন। এসব ইউপিতে প্যানেল চেয়ারম্যানরা মোটামুটি দায়িত্ব পালন করলেও জন্ম ও মৃত্যু সনদ নিশ্চিত করতে আইডি ও পাসওয়ার্ডের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ৩ জন সরকারী কর্মকর্তাকে। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন দুমকির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. চাহীন মাহমুদ।
কলাপাড়া উপজেলার ১২টি ইউপির ২-৩ জন ছাড়া বাকি সবাই আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান। হামলা-মামলার ভয়ে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সবাই গা-ঢাকা দিলেও বিএনপির সঙ্গে রফাদফা করে ২-৪ জন এলাকায় এলেও অফিস করছেন আড়ালে। কুয়াকাটা সংলগ্ন লতাচাপলির চেয়ারম্যান আনসার মোল্লা সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত হয়ে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানান তার স্ত্রী। এখানে একজন সদস্য প্যানেল চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম।
রাঙ্গাবালী উপজেলার ৫টি ইউনিয়নেই আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান থাকলেও ছোটবাইসদিয়া ও মৌডুবির চেয়ারম্যানকে ইতোমধ্যে অপসারণ করা হয়েছে। রাঙ্গাবালী সদরের চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান মামুন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিলে শূন্য আসনে এখনো নির্বাচন হয়নি। বাকি দুজন চেয়ারম্যান বিএনপির সঙ্গে তালমিলিয়ে সময় সুযোগমতো অফিস করছেন বলে স্থানীয় সংবাদ কর্মীরা জানান।
বাউফলের ১৫টি ইউনিয়নের ১৫ জন চেয়ারম্যানই আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। এরা সবাই সাবেক চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ বলয়ের নেতা ও আত্মীয়স্বজন। সবাই এখন লাপাত্তা। বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা করে ৫ জন চেয়ারম্যান এলাকায় উঠলেও তারা চলাফেরা করছেন সাবধানে। আসম ফিরোজের আপন দুই ভাইয়ের ছেলে কালাইয়ার ইউপি চেয়ারম্যান মনির মোল্লা ও চন্দ্রদ্বীপের আলকাস মোল্লা, কনকদিয়ার শাহীন চেয়ারম্যানসহ ৯টি ইউপির চেয়ারম্যানরা হামলা-মামলার ভয়ে এখনো এলাকায় ফিরতে পারেননি। সূর্য মনি ও ধুলিয়া ইউনিয়নে প্রশাসক হিসাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বগা ও কালিশুরি ইউনিয়নে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নাজিরপুর, কালাইয়া ও কনকদিয়া ইউনিয়নে প্যানেল চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং দুটি ইউনিয়ন প্রশাসক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বশির গাজী।
মির্জাগঞ্জ উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের একজন চেয়ারম্যান বিএনপি দলীয় হলেও বাকি ৫ জন উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা। ইতোমধ্যে মাদবখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান লাবলু কাজীকে অপসারণ করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) তন্ময় হালদারকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এসব ব্যাপারে জেলা প্রশাসক নুর কুতুবুল আলম বলেন, ইতোমধ্যে অনেক ইউনিয়নে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিছু ইউনিয়নে প্যানেল চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আরও যারা অনুপস্থিত রয়েছেন বা থাকবেন তাদের ব্যাপারেও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।