আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২২০টি সংসদীয় আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। বাকি ৮০টি আসনের প্রার্থী নির্ধারণ প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে। শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০০ আসনের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে একাধিক দফা সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ২২০টি আসনের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী বৃহস্পতিবারও (২৫ ডিসেম্বর) কয়েকটি আসনের বিষয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে। সবকিছু চূড়ান্ত করে শুক্রবার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে।
দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান জিএম কাদের রংপুর-৩ (সদর) আসন থেকে এবং মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানা গেছে। দলটি ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
গত ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টির মনোনয়ন ফরম বিক্রির কার্যক্রম শুরু হয়। তবে এবার মনোনয়ন ফরম বিক্রির সংখ্যা নিয়ে দলীয়ভাবে কেউ নির্দিষ্ট তথ্য দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সঠিক পরিসংখ্যান এখনই বলা সম্ভব নয়, হিসাব করে দেখতে হবে। দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এবার মনোনয়ন ফরম বিক্রিতে বড় ধরনের ভাটা পড়েছে।
দলীয় নেতারা বলছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে জাতীয় পার্টি নানাভাবে চাপে রয়েছে। স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। এমনকি কাউন্সিল বা সভা করার জন্য অডিটোরিয়াম ভাড়া পেতেও সমস্যায় পড়ছে দলটি। ইফতার মাহফিলসহ একাধিক কর্মসূচি বাতিল বা পণ্ড হয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ অবস্থায় উদ্বেগ ও শঙ্কার মধ্যে দিয়ে চলছে মনোনয়ন প্রক্রিয়া। অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—নির্বাচন আদৌ হবে কি না, হলে জাতীয় পার্টিকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হবে কি না, কিংবা বিএনপির সঙ্গে জোট হলে দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী দাঁড়াবে। এসব অনিশ্চয়তার কারণে প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিধা দেখা দিয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি প্রায় ১ হাজার ৭৫২টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছিল। সে হিসাব অনুযায়ী এবার প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কম ফরম বিক্রি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে নির্বাচন-সংক্রান্ত শঙ্কা এবং দলীয় ভাঙনকে দায়ী করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালের নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টি একাধিক দফায় ভাঙনের মুখে পড়ে। প্রথমে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে একটি পৃথক অংশ আত্মপ্রকাশ করে। পরে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের নেতৃত্বে আরেকটি অংশ আলাদা হয়ে যায়। এতে দলের প্রথম সারির অনেক নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মূলধারা থেকে সরে যান। যদিও তৃণমূল পর্যায়ে জিএম কাদেরের প্রতি সমর্থন থাকলেও নেতৃত্বে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে সম্প্রতি সাবেক মন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা, একাধিকবারের সংসদ সদস্য ফখরুল ইমামসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা পুনরায় জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে ফিরে এসেছেন, যা দলীয়ভাবে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির জরুরি সভায় তৃণমূল নেতারা এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে মত দেন। তারা মনে করছেন, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি বড় অংশের ভোট জাতীয় পার্টির ঝুলিতে আসতে পারে। তবে জিএম কাদের সভায় জানান, জোটগত নির্বাচনের প্রশ্নে প্রয়োজনে আবার বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জাতীয় পার্টি মনোনয়ন জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ উল্লেখ করে বলেন, এর আগে কোনো জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি। একতরফা বা মিডিয়া-নির্ভর নির্বাচন হওয়ার আশঙ্কাও ব্যক্ত করেন তিনি।
বিএনপির সঙ্গে জোটের গুঞ্জন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে জাতীয় পার্টির সঙ্গে কোনো দলের আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে না। তবে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই—এ মন্তব্য করে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ইঙ্গিতও দেন তিনি।
সব মিলিয়ে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হলেও জাতীয় পার্টির নির্বাচনী কৌশল ও জোট রাজনীতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা এখনো তুঙ্গে।
এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫