বরিশাল অফিস :: বরিশালের আগৈলঝাড়ার দুস্থ নারীদের সু-নিপুন হাতে তৈরী বড় দিনের শৌখিন খেলনা, উপহার সামগ্রী ও শান্তা ক্লজে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে পালন করা হবে যীশু খ্রিষ্টের আবির্ভাব দিবস শুভ বড় দিন।
বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা “প্রকৃতি’র” উদ্যোগে আগৈলঝাড়া উপজেলার পাঁচটি কারখানায় প্রায় দু’হাজার দুঃস্থ ও বিধবা নারীদের শ্রমে স্থানীয় পরিত্যক্ত ডোবা ও পুকুরের কচুরিপানা সংগ্রহ করে বিশেষভাবে নির্মিত কাগজ তৈরী করে ওই কাগজ দিয়ে তৈরি করছেন যীশু খ্রিস্টের জন্মদিন উপলক্ষে সান্তা ক্লজ, ক্রিসমাস ট্রি, গীর্জা ও বাড়ি সাজানোর পন্যসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য নানা উপহার সামগ্রী।
উপজেলার জোবারপাড় এন্টারপ্রাইজে কর্মরত ওই গ্রামের বাসিন্দা মনি বালা (৫০) কচুরিপানার কাগজ দিয়ে তৈরি করা বড় দিনের সান্তা ক্লজসহ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী তৈরির সু-নিপুন কারিগরদের একজন। তিনি জানান, কচুরিপানা আর বড়দিন তার জীবনে আশীর্বাদ বয়ে এনেছে। মনি বালার মত ওই এলাকার দু’হাজার অসহায় দুস্থ নারীরা আগৈলঝাড়ার ৫টি কারখানায় কাজ করে অর্থনৈতিকভাবে সংসারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘অভাবের সংসারে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কোন রকমে খেয়ে না খেয়ে থেকেছে। এখন এখানে কাজের মাধ্যমে তিনি ও তার সহকর্মীরা তিনবেলা ভাত খেয়ে সন্তানদের নিয়ে স্বাবলম্বী অবস্থায় আছেন এবং সংসারে ফিরেছে আর্থিক স্বচ্ছলতা।
মনি বালার আরেক সহকর্মী বিধবা বীণা হালদার (৫৫) ও বিধবা শিউলী বেগম (৪৭) বলেন, ‘আমরা যেসব জিনিস তৈরি করছি, সেগুলো দিয়ে দীর্ঘদিন থেকে দেশ-বিদেশের খ্রীস্টিয় সম্প্রদায়ের অধিবাসীরা শুভ বড় দিন পালন করে আসছেন। প্রতিদিন একজন নারী শ্রমিক উৎপাদিত কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে চার থেকে সাড়ে চারশ টাকা আয় করছেন।
জোবারপাড় এন্টার প্রাইজের ম্যানেজার পাপড়ী মন্ডল জানান, বর্তমানে প্রকল্পের ৫টি কেন্দ্রের প্রায় দুই হাজার নারী শ্রমিক কাজ করছেন। এদের মধ্যে অধিকাংশ হচ্ছেন স্বামী পরিত্যাক্তা, বিধবা কিংবা অসহায় ও দুস্থ। প্রোডাক্ট ডিজাইনার খোকন সমদ্দার জানান, উপজেলার জোবারপাড় এন্টারপ্রাইজ, কালুরপাড়ের বির্বতন হ্যান্ডমেইড পেপার প্রজেক্ট, বড়মগরার কেয়া পাম হ্যান্ডিক্রাফট নগরবাড়ির চ্যারিটি ফাউন্ডেশন ও বাগধা এন্টার প্রাইজে প্রতিবছরই নতুন নতুন গিফ্ট আইটেমের কাজ করা হয়। এখানে চার হাজারের বেশি আইটেমের পণ্য তৈরী করা হয়।
সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে কচুরিপানাকে ঘিরে এমসিসি (মেনোনাইট সেন্ট্রাল কমিউনিটি) আওতায় এলাকায় গড়ে ওঠে জোবারপাড় এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রকল্প। এ প্রকল্পের আওতায় এলাকার ডোবা ও মজাপুকুর থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ করে তার সঙ্গে পাট, পরিত্যাক্ত কাগজ ও সিল্ক কাপড় দিয়ে মন্ড তৈরি করা হয়। এরপর তাতে রং দিয়ে রোদে শুকানোর পর তৈরি হয় কাগজ। এভাবে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে ৩ হাজার পিস কচুরিপানার কাগজ। সেই কাগজ দিয়ে তৈরি করা হয় হস্তজাত উপহার সামগ্রী। ওই উপহার সামগ্রীতে বিভিন্ন ধরনের কাঁচা ফুলও ব্যবহার করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যে অসহায় নারীদের হাতে তৈরি পণ্য বিদেশের বাজার দখল করে নিয়েছে।
একই বছর উপজেলার বাগধা এলাকায় বাগধা এন্টারপ্রাইজ নামে আরো একটি প্রকল্প চালু করা হয়। এ দুটি প্রকল্পের সাফল্যের পর ১৯৮৭ সালে গড়ে ওঠে কেয়াপাম হ্যান্ডিক্রাফট নামের আরো একটি প্রকল্প। এরপর ১৯৯৩ সালে বিবর্তন নামের আরো একটি প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করে।
তিনি জানান, কচুরিপানার কাগজ দিয়ে তৈরি তাদের উপহার সামগ্রী পাঠানো হচ্ছে কানাডা, ডেনমার্ক, ইতালী, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, হল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। প্রতিবছরই ঐ সব দেশে এ উপহার সামগ্রীর চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে বড়দিনের উৎসব থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এর চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চলছে।
ওই সংস্থার মাধ্যমে শৌখিন এসব খেলনা ও উপহার সামগ্রী ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে রফতানির মাধ্যমে আসছে প্রচুর বৈদেশিক মূদ্রা। দুস্থ নারীদের তৈরি করা কচুরিপানার শৌখিন উপহার সামগ্রী সর্বত্র প্রশংসা কুড়িয়েছে। ফলে বিধবা ও দুস্থ নারীরা খুঁজে পেয়েছেন বেঁচে থেকে স্বাবলম্বী হওয়ায় সুযোগ।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘প্রকৃতি বাংলাদেশ’ এর মাদার প্রকল্প ‘এমসিসি আমেরিকা’র কান্ট্রি প্রতিনিধি মি. জর্জ জানিয়েছেন, ১৯৮৭ সালে আগৈলঝাড়ায় কেয়াপাম হ্যান্ডিক্রাফট মাত্র ৭ জন নারী কর্মী নিয়ে ৬ লাখ ডলার মূল্যের রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করে। বর্তমানে এখানকার হস্তজাত শিল্প এখন ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ২৫ লাখেরও বেশী মার্কিন ডলার আয় করছে।