পাঠচক্র থেকে গণ-অভ্যুত্থানে

ভাবিনি কখনো সামনের সারিতে এসে রাজনীতি করব। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরু থেকে রাজনীতিতে আগ্রহ ছিল। যুক্ত ছিলাম প্রথম কোটা আন্দোলনে। সামাজিক একটা পরিবর্তন চাইতাম। যখন প্রথম বর্ষে পড়ি, ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনে আমার এক সহপাঠীকে আটক করা হয়। ঘটনাটি আমাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে।

২০১৯ সালে নুরুল হকের প্যানেল থেকে ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিই। কিন্তু প্রথাগত ধারার রাজনীতি কখনো সেভাবে আমাকে আকর্ষণ করেনি। তাই নুরুল হকের সংগঠনে পরে আর যুক্ত হইনি। তবে ক্যাম্পাসের যেকোনো ন্যায্য আন্দোলনে সব সময় সোচ্চার ছিলাম। ২০১৯ সালে আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে যে আন্দোলন হয়, সেখানে ছিলাম। সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আমার ভূমিকা ছিল। ২০২০ সালে সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদে রাজু ভাস্কর্যের সামনে নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী ৫৫ দিন কর্মসূচি পালন করেন। সেখানে আমরা অড্ডা দিয়েছি, মাহফুজ ভাইয়ের (মাহফুজ আলম) সম্পাদনায় কাঁটাতার নামে পত্রিকা বের করেছি। ওই সময় আমার ভেতরে একটা পরিবর্তন আসে। বুঝতে পারি, নতুনভাবে শুরু করতে হবে। তবে কী করব, তা জানতাম না। এ সময় পৃথিবীতে করোনা শুরু হলো।

করোনার পর ক্যাম্পাসে ফিরে দেখলাম, আবরার হত্যাসহ আরও কিছু নিপীড়নমূলক ঘটনায় ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি যেভাবে নাজুক হয়েছিল, তারা সেটা কাটিয়ে উঠেছে—ছাত্রবান্ধব কর্মসূচি দিচ্ছে, লাইব্রেরি করছে ইত্যাদি। অনুভব করলাম, ছাত্র আন্দোলন হারিয়ে যাচ্ছে। তাই একটু পড়াশোনার মধ্যে ঢুকলাম। এই পর্যায়ে মাহফুজ ভাইয়ের নেতৃত্বে অনেকটা গোপনেই শুরু হলো গুরুবার আড্ডা। রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ছাত্র আন্দোলন, ধর্ম প্রভৃতি বিষয় নিয়ে পড়াশোনা আর তর্ক—এভাবেই আড্ডাটা চলছিল।

২০২২ সালে আবরারের স্মরণসভায় হামলা হয়। এ ঘটনায় সে সময় ছাত্রদের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। একপর্যায়ে ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি নামে নতুন সংগঠন করলাম। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৬ জানুয়ারি কোনো বাধা ছাড়াই ভোটারবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এল। সবার মধ্যেই হতাশা।

আমি তখন টিউশনি করতাম, কোচিংয়ে ক্লাস নিতাম। তবে মূল লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ছাত্রশক্তির সাংগঠনিক বিস্তার ঘটানো। আমরা হাল ছাড়িনি। নানা ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছি। সংগঠনের ব্যানারে না করে সাধারণ ছাত্রদের ব্যানারে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, ইফতার মাহফিল, ফিলিস্তিনের সঙ্গে সংহতি, নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে কর্মসূচি—এসব করেছি। আমাদের চিন্তা যত না ছিল সংগঠন করা, তার চেয়ে বেশি ছিল সংগঠনের হাত ধরে একটা রাজনৈতিক পরিসর রচনা এবং ছাত্রদের সেখানে যুক্ত করা। এ জন্য আমরা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর জোর দিই। মাহফুজ ভাই, আসাদ ভাই (ভূঁইয়া মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান) মিলে পূর্বপক্ষ ও রণপা নামে পত্রিকা বের করেন। পাশাপাশি চলে গুরুবার আড্ডা, রসিক আড্ডা নামের পাঠচক্র এবং ছয়চক্র নামের একটি একাডেমিক আড্ডা। আরও ছিল রাষ্ট্রকল্প লাইব্রেরি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে এগুলো আদতে ছিল লড়াই।

এই বাস্তবতায় আমরা ওই দিন সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হই। সবাই মিলে গ্রন্থাগারের ভেতরে গিয়ে বিসিএসপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ডাকলাম। স্বতঃস্ফূর্তভাবে সবাই-ই এল। আমরা একটা দলের মতো হলাম। গ্রন্থাগারের সামনে মিছিল করে কোটা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দিলাম। তখন কিন্তু আমাদের কোনো ব্যানার ছিল না। ব্যানারবিহীনভাবে মাত্র তিনটি কর্মসূচির পর কোরবানি ঈদের বন্ধ শুরু হলো। আন্দোলনে ঈদের আগে অল্প কয়েকজন মেয়ে ছিল, পরে অনেকে যোগ দেয়। আমরা আলটিমেটাম দিলাম।

ঈদের মধ্যে সাংগঠনিকভাবে গোছালাম। সারা দেশে তৈরি করলাম প্রতিনিধি নেটওয়ার্ক। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সময়ে অভিন্ন কর্মসূচি দেওয়া হলো। জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, বরিশাল, রংপুরের বেগম রোকেয়া—বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে শুরু হলো আন্দোলন। ঈদের ছুটিতে আমরা বিভিন্ন সার্কেলে গিয়েছি, বুদ্ধিজীবীদের কাছে গিয়েছি। তেমন সাড়া পাইনি।

ঈদের পর ১ জুলাই আন্দোলন শুরু হলেও ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে যাত্রা শুরু হয় ৫ তারিখ। ‘কোটা পুনর্বহাল চাই না’ ফেসবুক গ্রুপে নাম আহ্বান করলে এই নামের পক্ষে বেশি ভোট পড়ে। আর এমন নাম দেওয়ার কারণ হলো, কোটা নিয়ে ২০১৮ সালের আন্দোলনটা ছিল ব্যক্তিগত স্বার্থের জায়গা থেকে। ফলে এমন একটা নাম আমরা দিতে চেয়েছি, যাতে নামের মধ্যেই একটা নীতি প্রতিফলিত হয়। শুধু চাকরি নয়, এ আন্দোলনের মাধ্যমে দুর্নীতির বিতাড়ন, ভালো আমলাতন্ত্র—এসবও যুক্ত করতে চেয়েছিলাম। করা যায়নি। মাঠে শুধু বৈষম্যবিরোধীটাই টিকে গেছে।

আন্দোলনের কৌশল

আন্দোলনে সব সময় ভিন্ন ধরনের নামে কর্মসূচি দেওয়ার চেষ্টা করেছি আমরা। হরতাল-অবরোধ—এসব খুব প্রচলিত। মানুষ জানে এখানে কী হয়—একটা বাধা আসে, পুলিশ বা ছাত্রলীগ হামলা করে। তাই আমরা ‘বাংলা ব্লকেড’ নাম দিলাম এই চিন্তা করে যে শহুরে মধ্যবিত্ত এখানে যুক্ত হোক। আবার জেন-জি প্রজন্মও যেন যুক্ত হয়, তা-ও আমাদের লক্ষ্য ছিল। এই ভিন্নধর্মী কর্মসূচির প্রভাব কিন্তু আন্দোলনে বেশ ভালোভাবেই পড়েছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করার মধ্য দিয়ে আন্দোলন যখন দমনের চেষ্টা হলো, তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছেন। আবার দোয়া-মোনাজাত, গায়েবানা জানাজা—এ ধরনের কর্মসূচিও ছিল আমাদের। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এতে সংযুক্ত হয়েছেন। আদতে আমরা ডান-বাম, শহর-গ্রামসহ নানান মতাদর্শের মানুষ যেন একটা জায়গায় দাঁড়াতে পারে—এমন এক পরিসর তৈরি করতে চেয়েছি।

আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল মধ্যপন্থী। বামপন্থী-ইসলামি-বিএনপিপন্থী—সবার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। এ অবস্থানের কারণে সবার সঙ্গেই আমরা মিশতে পারতাম, এখনো পারি।

আন্দোলনের আরেকটি কৌশলগত দিক ছিল একক নেতৃত্ব না রাখা এবং পরিচিত কাউকে সামনে না আনা। আমি যেহেতু পরিচিত ছিলাম না, তাই সামনে ছিলাম। এমনকি প্রথম দিকে জুনিয়ররা সামনে ছিল। প্রতিদিনই গান-কবিতা হচ্ছে। অপরিচিতদের দেখে সবাই যুক্ত হচ্ছে। কেউ বুঝতেই পারেনি, এখানে নেতৃত্বটা দিচ্ছে কে।

শেখ হাসিনা তখন দেশে ছিলেন না, চীনে গিয়েছিলেন। আমরা ভেবেছি, দেশে ফিরে তিনি ইতিবাচক কিছু একটা বলবেন। কিন্তু ১৪ জুলাই তিনি আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে কটূক্তি করলেন। কথাটি সবার আত্মমর্যাদায় আঘাত করল। ওই রাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হল থেকে বেরিয়ে এলেন ক্যাম্পাসের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা।

১৫ জুলাই মেয়েদের ওপর ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হামলা করল। ক্যাম্পাস থেকে আমরা বিতাড়িত হলাম। ১৫ তারিখ রাত থেকে একটু একটু পালিয়ে থাকতে শুরু করি। মুঠোফোন বন্ধ রাখি। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদসহ ছয়জন শহীদ হন। এদিন বিকেলে শহীদ মিনারে আমাদের কর্মসূচি ছিল। সবাই লাঠি নিয়ে শহীদ মিনারে এলেন। আমি ঘোষণা করলাম, আবু সাঈদ শহীদ হয়েছেন। মারা যাওয়ার আগের দিনও বাকেরের (আবু বাকের মজুমদার) সঙ্গে তাঁর কথা হয়।

আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর থেকেই মূলত আন্দোলন সর্বব্যাপকতা লাভ করে। গণজোয়ার শুরু হয়। জাহাঙ্গীরনগর, ঢাকা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করে তাদের বিতাড়িত করেন শিক্ষার্থীরা। মেয়েদের হলে শুরু হয় প্রতিরোধ। এ আন্দোলনে মেয়েদের ভূমিকা ছিল ব্যাপক। আন্দোলনের বড় শক্তিও তাঁরা।

যেভাবে গোয়েন্দাদের ধোঁকা দিয়েছিলাম

আমাদের আন্দোলনের সফলতার আরেকটি বড় কারণ হলো, গোয়েন্দাদের ধোঁকা দিতে পারা। ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো বন্ধের ঘোষণা দেয় ইউজিসি। ১৭ জুলাই ছিল কফিনমিছিল। ওই দিন আবার মহররম। আমরা এত প্রচারণা করতে পারিনি। সেদিনও পুলিশ, র্যাব, বিজিবি সম্মিলিতভাবে আমাদের আক্রমণ করে। এর মধ্যে ডিজিএফআইয়ের লোকজন কথা বলতে চায় আমাদের সঙ্গে। তারা চেয়েছিল আমরা যেন সবাইকে নিয়ে ওদের সঙ্গে বসি, যাতে ওদের পক্ষে সবাইকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। কিন্তু সবাইকে নিয়ে ওদের সঙ্গে আমরা বসিনি, আমাদের কেউ কেউ বসেছে আর পরিকল্পনা করেই কাউকে কাউকে বাইরে রাখা হয়েছে। ক্যাম্পাসের মধ্যে ওদের সঙ্গে যখন বসেছি, তারা আমাদের বলেছে, ‘তোমরা সংলাপ করো। তোমরা যার সঙ্গে বসতে চাও, তার সঙ্গেই বসতে পারো।’ বিপরীতে আমরা বলেছি, ‘ঠিক আছে আমাদের কথা মানলাম।’ আমি হয়তো গোয়েন্দাদের সঙ্গে মিটিংয়ে বসেছি, আর আসিফকে (আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া) রাখা হয়েছে বাইরে। আমাদের মিটিং শেষ হওয়ার আগেই সে পরের দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে দিয়েছে। গোয়েন্দারা বারবার এভাবে বিভ্রান্ত হয়েছে। ওরা বুঝতে পারত না, কাকে বললে কী হবে? কে মূল নেতৃত্বে?

একপর্যায়ে ভাবতে থাকি, যেকোনো মুহূর্তে আমাদের গ্রেপ্তার করবেন গোয়েন্দারা। তাই তাঁদের সঙ্গে বৈঠকের সময় নিজেদের মুঠোফোন নিয়ে যাইনি। এ সময় তাঁরা আবারও আমাদের বলেন, ‘তোমাদের সবাইকে লাগবে, তোমরা সংলাপে বসো।’ আমরা বলেছি, ‘আমাদের হল থেকে বের করে দিচ্ছেন, মন্ত্রীরা নেতিবাচক বক্তব্য দিচ্ছেন, ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, এভাবে তো সংলাপ হয় না। এগুলো ঠিক করেন, বসব।’ তাঁদের এভাবে বুঝ দিয়ে বের হতাম। কথা দিলেও তা বাস্তবায়ন করতাম না, অন্য কিছু একটা করতাম।

১৮ জুলাই কমপ্লিট শাটডাউনের ঘোষণা দিলাম। এ সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাঠে নামলেন, শহীদ হলেন অনেকে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যখন মারা হচ্ছিল, সে সময় শুরু হয়েছে আমাদের পলাতক জীবন—মাঠে ছিলাম না—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছিলাম। ভিডিও–বক্তৃতা দিচ্ছি, ঘন ঘন জায়গা পাল্টাচ্ছি। কাছে কখনো মুঠোফোন ছিল, কখনো ছিল না। সবই করেছি গোয়েন্দাদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য। জানতাম আমাদের গ্রেপ্তার করা হবে। এক রাতে ধানমন্ডির একটা বাসায় ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, আমি এখানে নিরাপদ না। কাউকে না বলে খালি পায়ে বের হয়ে গেলাম। ওই রাতে ধানমন্ডির একটা মসজিদে ছিলাম। পরদিনই সেই বাসার মালিককে তুলে নিয়ে গেছে। সে রাতে ওখানে থাকলে গ্রেপ্তার হতাম নিশ্চিত।

তুলে নিয়ে গেল

১৯ জুলাই ১০-১২ দিন পর বাসায় গেলাম। তত দিনে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেছে। আসিফ ও বাকেরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে পারলাম না। সরকার সে সময় একদিকে নির্বিচার মানুষ মারছে, অন্যদিকে ধরছে আন্দোলনকারীদের। আওয়ামী বয়ান ছিল, মৃত্যুর জন্য ছাত্ররা দায়ী, আন্দোলনকারীরা দায়ী। সরকারবিরোধীরা সুযোগ পেয়েছে, তাই এত মানুষ মারা গেছে।

এদিকে এভাবে পালিয়ে বেড়াতে আমার আর ভালো লাগছিল না। ভাবলাম, যা হওয়ার হবে, এবার প্রকাশ্য হব। ১৯ জুলাই সন্ধ্যায় নন্দীপাড়ায় এক বন্ধুর বাসায় গেলাম। রাত ১১টায় কারফিউর সংবাদ দেখলাম। তবে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে আন্দোলনের কোনো সংবাদ নেই। তখন আমি বিবিসি, এএফপি ও নেত্র নিউজের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। বার্তা পাঠালাম, শাটডাউন অব্যাহত থাকবে।

রাত বোধ হয় তখন আড়াইটা-তিনটা বাজে। ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ ডেকে তোলা হলো আমাকে। শুনলাম, ডিবি পুলিশ এসেছে। ছাদে চলে গেলাম। আমাকে অনুসরণ করে পুলিশও উঠে এল ছাদে। তাদের বললাম, ‘আমিই নাহিদ ইসলাম।’ চোখ বেঁধে আমাকে নিয়ে চলে গেল তারা। পরে আমাকে একটা রুমে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করল, কার কার সঙ্গে যোগাযোগ আছে, কে টাকা দেয় ইত্যাদি।

২০ জুলাই বিকেল থেকে আমাকে ওরা দাঁড় করিয়ে হাতে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে মারতে থাকে। কেউ এসে মারে, কেউ বোঝায়। কেউ আবার ইমোশনাল কথাবার্তা বলে। বলে, ‘আন্দোলন স্থগিত করো।’

আমাকে ওরা খাবারের সঙ্গে কিছু মিশিয়ে দিয়েছিল কি না জানি না, ডিবিতে সব সময়ই হ্যালুসিনেশনের মতো হতো আমার। একসময় তারা বলল, ‘তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। কাল কোর্টে রায় হবে। তুমি গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করবে, আন্দোলন স্থগিত করবে। কোটা সংস্কার হয়ে যাবে। তোমরা চাইলে আন্দোলন থেকে এভাবে এক্সিট নিতে পারবে।’ আমি হ্যাঁ-না কিছুই বলিনি।

২১ জুলাই ভোর চারটার দিকে আমাকে তারা পূর্বাচলে ফেলে যায়। বলেছিল, ‘তোমাকে যে তুলে এনেছি, এটা কেউ জানে না। কাউকে জানাবে না। জানালে আবার তুলে নিয়ে যাব।’ তারা আমার পকেটে এক হাজার টাকাও দিয়ে যায়, যাতে বাড়ি ফিরতে পারি। গোটা দিন গোয়েন্দারা আমাকে নির্যাতন করেছিল। আন্দোলনের পরিস্থিতি কিছুই জানতাম না। ২১ তারিখ ভোরে প্রথম আলোনিউ এজসহ ৮-১০টি পত্রিকা কিনে বাসায় এলাম। পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পেলাম।

তারপর চিকিৎসার জন্য গেলাম গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে। সেখানেও গোয়েন্দা সংস্থা পিছু ছাড়ল না। আদতে ২২ জুলাই থেকেই গণস্বাস্থ্যে আমরা ওদের কাছে জিম্মি ছিলাম। দরজার সামনে সব সময় সাত-আটজন গোয়েন্দা থাকত। ইন্টারনেট সংযোগ কেটে দিয়েছিল। দর্শনার্থীদের আসতে দিত না। এমনকি আমার মুঠোফোনও নিয়ে গিয়েছিল। তখন সহযোদ্ধা অনেকের খোঁজ পাচ্ছি না। এদিকে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন ক্রমাগত আমাদের চাপ, প্রলোভন, সবশেষে হুমকি দিচ্ছে। ওদের এসবের উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলন দমন করা। আমাদের বলল, ‘সংবাদ সম্মেলন করো।’ কী কী বলতে হবে, তা তারা শিখিয়ে দিল।

তবে ২৩ জুলাই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে যে সংবাদ সম্মেলন হলো, সেখানে আমরা ওদের শেখানো কথা বললাম না। ওরা কোনোভাবেই আমাকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। কারণ, ওদের আমি এক কথা বলি, আবার গণমাধ্যমে বলি সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।

এর মধ্যে আসিফ, বাকেরও গণস্বাস্থ্য হাসপাতালবাসী হয়। একপর্যায়ে হাসপাতাল থেকে আসিফ, বাকেরসহ আমাকে ওরা আবার তুলে নেয়। এবার ডিবি অফিসে। পরে আরও কয়েকজন সমন্বয়ককে তুলে আনা হয়। চলতে থাকে মানসিক-শারীরিক নির্যাতন। ওরা বলে, মেয়েদের ধরে নিয়ে আসবে। যেসব সমন্বয়ক এখন বাইরে আছে, তাদেরও গুম করা হবে। নানা রকম চাপ দিয়ে আমাদের কাছ থেকে বিবৃতি আদায় করে তারা।

বলা দরকার, ডিবি অফিসেই পুলিশের নিম্নপদস্থ দু-একজন আমাদের সাহায্য করত। রাতে পত্রিকা দিতে চেষ্টা করত।

৩০ তারিখ ছাড়া পেলাম আমরা। নির্যাতনের ধকলে আমি তখন খুব অসুস্থ। কী হচ্ছে বুঝতে পারছি না। ডিবিতে বাধ্য হয়ে বিবৃতি দিয়েছি, মানুষ ভুল বোঝে কি না—এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। পরে বুঝলাম, না, সবাই বুঝতে পেরেছে কোন পরিস্থিতিতে আমরা সেদিন বিবৃতিটি দিয়েছিলাম।

অতঃপর এক দফা

ব্যক্তিগতভাবে ১-২ আগস্টেই আমি বুঝেছি, এবার এক দফার ঘোষণা দিতে হবে। ৩ জুলাই বলেছিলাম, আমাদের চোখ গণভবনের দিকে। এরপর তো ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ভীত হয়ে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলেন। বেলা দেড়টার দিকে শুনলাম, হাসিনা পালিয়েছেন। প্রথমে বিশ্বাস করিনি। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, ঘটনা সত্যি।

মানুষ মুক্তি খুঁজছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে সেই মুক্তি ঘটেছে। সব সময় আমি পেছনেই থাকতে চেয়েছি। কিন্তু নিয়তি আমাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

নাহিদ ইসলাম: তথ্য ও সম্প্রচার এবং ডাক ও টেলিযোগ উপদেষ্টা; বৈষম্যবিবোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা




বরিশালে বস্তিতে হামলায় আহত বিএনপি সমর্থক নারীর মৃত্যু

বরিশাল অফিস :: বরিশাল নগরীর ঈদগাহ ময়দান সংলগ্ন ভাটার খাল বস্তিতে সম্প্রতি হামলা এবং পাল্টা হামলার ঘটনায় গুরুতর আহত বিএনপি সমর্থক মায়া বেগম নামে এক তিন সন্তানের জননী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

রবিবার (৩ রা নভেম্বর) সন্ধ্যা ৭ টার দিকে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের তার মৃত্যু হলে তারপর থেকেই এ ঘটনায় এলাকার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে নিহতের পরিবার এবং স্থানীয়রা রবিবার মধ্যরাতে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছেন। তারা হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।

ভাটার খাল এলাকার বাসিন্দা রুহুল আমিন অভিযোগ করেন, গত ২৮ অক্টোবর দুপুরে এলাকার আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জের ধরে আওয়ামী সমর্থক রুহুল এবং স্থানীয়রা হামলা চালায়। এ হামলায় নিহত মায়া বেগম, তানিয়া বেগম ও শিল্পী বেগম গুরুতর আহত হন।

আহতদের উদ্ধার করে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হলে, তিন দিন পর রবিবার বিকেলে মায়া বেগম মারা যান।

মায়া বেগমের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। তিনি একজন প্রতিবন্ধী সন্তানের মাতা এবং তার কোলের শিশুর বয়স মাত্র ছয় মাস।

এ ঘটনায় বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। হামলার অভিযোগ সম্পর্কে মোবারক হোসেন জিদনী জানান, হামলার সময় উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টা হামলা ঘটে, তবে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করা হয়নি।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, নিহত মায়া বেগমের স্বজনদের থানায় মামলা দায়েরের জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং হামলাকারীদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেব।




ভূমি মালিকানা ও ব্যবহার আইন, ২০২৩’-এর খসড়া চূড়ান্ত

চন্দ্রদ্বীপ ডেস্ক: জমির মালিকদের ‘ভূমি মালিকানা সনদ (সার্টিফিকেট অব ল্যান্ড ওনারশিপ-সিএলও)’ দেবে সরকার। কিউআরকোড বা ইউনিক নম্বরসংবলিত এই ‘ভূমি স্মার্ট কার্ড’ বা সনদই ভূমির মালিকানা নির্ধারণে চূড়ান্ত দলিল বলে গণ্য হবে। ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) দিতেও ব্যবহার হবে এই কার্ড। কোনো কারণে টানা তিন বছর কেউ খাজনা না দিলে তার জমি বাজেয়াপ্ত ও খাস করা হবে।

এ ছাড়া জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কারও জমি অবৈধভাবে দখল করলে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। এসব বিধান রেখে ‘ভূমি মালিকানা ও ব্যবহার আইন, ২০২৩’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়।




মোবাইল কলরেট কমানো ও মেয়াদবিহীন প্যাকেজ চালুর আহ্বান নাহিদ ইসলামের

চন্দ্রদ্বীপ ডেস্ক :: ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম মোবাইল কলরেট কমানোর এবং ইন্টারনেটের জন্য মেয়াদবিহীন প্যাকেজ চালুর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কর্মসংস্থান এবং দেশের উন্নয়নের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করছে। রবিবার (৩ নভেম্বর) ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অফিসে রবি এবং গ্রামীণফোনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

এ সময় তিনি গত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের পুনর্বাসন ও আহতদের চিকিৎসায় সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন। নাহিদ ইসলাম বলেন, “যেহেতু আন্দোলন কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল, তাই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য।”

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে বর্তমানে কাজ করার উপযুক্ত সময় বিরাজ করছে এবং অন্তর্বর্তী সরকার জনসমর্থিত হওয়ায় দেশ ও দেশের মানুষের উপকারে আসা যেকোনো কাজ করতে আগ্রহী। তিনি মোবাইল কলরেট কমানোর জন্য যুব সমাজের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।

গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসির আজমান বৈঠকে জানান, “বর্তমানে টেলিযোগাযোগ খাতে পরিবেশ পরিবর্তন হয়েছে। এখন ফিডব্যাক গ্রহণ করা হচ্ছে, যা টেলিকমিউনিকেশন খাতের জন্য শুভলক্ষণ।” রবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজিব শেঠী বলেন, টেলিকমিউনিকেশন খাতে কমিশন বেইজড বিভিন্ন স্তর তৈরি হয়েছে, যার ফলে মোবাইল অপারেটররা মুনাফা বঞ্চিত হচ্ছে।

এই বৈঠকে রবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহেদুল আলম এবং গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।




বিদেশি ঋণের স্থিতি কমেছে

চন্দ্রদ্বীপ ডেস্ক :: দেশের বেসরকারি খাতে স্থগিতকৃত বৈদেশিক ঋণের স্থিতি কমতে শুরু করেছে। ডলার সংকট ও ঋণ শোধের বোঝা কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বর্তমানে ব্যাপকভাবে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে এই ঋণের স্থিতি ৮৬ কোটি ৭৪ লাখ ডলার থেকে কমে ৬৮ কোটি ৮৫ লাখ ডলারে নেমে এসেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮২৬২ কোটি টাকা।

সম্প্রতি ডলারের বিনিময় হার এবং আন্তর্জাতিক সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণ পরিশোধে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। করোনাকালীন সময় ও পরবর্তী ডলার সংকটের কারণে বেসরকারি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি, ফলে তাদের কিছু ঋণ স্থগিত করা হয়েছে। এসব ঋণের উপর বর্ধিত সুদের চাপ এবং বাজারমূল্যের বিনিময়ে ডলার কিনতে বাধ্য হওয়ার কারণে ঋণের কিস্তি পরিশোধে আরো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। এ সময়কালে দেশের ব্যাংকিং খাত কিছু ঋণ খেলাপির ঘটনা দেখেছে, যেখানে বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে এলসি খোলা হলেও পণ্য দেশে আসেনি, বরং সেই অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্দে উঠে এসেছে।

ডলার সংকট ও বৈদেশিক ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর ফলে আগের চেয়ে আরও বাড়তি চার্জ ও কমিশন পরিশোধ করতে হচ্ছে। ২০২০ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কমিশন পরিশোধের অংক বেড়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯১৫ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ঋণ পরিশোধে জোর দিয়েছে এবং এর ফলে ঋণের স্থিতি কমে আসছে।




বছরে আয় সাড়ে ৩ লাখের কম হলে করমুক্ত

চন্দ্রদ্বীপ ডেস্ক :: বাৎসরিক আয় সাড়ে ৩ লাখ টাকার নিচে হলে ব্যক্তিরা করমুক্ত থাকবেন এবং তাদের কোনো আয়কর দিতে হবে না। এই সীমার ওপরে আয় হলে ন্যূনতম আয়কর প্রযোজ্য হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান এই তথ্য জানান। রবিবার শের ই বাংলা নগরে এনবিআর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘আয়কর তথ্য-সেবা মাস’ উদযাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়, যেখানে কর সচেতনতা বাড়ানো ও আয়কর তথ্যসেবা কার্যক্রমের ব্যাপক আয়োজনের কথা বলা হয়।

এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের সরকারি কর্মকর্তা, তফসিলি ব্যাংক এবং মোবাইল ফোন অপারেটরদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া সকল করদাতাকে অনলাইনে ই-রিটার্ন ও আয়কর দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে।




গলাচিপায় খাবারে চেতনানাশক প্রয়োগ করে চুরির ঘটনায় ২ চোর গ্রেপ্তার

পটুয়াখালী প্রতিনিধি :: পটুয়াখালীর গলাচিপায় খাবারে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে মা ও ছেলেকে অচেতন করে চুরির ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনা রবিবার (৩ নভেম্বর) রাতে উপজেলার আমখোলা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ঘটে। অসুস্থ অবস্থায় থাকা মাহিনুর বেগম (৪০) ও তার ছেলে আজিজুল (১০), শানু ডাক্তারের স্ত্রী ও ছেলে, বর্তমানে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

সোমবার (৪ নভেম্বর) রাতে গলাচিপা থানা পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন আমতলী উপজেলার আঠারোগাছিয়া ইউনিয়নের গেরাবুনিয়া গ্রামের দেলোয়ার হোসেন মৃধার ছেলে মাহাতাব হোসেন (৩৬) এবং গলাচিপা উপজেলার সদর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া গ্রামের হাবিব মৃধার ছেলে রাশেদুল মৃধা (৩৭)।

মামলার বিবরণে জানা যায়, রবিবার সন্ধ্যায় ভিকটিমের ঘরে চোর চক্রের সদস্যরা সুকৌশলে প্রবেশ করে। তারা রাতের খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে দেয়। পরবর্তীতে খাবার খেয়ে মা ও ছেলে অচেতন হয়ে পড়ে এবং চোরেরা স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা ও বিভিন্ন মালামাল চুরি করে নিয়ে যায়।

সোমবার সকালে স্থানীয়রা পিছনের খোলা দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে মা ও ছেলেকে উদ্ধার করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। পরে পুলিশ, আমখোলা বাজারে চেকপোস্ট চলাকালে মাহাতাবকে আটক করে এবং তার কাছ থেকে সোলার ব্যাটারি, পিতলের খুন্তি ও ৪ হাজার ৫৫০ টাকা জব্দ করে। মাহাতাবের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে পুলিশ রাশেদুল মৃধাকেও গ্রেপ্তার করে।

গলাচিপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আশাদুর রহমান বলেন, চুরির ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আসামিদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।




নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশ ধরতে সাগরে রওনা পটুয়াখালীর জেলেরা

পটুয়াখালী প্রতিনিধি :: পটুয়াখালী জেলার জেলেরা অবশেষে দীর্ঘ ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে ইলিশ ধরতে যাত্রা শুরু করেছে। ইলিশের প্রজনন নিরাপদ রাখার জন্য ১৩ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল। তবে এই সময়কালে ভারতীয় ও কিছু অসাধু দেশীয় জেলেদের মাছ শিকারের অভিযোগ উঠেছে, যা স্থানীয় জেলেদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

নিষেধাজ্ঞার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৮০ হাজার জেলে আর্থিক সংকটে পড়েন। সরকারি খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হলেও অনেকের মতে তা ছিল অপর্যাপ্ত। ট্রলার মালিকরা এ সময়ে তাদের ট্রলার এবং সরঞ্জাম মেরামতে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন।

আলীপুর মৎস্য বন্দরের পরিচালক মিজানুর রহমান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “এবার প্রচুর পরিমাণে ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশা করছি।”

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানান, “আজ মধ্যরাত থেকে জেলেরা সাগরে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে। নিবন্ধিত ৭৯ হাজার ৩০৭ জন জেলের মধ্যে ৬৪ হাজার ৭৭০ জনকে ২৫ কেজি করে সরকারি চাল সহায়তা দেয়া হয়েছে। এছাড়া, নিষেধাজ্ঞার সময়ে আইন লঙ্ঘন করায় ১৪২ জন জেলেকে আটক করা হয় এবং ৩৬৭টি অভিযানে ২১ লাখ ৮১১ মিটার অবৈধ জাল জব্দ করে ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছের প্রাচুর্য থাকলে জেলেরা তাদের ঋণ পরিশোধে সক্ষম হবেন এবং সরকারের পদক্ষেপগুলো এই সেক্টরের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”




বরগুনায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ইউপি চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

বরগুনা প্রতিনিধি: বরগুনার কেওড়া বুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান নশাকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রবিবার রাতে বরগুনা শহরের টাউন হল এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

সদর থানা-পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১০ আগস্ট বরগুনা পৌর শহরে জেলা আওয়ামী লীগের একটি বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনের হুমকি দেওয়া হয়। পরে ১২ আগস্ট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথোপকথন করেন, যা ভিডিও করে ফেসবুকে প্রচার করা হয়।

দেশের প্রচলিত আইনে এটি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হওয়ায় পুলিশ গত ৭ অক্টোবর রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করে। এই মামলায় মনিরুজ্জামান নশার সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান জগলুল হাসান জানান, মামলার পরিপ্রেক্ষিতে কেওড়া বুনিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান নশাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোমবার তাকে আদালতে পাঠানো হবে বলে তিনি জানান।

 




ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ: উপকূল জুড়ে কর্মচাঞ্চল্য

বরিশাল অফিস: ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২২ দিনের জন্য ইলিশ ধরার উপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা গত মধ্যরাতে শেষ হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ আহরণ, পরিবহন ও বিপণন বন্ধ রাখা হয়েছিল।

ফলে, বরিশাল উপকূল এলাকার জেলে পল্লী ও মৎস্য আড়তগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। মধ্যরাত থেকেই জেলেরা মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার নিয়ে নদী ও সাগরে যেতে শুরু করেছেন। আড়ৎদার ও মহাজনরা জেলেদের অগ্রিম টাকা দিয়ে সাগরে মাছ ধরতে পাঠানোর কাজ সম্পন্ন করেছেন।

বরিশালের পোর্ট রোড মৎস্য আড়তে আজ থেকে ইলিশ আসা শুরু করবে। বরিশালের অন্যান্য মৎস্য আড়ত, যেমন আলীপুর-মহীপুর, হরিনঘাটা, পাড়েরহাট, চর মোন্তাজ, ঢালচর এবং চর কুকরী-মুকরী, ইতোমধ্যেই ইলিশ সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, দেশে আহরিত প্রায় ৫.৮০ লাখ টন ইলিশের ৭০% বরিশাল অঞ্চলে আহরণ ও উৎপাদিত হয়। তবে নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে ভারতীয় কিছু জেলে নৌকা ও ট্রলার বাংলাদেশের উপকূল ও সমুদ্র সীমায় অবৈধভাবে প্রবেশ করে মাছ লুট করে নিয়ে গেছে। এবছর বাংলাদেশ নৌবাহিনী অন্তত ১০টি ভারতীয় ট্রলার আটক করেছে।

ইলিশের প্রজনন সুরক্ষায় দেশের উপকূলের ৭ হাজার ৩৩৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১৩ অক্টোবর থেকে ২২ দিনের জন্য ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ, পরিবহন ও বিপণনে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়।

নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে দেশের দক্ষিণ উপকূলের ৩৭টি জেলার ১৫৫টি উপজেলার প্রায় ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫৬৫ জন জেলেকে মানবিক সহায়তা হিসেবে ১৪ হাজার ১৬৫ টন চাল বিতরণ করা হয়।

এ বছর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মৎস্য আহরণ প্রবণতা আগের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় মৎস্য অধিদপ্তর বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করেছে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানাসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এ সময়ে বরিশালসহ উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ১০ হাজার অভিযান চালানো হয় এবং ২ হাজার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২ হাজার জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৭০ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয় এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত প্রায় ৬ কোটি মিটার জাল বাজেয়াপ্ত করে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, সারা বিশ্বের ৬০% এরও বেশি ইলিশ এখন বাংলাদেশেই উৎপাদিত হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে এককভাবে ১% এবং মৎস্য খাতে ১২.৫০% অবদান রাখছে। ইলিশের প্রজননক্ষেত্র সুরক্ষায় নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন ৩ হাজার ১৮৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে দেশের প্রথম ‘মেরিন রিজার্ভ এরিয়া’ ঘোষণা করা হয়েছে। ১ নভেম্বর থেকে ৮ মাসের জন্য জাটকা আহরণ, পরিবহন ও বিপণনে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে।

মৎস্য গবেষকদের মতে, ইলিশের জীবনচক্রে প্রজনন, বড় হওয়ার এবং প্রজননক্ষেত্রে ফিরে আসার নির্দিষ্ট ধারা রয়েছে। তারা জানান, নজরদারি বৃদ্ধির ফলে ২০১৭ সালে ইলিশ পোনা বা জাটকার উৎপাদন ৪২,২৭৪ কোটিতে উন্নীত হয়। ২০২২ সালের প্রজনন মৌসুমে দক্ষিণ উপকূলের অভ্যন্তরীণ নদীতে প্রায় ৮৪% মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পায়, যা ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের মতে, পরিকল্পিত পদক্ষেপ ও নজরদারি বৃদ্ধির কারণে ইলিশের প্রজনন সাফল্য এবং উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে।