ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে অবস্থিত ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, যেখানে ১৯৭১ সালের বিজয়ের আত্মসমর্পণের সাক্ষী হয়েছিলেন লাখো মানুষ, সেই উদ্যান আজ যেন রাত নামলেই হারিয়ে ফেলে তার ইতিহাসের মাহাত্ম্য। অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বদলে যায় অপরাধের এক জগতে, যেখানে মাদক, ভয়, এবং অনাচার দাপটের সাথে রাজত্ব করে।
সন্ধ্যার পরই পাল্টে যায় উদ্যানের চেহারা। মুক্তমঞ্চ থেকে শুরু করে কালীমন্দিরের পাশ, চারুকলার গেট থেকে লেকপাড়—সব জায়গায় শুরু হয় মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের আনাগোনা। গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য প্রকাশ্যে কেনাবেচা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ছিনতাই, ব্ল্যাকমেইল, অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং অসামাজিক কার্যকলাপ।
এই অপরাধচক্র এতটাই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে যে, সাধারণ পথচারী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সন্ধ্যার পর এই এলাকাগুলো এড়িয়ে চলেন। এক শিক্ষার্থী বলেন, “সন্ধ্যার পর চারপাশে কেবল ধোঁয়ার গন্ধ আর সন্দেহজনক চলাফেরা দেখা যায়। পুলিশ দেখেও না দেখার ভান করে।” এমন পরিস্থিতিতে আবাসিক শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পথচারী, এমনকি হাসপাতালের রোগী ও দর্শনার্থীরাও পড়ছেন নিরাপত্তাহীনতায়।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে সম্প্রতি, মঙ্গলবার রাতে। দুর্বৃত্তদের হামলায় প্রাণ হারান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য। তার মৃত্যুর পর আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—উদ্যানটি কেবল অপরাধপ্রবণ এলাকাই নয়, বরং প্রাণঘাতীও হয়ে উঠছে।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, উদ্যানের গুরুত্বপূর্ণ স্থান যেমন টিএসসি-সংলগ্ন গেট, মন্দির এলাকা, ভিআইপি গেট, মুক্তমঞ্চ এবং ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের পেছনের অংশে সন্ধ্যার পর প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হয়। এসব জায়গা অপরাধীদের দখলে চলে গেছে। স্থানীয় রিকশাচালক বলেন, “গাঁজা কিনতে ছাত্র, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক সবাই আসে। এক পুরিয়া ১০০ টাকা।” তিনি আরও জানান, রাত নামলেই মুক্তমঞ্চে গাঁজার আসর বসে।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর উদ্যানের ‘নিয়ন্ত্রণ’ও বদলেছে। আগে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ করলেও এখন নতুন গোষ্ঠী জায়গা দখল করেছে, যারা ব্যবসার জন্য চাঁদা আদায় করছে।
এই পরিস্থিতিতে দর্শনার্থীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। উদ্যান ঘুরতে আসা আসমা বেগম বলেন, “এত সুন্দর একটা জায়গা অপরাধীদের দখলে যেতে দিতে পারি না।” আল আমিন নামে আরেকজন বলেন, “সিসিটিভি, পর্যাপ্ত আলো, টহল এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া কিছুতেই পরিবেশ পাল্টাবে না।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ জানিয়ে লিখেছেন, “সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে উঠেছে মাদক ও চাঁদাবাজির আখড়া। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য এসব অপরাধের নীরব বা সক্রিয় অংশীদার।”
এই ঐতিহাসিক উদ্যান রক্ষার জন্য প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ। উদ্যানজুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, পর্যাপ্ত আলো, নিয়মিত পুলিশি টহল, এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। একইসাথে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নাগরিক সমাজের সচেতন ভূমিকা।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কেবল একটি পার্ক নয়—এটি আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এই উদ্যানকে নিরাপদ, সুন্দর ও সম্মানজনক স্থানে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি।