বরিশাল নগরীর অসংখ্য রাস্তা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ম্যানহোল দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারবিহীন পড়ে থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। অপরিকল্পিত ইজারা কার্যক্রম পরিচালিত হলেও নাগরিক সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) এক বছরের জন্য হাট-বাজার ও বাস টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করেছে। একইসঙ্গে তিন বছরের জন্য পাঁচটি পুকুর ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনও জলমহাল, হাট-বাজারসহ বিভিন্ন সরকারি সম্পত্তি ইজারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে এসব কার্যক্রম যতটা সক্রিয়, উন্নয়নমূলক কাজ ততটাই স্থবির হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন নগরবাসী।

বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, ড্রেন ও ম্যানহোল সংস্কার না হওয়ায় জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ ম্যানহোলের ঢাকনা লাগানো হয়নি, ফলে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এছাড়া, নগরীর প্রধান প্রধান সড়কজুড়ে রয়েছে খানাখন্দ। এসব রাস্তায় চলাচল করা সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছে। এমনকি বরিশালের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সংযোগ রাস্তাগুলোও সংস্কারের অভাবে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সিটি করপোরেশন সম্প্রতি নগরীর বিভিন্ন বাজার, বাস টার্মিনাল ও পাবলিক টয়লেট ইজারা সংক্রান্ত দরপত্র প্রকাশ করেছে। ইজারার তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে ১৫টি হাট-বাজার, দুটি বাস টার্মিনাল, তিনটি পাবলিক টয়লেট এবং একটি জবাইখানা। তবে নাগরিক আন্দোলনের নেতারা অভিযোগ করেছেন, তালিকায় ১৬টি হাট-বাজারের নাম রয়েছে, যা নতুন করে একটি বাজার যুক্ত করার ষড়যন্ত্র বলে মনে করা হচ্ছে।
নাগরিক আন্দোলনের নেতারা বলছেন, বরিশাল নগরীতে উন্নয়ন কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। সড়ক, সেতু, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন কিংবা নাগরিক সেবা নিয়ে প্রশাসনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

বরিশাল নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব প্রকৌশলী আবু সালেহ বলেন,“প্রশাসক ও সিইও নগরীর আয় বৃদ্ধির বিষয়ে যতটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন, নগর উন্নয়নে ততটাই অনাগ্রহী। রাস্তাঘাটের দুরবস্থার কারণে সাধারণ মানুষ চরম কষ্টের মধ্যে থাকলেও প্রশাসন এ নিয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।”
এ বিষয়ে বরিশালের সাবেক মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন,“নগরবাসীর মৌলিক চাহিদা উপেক্ষা করে শুধু টেন্ডার ও ইজারার দিকেই মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। বরিশাল এখন মাফিয়া নিয়ন্ত্রিত শহরে পরিণত হয়েছে।”
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) বরিশাল শাখার নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন,“বরিশাল সিটি করপোরেশনের কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই, তাই প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি জনগণের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা তৈরি না করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে যাচ্ছেন। উন্নয়নের নামে শুধু টেন্ডার বাণিজ্য চলছে।”
শুধু বরিশাল নগরী নয়, সদর ও বাকেরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামেও উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বছরের পর বছর ধরে থমকে আছে।
- সদর উপজেলার পূর্ব কর্ণকাঠী থেকে চরকারঞ্জী হাইস্কুল সড়কের দুটি সেতুর কাজ বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।
- নেহালগঞ্জ সেতু ও বাকেরগঞ্জের গোমা সেতু নিয়েও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি, নাগরিকদের সংশয়
জেলা প্রশাসনের কাছে একাধিকবার এসব অনিয়মের তথ্য জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বরিশালের জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন জানান,
“উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) বিষয়টি দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
তবে তিন মাস পার হলেও এই সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি।
এ বিষয়ে বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রায়হান কাওছার বলেন,
“বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রেজাউল বারী একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে নগরবাসী ও নাগরিক আন্দোলনের নেতারা মনে করছেন, প্রশাসনের এই আশ্বাস শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তবায়ন হবে না।
মো: তুহিন হোসেন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম