এস এল টি তুহিন,বরিশাল :: ঈদ আসলেই এক মহা উৎসব, যা মূলত পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আনন্দে ভরা। কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের জন্য সেই আনন্দের যাত্রা কতটা নিরাপদ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের ঈদযাত্রার নিরাপত্তা নিয়ে এবারও উদ্বেগ প্রকাশিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি) এবং বেসরকারি নৌযান মালিকদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণে যাত্রীরা পূর্বের মতোই নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন।
বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা বর্তমানে মাফিয়া চক্রের হাতে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও সরকারিভাবে যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা ছিল, তা এখন কার্যত অকার্যকর। যাত্রীরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি লঞ্চ মালিকদের ওপর নির্ভরশীল। এই মালিকরা তাদের ইচ্ছামতো ভাড়া নির্ধারণ করে এবং লঞ্চের সংখ্যা সীমিত রাখে, যার ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ে।
বরিশাল অঞ্চলের নৌ যোগাযোগ অনেক দিন ধরেই অব্যবস্থাপনার শিকার। করোনার আগেই বিআইডব্লিউটিসি এসব নৌযান পরিচালনা বন্ধ করে দিয়েছিল। বরিশালের যাত্রীরা এখন বেসরকারি লঞ্চের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
২০২২ সালে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের তিন বছর আগে থেকেই বিআইডব্লিউটিসি দক্ষিণাঞ্চলের নৌযাত্রী সেবা সংকুচিত করতে শুরু করে। বর্তমানে, ঢাকা-বরিশাল নৌপথে প্রতিদিন মাত্র ২-৩টি লঞ্চ চলাচল করে, যা বিপুলসংখ্যক যাত্রীর তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এর ফলে ঈদযাত্রায় যাত্রীদের চরম দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হয়।
একটি কেবিনের জন্য যাত্রীদের অনেক জায়গায় তদবির করতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, লঞ্চ মালিকরা ইচ্ছাকৃতভাবে লঞ্চের সংখ্যা কম রাখছেন এবং ভাড়া বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করছেন, যা তাদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
যাত্রা শুধুমাত্র নৌপথে নয়, বরিশাল-ঢাকা সড়কপথেও এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বরিশাল থেকে রাজধানী ঢাকার দূরত্ব ১৬৫ কিলোমিটার হলেও, প্রায় ৯৫ কিলোমিটার মহাসড়ক এখনও সংকীর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। ঈদকালে অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে এই সড়কপথে ব্যাপক যানজট হতে পারে, যা যাত্রীদের জন্য আরও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
যাত্রীদের অভিযোগ, ঈদকালে সড়কপথে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি করে, যা তাদের ভোগান্তির কারণ হয়। নৌপথের সংকট থাকলেও, সড়কপথ কোনো নির্ভরযোগ্য বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় না। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ অতিরিক্ত দুর্ভোগের শিকার হন।
এ বিষয়ে সরকারিভাবে কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি। বুধবার বিআইডব্লিউটিসির বাণিজ্য বিভাগের সাথে যোগাযোগ করা হলে, কোন ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে বিআইডব্লিউটিসির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে যে, তাদের দুটি স্ক্রু-হুইল নৌযান প্রস্তুত রয়েছে এবং সরকারের সিদ্ধান্ত আসলেই এগুলো চালু করা হতে পারে।
অপরদিকে, একাধিক বেসরকারি নৌযান মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও, তারা ঈদের বিশেষ যাত্রীসেবা চালুর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। অর্থাৎ, দক্ষিণাঞ্চলের ঈদযাত্রা অনেকটাই মালিকপক্ষের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এক বৈঠকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে এবং যাত্রীসেবার মান উন্নত করার নির্দেশনা দিয়েছে। তবে বাস্তবে এটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
বরিশাল-ঢাকা নৌপথে নতুন একটি বিলাসবহুল লঞ্চ যোগ হতে চলেছে। বরিশালের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মাহফুজ খান এমভি এম খান-৭ নামে একটি বিলাসবহুল নৌযান চালু করতে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। এই নৌযানটি ৩২৫ ফুট দৈর্ঘ্যের হবে এবং এতে যাত্রীদের জন্য আধুনিক ও নিরাপদ ভ্রমণের সব ধরনের ব্যবস্থা থাকবে বলে দাবি করা হয়েছে। এতে ফাইভ-স্টার মানের কেবিন, আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম, উন্নত খাবারের ব্যবস্থা এবং আরামদায়ক যাত্রার সুবিধা থাকবে। তবে, প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি শুধুমাত্র অভিজাত যাত্রীদের জন্য হবে, নাকি সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে ভূমিকা রাখবে।
ঢাকায় চাকরিজীবী শামীম হোসেন বলেন, প্রতি বছরই ঈদের আগে টিকিট পাওয়া যেন যুদ্ধের মতো হয়ে যায়। লঞ্চ মালিকরা ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ায়, কিন্তু তাও টিকিট মেলে না। বরিশাল থেকে ঢাকার নৌপথে এত সংকট কেন, তা বুঝতে পারি না। সরকার কি আমাদের দুর্ভোগের কথা শুনবে না।
ঢাকায় বসবাসরত গৃহিণী মাহমুদা আক্তার জানান, পরিবার নিয়ে ঈদে গ্রামের বাড়ি যাবো, কিন্তু টিকিটের জন্য এত দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে যে মনে হচ্ছে, আমরা যেন কোনো দয়া চাইতে এসেছি। কেবিনের জন্য কত জায়গায় ধরনা দিলাম, কোথাও জায়গা নেই। এমন পরিস্থিতিতে ঈদের আনন্দ থাকে কীভাবে।
বরিশাল নৌ বন্দর কর্মকর্তা উপ-পরিচালক শেখ মো: সেলিম রেজা বলেন,আমরা ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি। তবে সরকারিভাবে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি যেমন ছিল, তেমনই থাকবে।