চন্দ্রদ্বীপনিউজ:ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইআবি) বিভিন্ন পদে গত শুক্র ও শনিবার প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আইন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের কয়েকটি পদের নিয়োগ পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু সেখানে ‘চাপ’ সৃষ্টি করছিল কয়েকটি গ্রুপ। এর মধ্যে ছিল একটি রাজনৈতিক দল, মাদ্রাসাকেন্দ্রিক একটি সংগঠন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা। পরে শিক্ষা উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ গেলে তিনি নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) তদন্তের নির্দেশ দেন। অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার আশ্বাস দিলেও এই চার কর্মকর্তার কারণে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে চার কুতুব নামে পরিচিত এসব কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জিম্মি করে রেখেছেন বলেও অভিযোগ আছে।
এসব কর্মকর্তা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আইয়ুব হোসেন, সহকারী রেজিস্ট্রার মো. রুহুল্লাহ, সহকারী রেজিস্ট্রার দিদার উল্লাহ ও সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আব্দুল হান্নান সাব্বির। তবে অন্য কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এই চার কর্মকর্তা বিশ্বাবিদ্যালয় প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করলেও উপাচার্যের ভূমিকা রহস্যজনক। তিনি হয়তো সব কিছু জেনেও না জানার ভান করে আছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ধর্মভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দল, দেশের মাদ্রাসাকেন্দ্রিক একটি সংগঠন পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। ২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংগঠনটি নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নেওয়াসহ নিয়োগ বাণিজ্য করে আসছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রতিটি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংগঠনটির সুপারিশে কেউ না কেউ নিয়োগ পেয়েছেন, যার সংখ্যা অন্তত ৭০ জন। সংগঠনটির একজন শীর্ষ নেতার ছেলেও একই প্রক্রিয়ায় ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পান।
এ বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘আগে অনেকেই অনেকভাবে নিয়োগ পেয়েছেন। কেউ কেউ একটি সংগঠনের সুপারিশের চাকরি পেয়েছেন, এটা আমিও শুনেছি। এখন থেকে সেটি আর হবে না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, গত শুক্র ও শনিবারের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করার পেছনে রয়েছে নানা অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ‘সরলতা’র সুযোগে প্রশাসন কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছেন সহকারী রেজিস্ট্রার পর্যায়ের পাঁচ কর্মকর্তা। তাদের কারও বোন, কারও স্ত্রী, কারও শ্যালিকার নিয়োগ নিশ্চিত করতে এসব কর্মকর্তা উপাচার্যের ওপর ‘চাপ’ সৃষ্টি করেন। এদের মধ্যে তিনজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং দুজন সাবেক শিবির নেতা।
অভিযোগ রয়েছে, রেজিস্ট্রার আইয়ুব হোসেন তার দপ্তরের সহকারী রেজিস্ট্রার মো. রুহুল্লাহর নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি পরিচালিত হন। সহকারী রেজিস্ট্রারই অফিস চালান এবং এসব বিষয়ে উপাচার্য শামছুল ইসলাম বলেন, ‘অনেকের বিষয়ে আমি জানি, কারও বিষয়ে নতুন শুনলাম। তবে সবার পেছনে তো গোয়েন্দা লাগানো সম্ভব না।’ নিজের পিএসের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক মাদ্রাসার অধ্যক্ষ অবৈধ কিছু দাবি নিয়ে আসেন, সে (পিএস) যদি বুঝিয়ে বলে এতে দোষের কিছু দেখছি না। তার পরও যেহেতু অভিযোগ এসেছে, খতিয়ে দেখা হবে।’
অন্যদিকে যোগাযোগ করা হলে সহকারী রেজিস্ট্রার মো. রুহুল্লাহ রেজিস্ট্রার অফিসে কথা বলার পরামর্শ দেন। ব্যক্তিগত বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন বলে ফোন কেটে দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ যত্রতত্র কামিল মাদ্রাসার অনুমোদন দেওয়া। নিয়ম অনুযায়ী ১০ কিলোমিটারের ভেতরে একটি কামিল মাদ্রাসা থাকলে নতুন কোনো অনুমোদন দেওয়া যায় না। কিন্তু নিয়ম ভেঙে গত ১০ মাসে শতাধিক মাদ্রাসাকে কামিল স্তরে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব মাদ্রাসার সক্ষমতা যাচাই করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়েছেন।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রথম ৮ বছরে মাত্র ২০০ মাদ্রাসাকে ফাজিল ও কামিল স্তরে অনুমোদন দেওয়া হলেও সদ্য সাবেক উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আব্দুর রশিদ দেড় বছরের দায়িত্ব পালনকালে অন্তত ১২০টি মাদ্রাসাকে ফাজিল-কামিল স্তরে অনুমোদন দেন। এ সিদ্ধান্তে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসার অধ্যক্ষরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক-দেড় কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে এত কামিল মাদ্রাসা অনুমোদন দেওয়া হলে ভবিষ্যতে আমাদের শিক্ষার্থীরা ভিক্ষা করতে বাধ্য হবে। তারা জানান, আগে কামিল পরীক্ষায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিতেন, এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ৪০ হাজারে।
এ বিষয়ে উপাচার্য শামছুল ইসলাম বলেন, ‘এসব তথ্য সঠিক নয়। ফাজিল ও কামিল স্তরে যারা আবেদন করছেন তাদের সক্ষমতা যাচাই করতে পরিদর্শন টিম পাঠানো হয়। তারা ১০ কিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোনো মাদ্রাসা আছে কি না, নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী আছে কি না—এসব বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার পরই তা অনুমোদন দেওয়া হয়।’ তার দাবি, ‘গত ১৫ বছরে অনেক প্রতিষ্ঠান সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক কারণে অনুমোদন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সেগুলোকে এখন গুরুত্ব দিয়ে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।’