নৌকার গায়ে লেখা থাকে জীবনের গল্প, ভেসে চলে শত পরিবারের স্বপ্ন

ভোরের আলো ফুটতেই নদীপাড়ের বাতাসে মিশে যায় হাতুড়ির ঠকঠক শব্দ। করাতের ঘ্রাণে ভরে ওঠে গজারিয়া বাজার। কাঠের টুকরোর ফাঁকে ফাঁকে জমে ওঠে ঘামের গল্প, স্বপ্নের রং। এখানে প্রতিদিন জন্ম নেয় নতুন নৌকা—আর সেই নৌকার গায়ে ভেসে ওঠে শত শত পরিবারের জীবনের গল্প।

ভোলার লালমোহন ও চরফ্যাশন এলাকার গজারিয়া বাজারে নৌকা শুধু যাতায়াতের বাহন নয়, এটি জীবনের অবলম্বন। যারা এই নৌকা বানান, স্থানীয়ভাবে তারা পরিচিত ‘নৌকা ব্যাপারী’ নামে। বাপ-দাদার হাত ধরে শেখা এই পেশাই যুগের পর যুগ ধরে টিকিয়ে রেখেছে অসংখ্য পরিবারকে।

চার দশকের কারিগর আলতাফ হোসেন আজও চোখে ভাসান শৈশবের দিনগুলো। বাবার পাশে দাঁড়িয়ে কাঠ ঘষা, নৌকার গায়ে প্রথম পেরেক ঠোকার মুহূর্ত—সেই স্মৃতি এখনো তাকে শক্তি জোগায়। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তিনি এই পেশায় যুক্ত। তার কারখানায় বর্তমানে কাজ করেন চারজন মিস্ত্রি। চরফ্যাশন, দক্ষিণ আইচা, শশীভূষণ, মনপুরা থেকে জেলেরা এসে তার কাছে নৌকা বানান।

আলতাফ বলেন,
“জেলেদের চাহিদামতো নৌকা বানাই। বর্ষায় কাজ বেশি, শীতে কিছুটা কমে যায়। তবুও এই কাজেই আমাদের সংসার চলে।”

গজারিয়া বাজারে আলতাফ একা নন। মো. নাগর, কালাম, আলমগীর, বেল্লাল, হাসান, মিলন, আল-আমিন, শানু, ইকবাল, জুয়েল, শেখ ফরিদ, আমির—এমন অন্তত ১৫ জন নৌকা ব্যাপারী এখানে প্রতিদিন কাঠ আর ঘামের বন্ধনে গড়ে তুলছেন ভবিষ্যৎ। তাদের কারখানায় কাজ করেন শতাধিক শ্রমিক।

ব্যাপারী ফয়সাল বলেন,
“সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ চলে। নৌকা বানিয়ে জেলেরা নিয়ে যায়। সরকারিভাবে কোনো সহায়তা পাইনি। যদি আর্থিক সহযোগিতা পাওয়া যেত, এই শিল্প আরও এগিয়ে যেত।”

চরফ্যাশন-ভোলা মহাসড়কের পাশে গজারিয়া বাজারে প্রায় অর্ধশত বছর ধরে টিকে আছে এই নৌ-শিল্প। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ ধরতে নৌকা অপরিহার্য হওয়ায় বছরের অন্তত ছয় মাস এখানে ব্যস্ততা থাকে তুঙ্গে। মূলত দুই ধরনের নৌকা তৈরি হয়—ডিঙি ও কোষা। কোষা সাধারণত ৯ থেকে ১০ ফুট, আর ডিঙি ১৫ থেকে ১৬ ফুট লম্বা হয়।

রেইনট্রি, কড়ই, চাম্বুল, সুন্দরী কিংবা মেহগনি কাঠ ব্যবহার করা হয় নৌকা বানাতে। সঙ্গে লাগে পেরেক, তারকাটা ও জলুয়া। একটি ১২ হাতের নৌকা বানাতে তিনজন শ্রমিকের মজুরি পড়ে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। কাঠে লাগে প্রায় ৪ হাজার, আনুষঙ্গিকে আরও ৩ হাজার। সব মিলিয়ে ৯-১০ হাজার টাকায় তৈরি নৌকা বিক্রি হয় ১৪-১৫ হাজার টাকায়। লাভ খুব বেশি নয়, তবুও থামে না তাদের লড়াই। অনেকেই ঋণ নিয়ে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক রিয়াজুর কবির বলেন,
“প্রায় ৪০ বছর ধরে এই শিল্প চলছে। শতাধিক পরিবার এর সঙ্গে যুক্ত। তারা পরিবার চালাচ্ছে, দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে। কিন্তু সরঞ্জামের দাম বেড়েছে, লাভ কমেছে। ধারদেনা করে তারা শিল্প টিকিয়ে রেখেছেন। এই নৌ-শিল্প বাঁচাতে এখন সরকারি সহায়তার বিকল্প নেই।”

নদীমাতৃক বাংলাদেশে যখন অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, তখন গজারিয়ায় এখনো বেঁচে আছে নৌকার স্বপ্ন। হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় তৈরি প্রতিটি নৌকা যেন বলে—এই নদীর পাড়ে মানুষ এখনো স্বপ্ন বানায়, কাঠে খোদাই করে ভবিষ্যৎ।


এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




স্বেচ্ছাশ্রমে গড়া দুই সেতু, ছয় বছরের দুর্ভোগের অবসান মঠবাড়িয়ায়

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের পর কেটে গেছে দীর্ঘ ছয় বছর। এই সময়জুড়ে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেছেন হাজারো মানুষ। স্কুলে যেতে শিশুদের পা কাঁপত, অসুস্থ রোগীকে কোলে নিয়ে পার হতে হতো খাল, বাজারে যেতে বৃদ্ধদের চোখে থাকত ভয়। অবশেষে সেই কষ্টের দিন ফুরালো। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত হলো দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ—যা একসঙ্গে যুক্ত করেছে সাতটি গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা।

মঠবাড়িয়া উপজেলার ধনীসাফা ইউনিয়নের আলগীপাতাকাটা খাল ও মিরুখালী ইউনিয়নের বাদুরা খালের ওপর নির্মিত কাঠের এই দুটি ব্রিজ উদ্বোধন করা হয় সোমবার (১২ জানুয়ারি) দুপুরে। উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক এ আর মামুন খান।

এই সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ওহিদুজ্জামান মিল্টন, উপজেলা যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব তাহসিন জামাল রুমেল, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি ইমরান হোসেন মনি ও ইউনিয়ন যুবদলের নেতাকর্মীরা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে এই দুটি ব্রিজ ভেঙে পড়ে। এরপর দীর্ঘ সময়েও তা পুনর্নির্মাণ হয়নি। ফলে ধনীসাফা ও মিরুখালী ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত সাতটি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। স্কুল-মাদ্রাসায় যাতায়াত, বাজার করা কিংবা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়ার মতো সাধারণ কাজও হয়ে ওঠে বিপজ্জনক।

ধনীসাফা ইউনিয়নের আলগীপাতাকাটা খালের ওপর ৭৫ ফুট এবং মিরুখালী ইউনিয়নের বাদুরা খালের ওপর ২৫ ফুট দৈর্ঘ্যের ব্রিজ দুটি ভেঙে থাকায় হাজারো পথচারী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো বা ভাঙা কাঠের ওপর দিয়ে পার হতেন। অনেক সময় শিশু ও বৃদ্ধরা পড়ে গিয়ে আহতও হয়েছেন।

এই দুরবস্থার চিত্র স্থানীয় যুবদলের নজরে আসে। সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষায় না থেকে ইউনিয়নের যুবদল নেতাকর্মীরা নিজেরাই এগিয়ে আসেন। স্বেচ্ছাশ্রমে, নিজেদের উদ্যোগ ও সহযোগিতায় তারা ব্রিজ দুটি পুনর্নির্মাণ করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ আর মামুন খান বলেন,
“ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে সেতু দুটি ভেঙে পড়ার পর থেকে হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগে ছিলেন। বিষয়টি আমাদের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে নজরে আসে। সাধারণ মানুষের চলাচলের সুবিধার্থেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুবদল সবসময় মানুষের কল্যাণে কাজ করতে চায়।”

ব্রিজ দুটি চালু হওয়ার পর স্থানীয়দের মুখে ফিরে এসেছে স্বস্তির হাসি। একজন বৃদ্ধ বাসিন্দা বলেন,
“এতদিন মনে হতো আমরা যেন আলাদা হয়ে গেছি। এখন আবার সহজে বাজারে যেতে পারব, নাতি-নাতনিরা স্কুলে যেতে পারবে। এই সেতু শুধু কাঠের নয়, আমাদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত।”

স্বেচ্ছাশ্রমে গড়া এই দুটি সেতু এখন শুধু পথ নয়—এগুলো হয়ে উঠেছে মানুষের আশার প্রতীক।


এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




ধানের দামে ধস, মাঠের ঘামে ভাসছে হতাশা পটুয়াখালীর হাটে কৃষকের কান্না

ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙে কৃষকের। কাঁধে নেমে আসে বছরের পর বছরের ক্লান্তি, হাতে তুলে নেয় ঘামের ফসল—ধানের বস্তা। আশা থাকে, আজ হয়তো পরিশ্রমের ন্যায্য দাম মিলবে। কিন্তু পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের সাপ্তাহিক ধান হাটে সেই আশাই ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। এখানে ধানের বস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আজ কৃষকের চোখে শুধু হতাশা, মুখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ছায়া।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকাল থেকেই হাটে জড়ো হন শত শত কৃষক। নৌকা, ভ্যান কিংবা কাঁধে করে বস্তাবন্দি ধান নিয়ে তারা অপেক্ষায় থাকেন ক্রেতার। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে একে একে ফিরছেন বিমর্ষ মুখে। বাজারে এক মণ ধানের দাম ঘুরপাক খাচ্ছে মাত্র ১,১০০ থেকে ১,১৫০ টাকার মধ্যে—যেখানে উৎপাদন খরচই উঠে না।

গলাচিপা উপজেলার উলানিয়া এলাকার ষাট বছর বয়সী কৃষক আবু জাফর বলেন, “চাল, তেল, ডাল—সব কিছুর দাম বাড়ছে। কিন্তু ধানের দাম বাড়ছে না। একজন শ্রমিক খাটাতে দিনে ৭০০-৮০০ টাকা দিতে হয়, সঙ্গে তিন বেলা খাবার। এক মণ ধান বিক্রি করেও সেই খরচ ওঠে না। এভাবে চলতে থাকলে কিছুদিন পর আমরা আর খাইতেই পারব না।”

কালাইয়া হাটের আরেক কৃষক কাওসার আলী (৫৬) ভাঙা কণ্ঠে জানান, “এই বছর যে দামে ধান বিক্রি হচ্ছে, তাতে লাভ তো দূরের কথা, খরচই ওঠে না। ১,১৫০ টাকায় এক মণ ধান বিক্রি করে কী হবে? যদি এমন চলতে থাকে, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই জমি বিক্রি করে খেতে হবে।”

হাটে ঘুরে দেখা যায়, সারি সারি ধানের বস্তা। কেউ বসে আছেন বস্তার ওপর, কেউ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন সম্ভাব্য ক্রেতার দিকে। কিন্তু মুখে কারও হাসি নেই। কৃষকদের অভিযোগ, চলতি মৌসুমে সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর দাম বেড়েছে। অথচ ধানের বাজারদর সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে প্রতিদিনই তারা পড়ছেন আর্থিক চাপে।

চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চর ডিয়ারা গ্রামের কৃষক আরিফুর রহমান (৩৫) জানান, ১৯০ কড়া জমিতে ধান করেছি। আজ ৪০ মণ ধান বিক্রি করতে এনেছি। কিন্তু বাজারদর আর উৎপাদন খরচের হিসাব মিলালে লাভ তো নেই-ই, বরং লোকসান। প্রতিদিনের পরিশ্রমের মূল্য না পেয়ে ভীষণ হতাশ লাগছে।”

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন বলেন,“চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৩৪ হাজার ৭১০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার মেট্রিক টন। কৃষক যেন তার পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পায়, সে বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। সার, বীজ ও অন্যান্য উপকরণ সহজলভ্য রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।”

তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। হাটের প্রতিটি ধানের বস্তা যেন কৃষকের জীবনের গল্প বহন করছে—ঘাম, শ্রম আর অনিশ্চয়তার গল্প। ন্যায্য দাম না পেলে সেই গল্প যে আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠবে, তা বুঝতে কারও বাকি নেই।


এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার পাইপলাইন কতটা নিরাপদ?

চন্দ্রদ্বীপ নিউজ:চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ডিজেল সরবরাহের জন্য নির্মিত বহুল আলোচিত পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরির চেষ্টা হয়েছে। এই ঘটনার পর জ্বালানি নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নটিই সামনে এসেছে।

ঘটনাটি ঘটেছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ১৫ নম্বর ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের হাদী ফকিরহাট রাস্তার পশ্চিম পাশে। সেখানে মাটির প্রায় ১০ ফুট গভীরে থাকা ডিজেল পরিবহন পাইপলাইনে ছিদ্র করা হয়। ছিদ্র দিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে তেল বেরিয়ে এসে সড়কে ছড়িয়ে পড়লে ৮ জানুয়ারি বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় সঙ্গে সঙ্গে ওই লাইনে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে গত রোববার সকালে আবার ডিজেল সরবরাহ শুরু করা হয়।

বিপিসি ও পুলিশ সূত্র জানায়, পাইপলাইনের ঠিক ওপরেই একটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. আফসার। পরে ঘরটি তিনি ভাড়া দেন খুলনা সিটি করপোরেশনের সোনাডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা নাসির উদ্দিনের ছেলে আমিরুল ইসলামের কাছে। অভিযোগ রয়েছে, ঘর ভাড়া নেওয়ার পর আমিরুল পরিকল্পিতভাবে মাটি খুঁড়ে পাইপলাইন পর্যন্ত পৌঁছান এবং সেখানে ছিদ্র করেন। এরপর পাইপলাইনের সঙ্গে আলাদা একটি পাইপ ও মিটার বসিয়ে তেল চুরির প্রস্তুতি নেন।

পাইপলাইনের ছিদ্রের ঘটনা সরেজমিন দেখতে যান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কয়েকজন কর্মকর্তা। তাঁদের একজন বলেন, তেল চোর চক্র মূল পাইপলাইনের সঙ্গে অন্য একটি পাইপ ও মিটার সংযুক্ত করতে চেয়েছিল। তবে সংযোগস্থলে ঝালাই করতে গিয়ে তারা নিয়ন্ত্রণ হারায়। পাইপলাইনে তেলের চাপ বেশি থাকায় ছিদ্র দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল বেরিয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যান অভিযুক্ত ব্যক্তি। সেই তেল সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।

এই ঘটনায় কাউকে হাতেনাতে তেলসহ আটক করা না গেলেও প্রশ্ন উঠেছে, এত গভীরে থাকা একটি পাইপলাইনে কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে খোঁড়াখুঁড়ি করা সম্ভব হলো। স্থানীয় প্রশাসন, বিপিসি কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থার চোখ এড়িয়ে এই প্রস্তুতি কীভাবে চলেছে, তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। বিপিসি এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে এখনো ওই কমিটির প্রতিবেদন জমা পড়েনি।

বাংলাদেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের গড় বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ টন। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরবরাহ করা হয়েছে ৬৮ লাখ টন, যার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচ, শিল্প ও পরিবহন—সব খানেই ডিজেলের ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি।

ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইনের মাধ্যমে বছরে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ এ একটি পাইপলাইন দেশের মোট ডিজেল চাহিদার বড় অংশ বহন করে। ফলে এই অবকাঠামোতে সামান্য বিঘ্ন–জাতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনে প্রতি পাঁচ কিলোমিটার পরপর একজন করে লোক বসিয়ে পাহারা দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা যদি মূলত মানুষের চোখের ওপর নির্ভর করে, তাহলে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তার দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইপলাইনের ওপর অবৈধ স্থাপনা, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের দৌরাত্ম্য এবং দুর্বল নজরদারি মিলিয়ে একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শুধু উচ্ছেদ অভিযান বা ভবিষ্যতে প্রযুক্তি চালু করলেই এই ঝুঁকি কমবে না। এখন থেকেই নিরাপত্তাকে গুরুত্ব না দিলে এমন ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, মিরসরাইয়ের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত এবং দুর্বল নজরদারিরই প্রতিফলন। হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই এই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো দ্রুত পাইপলাইনকে প্রকৃত অর্থে নিরাপদ করা এবং দায় নির্ধারণে কোনো ছাড় না দেওয়া।




নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়: বদিউল আলম মজুমদার

নির্বাচনি প্রস্তুতি দৃশ্যত এগোলেও এখনো শঙ্কা কাটেনি—এমন মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া দেশে কোনো সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) দুপুরে বরিশালে সুজন আয়োজিত বিভাগীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “নির্বাচনি ট্রেন ট্র্যাকে উঠে গেছে ঠিকই, তবে ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। রাজনীতিবিদ এবং তাঁদের মনোনীত প্রার্থীরাই চাইলে এই ট্রেনকে আবার ট্র্যাকচ্যুত করতে পারেন। তারা যদি সদাচরণ করেন, সহিংসতা থেকে বিরত থাকেন এবং অসৎ কৌশল পরিহার করেন, তাহলে নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা থাকবে না।”

তিনি আরও বলেন, “রাজনীতিতে উত্তেজনা কমাতে হবে, সংঘাত ও সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। এমপি হওয়ার জন্য নানা অপকৌশল অবলম্বন বন্ধ না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। বাস্তবতা হলো—নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া এই দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা যায় না।”

সুশাসনের অভাবের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, “যদি রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে প্রতিবারই জনগণকে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে নামতে হবে। এতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।”

বিভাগীয় এই সংলাপে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও নেতারাও এতে মতামত তুলে ধরেন।

সংলাপে বক্তারা বলেন, নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও এটি একমাত্র শর্ত নয়। নির্বাচনের পর গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে হলে স্বাধীন ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এজন্য সুশাসন নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা অপরিহার্য।

বক্তারা আরও বলেন, জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনে নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে।

এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




নির্বাচন ঘিরে বরিশালে যৌথ বাহিনীর কড়া অভিযান, বসানো হলো ১৩ চেকপোস্ট

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বরিশাল নগরীতে শুরু হয়েছে যৌথ বাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তা অভিযান। নগরজুড়ে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি, বসানো হয়েছে একাধিক চেকপোস্ট। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চিহ্নিত অপরাধী গ্রেপ্তার এবং যেকোনো নাশকতামূলক তৎপরতা রোধ করাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ও ব্যস্ত এলাকাগুলোতে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা তল্লাশি কার্যক্রম চালাচ্ছেন।

যেসব এলাকায় চেকপোস্ট বসানো হয়েছে সেগুলো হলো—নথুল্লাবাদ, গড়িয়ারপাড়, আমতলার মোড়, জিলা স্কুল মোড়, জেলখানার মোড়, তালতলী ব্রিজ, কাশিপুর, দিনারের পুল, মরখোলার পোল, চৌমাথা, দপদপিয়া ব্রিজ, কালিজিরা ও রহমতপুর।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, নগরীতে মোট ১৩টি চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। এসব চেকপোস্ট প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকবে। নিয়মিত পুলিশি টহলের পাশাপাশি বাড়তি তল্লাশি ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

তিনি বলেন, “সরকারের প্রধান লক্ষ্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্য অর্জনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত পূরণ করা প্রয়োজন। যৌথ বাহিনীর এই অভিযান তারই অংশ। নির্বাচনকে অস্থিতিশীল করতে পারে—এমন ঝুঁকিপূর্ণ উপাদানগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হুমকি অবৈধ অস্ত্র ও পেশাদার অপরাধীরা।”

পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, অভিযানে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে এবং দাগী আসামিদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য ও সহিংসতায় জড়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—এমন ব্যক্তিদেরও নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী তল্লাশি আরও জোরদার করা হবে।

নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ভোটের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে এই অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




বিজয় নিশ্চিত, এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা: নুর

পটুয়াখালী-৩ (দশমিনা–গলাচিপা) আসনের বিএনপি জোট মনোনীত প্রার্থী ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেছেন, “বিজয় আমাদের হয়েই গেছে, এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা হবে। আমি আপনাদের নিয়েই কাজ করতে চাই, আপনাদের পাশেই থাকতে চাই।”

রোববার (১১ জানুয়ারি) রাতে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের গছানী গ্রামে হযরত গেদু শাহ চিশস্তি (রহ.)-এর ৪৯তম বাৎসরিক ওরস মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ওরসের মঞ্চে নুর বলেন, ওয়াজ মাহফিল যেমন আমাদের সংস্কৃতির অংশ, তেমনি ওরস মাহফিলও এই দেশের বৈচিত্র্যের প্রতিচ্ছবি। এখানে বাউলসহ নানা সম্প্রদায় ও সংগঠনের মানুষ একত্রিত হয়েছেন। প্রত্যেক মানুষেরই কথা বলার, অনুষ্ঠান করার স্বাধীনতা রয়েছে। এই বৈচিত্র্যই বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কাউকে বাধা দেওয়া, গায়ের জোরে হামলা করা কিংবা কোনো অনুষ্ঠান ভাঙচুর করার রাজনীতি তারা করেন না। এসব করলে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য বাড়ে। “আমি এখানে এসেছি আপনাদের প্রতি সংহতি ও সমবেদনা জানাতে। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আপনাদের পাশেই থাকব,”—বলেন নুর।

দশমিনা ও গলাচিপা অঞ্চলের সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও তারা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস ও ব্যবসা-বাণিজ্য করে আসছেন। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কোথাও কোথাও তাদের ব্যবসা ও ঘরবাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নুর বলেন, ৫ আগস্টের পর গলাচিপায় তিনি বেশিরভাগ হিন্দু ব্যবসায়ীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাদের আশ্বস্ত করেছেন—ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ আক্রান্ত হলে যেন সরাসরি তাকে জানান। “ব্যবসা করতে গেলে কাউকে এক পয়সাও চাঁদা দিতে হবে না। আমাদের দলের কেউ যদি চাঁদাবাজি বা হয়রানির সঙ্গে জড়িত থাকে, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না,”—হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে নুর জানান, দশমিনা ও গলাচিপাকে তিনি রাজনৈতিক সম্প্রীতির একটি রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে চান। সেখানে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিএনপি, গণঅধিকার পরিষদ, আওয়ামী লীগ, জামায়াতসহ সব দলের নেতাকর্মীরা একসঙ্গে অংশ নেবেন, কুশল বিনিময় করবেন। রাজনৈতিক মতভেদের কারণে কেউ কারও ওপর হামলা করবে না, মামলা দেবে না, জুলুম করবে না—এমন ন্যায় ও ইনসাফের সমাজ গড়াই তাদের লক্ষ্য।

গণতান্ত্রিক অধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের অধিকার রয়েছে। গায়ের জোরে বাধা দেওয়া কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।

ওরস মাহফিলে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসল্লি উপস্থিত ছিলেন।

এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




হাদীর রক্তের বিচার এই বাংলার মাটিতেই হবে : জয়নুল আবেদীন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাহসী যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ ওসমান বিন হাদীর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও বরিশাল-৩ (মুলাদী–বাবুগঞ্জ) আসনের ধানের শীষের মনোনীত এমপি প্রার্থী সিনিয়র অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন।

সোমবার বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা এলাকায় শহীদ হাদীর শ্বশুর সুলতান আহমেদের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে তিনি পরিবারের খোঁজখবর নেন, তাঁদের কষ্টের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।

এ সময় জয়নুল আবেদীন বলেন,
“শহীদ ওসমান বিন হাদী ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন এক সাহসী কণ্ঠ। তিনি কেবল একটি পরিবারের সন্তান নন—তিনি গণতন্ত্রকামী মানুষের আশা ও সংগ্রামের প্রতীক। তাঁর হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামবো না।”

তিনি আরও বলেন,
“শহীদদের আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যায় না। তাঁদের রক্ত থেকেই জন্ম নেয় নতুন ইতিহাস। শহীদ হাদীর রক্ত আমাদের ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে আরও বেগবান করবে।”

পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন,
“আপনাদের এই শোক আমাদের সবার শোক। এই কঠিন সময়ে আমরা আপনাদের পাশে আছি এবং থাকবো। ইনশাআল্লাহ, শহীদ হাদীর রক্তের বিচার এই বাংলার মাটিতেই হবে।”

এ সময় তিনি শহীদ ওসমান বিন হাদীর রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করেন এবং তাঁর পরিবার-পরিজনের জন্য ধৈর্য, শক্তি ও সাহস কামনা করেন।

এ উপলক্ষে স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ, সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা শহীদ হাদীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান।

এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




তথ্য অধিকার নিশ্চিত হলে শক্তিশালী হবে সুশাসন

বরিশাল অফিস :: তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন এবং নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে করণীয় বিষয়ে বরিশালে একটি টাউনহল সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অধিকারকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, যুব সংগঠনের সদস্য, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ সভায় তথ্য অধিকার নিশ্চিতের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) বরিশালের প্যাভিলিয়ন কনভেনশন হলে ‘তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণে করণীয়’ শীর্ষক এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এবং যুক্তরাজ্য সরকারের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও)-এর অর্থায়নে সভার আয়োজন করে স্বেচ্ছাসেবী ও যুব নেতৃত্বাধীন সংগঠন লাল সবুজ সোসাইটি।

সভায় তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থা, সরকারি তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে নাগরিকদের অধিকার, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ভূমিকা ও দায়িত্ব এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, তথ্য অধিকার নিশ্চিত হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা শক্তিশালী হয় এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বাড়ে।

অনুষ্ঠানে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধি, তথ্য অধিকারকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষক, যুব সংগঠনের সদস্য, শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। আলোচকরা তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তারা বলেন, তথ্য চাওয়া ও পাওয়ার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারের অংশ। কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা, অসচেতনতা, মাধ্যম সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্টদের দুর্বল ভূমিকার কারণে অনেক নাগরিক এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে এসেও কেন মানুষ তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে—তা নিয়ে এখনই ভাবা এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মহসিনা হোসেন বলেন, “সময় এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা এখনো প্রযুক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। তথ্য মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—বিশেষ করে ফেসবুক পেজ—কার্যকরভাবে ব্যবহার করা জরুরি।”

সহকারী তথ্য কর্মকর্তা মৃদুল চৌধুরী বলেন, “তথ্য অধিকার আইন একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও প্রভাবশালী আইন। সরকার এই আইন প্রণয়ন করলেও জনগণ সরাসরি এটি ব্যবহার করতে পারে। কেউ তথ্য চাইলে প্রশাসন তা দিতে বাধ্য।”

সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি সাজ্জাদ পারভেজ তথ্য অধিকার বাস্তবায়নে দপ্তরগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর জোর দেন।

এর আগে লাল সবুজ সোসাইটির প্রজেক্ট অফিসার মোমেনা সিফা রুমকি সভার লক্ষ্য ও কার্যক্রম তুলে ধরেন এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের জনসচেতনতামূলক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার কথা জানান।

বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা গেলে নাগরিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার সহজে আদায় করতে পারবে এবং দেশজুড়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হবে।

এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




পর্যটনের নতুন সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে বরিশাল

অপূর্ব অপু,সময় টেলিভিশন, বরিশাল ব্যুরো ::  ধান-নদী-খাল, এই তিনে বরিশাল। ব্রিটিশ যুগে বরিশালকে বলা হতো প্রাচ্যের ভেনিস। প্রকৃতিই যেন এক অনন্য রূপে গড়েছে কীর্তনখোলার পাড়ের বরিশালকে। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত একসঙ্গে দেখার দেশের একমাত্র সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা। রয়েছে বরগুনার সবুজ বন, ভোলার চর কুকরিমুকরিসহ নানা সৌন্দর্য। প্রকৃতির এতসব লীলাভূমিকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন শিল্পের অপার দ্বার উন্মোচন হয়েছে বিভাগটিতে। তবে কাঙ্ক্ষিত উদ্যোগের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে সেই সম্ভাবনা।

আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়, হয়ত মানুষ নয় হয়তোবা শঙ্খচিল শালিকের বেশে….। শুধু ধানসিঁড়িই নয়, বরিশালকে রূপবতী করেছে কীর্তনখোলা, পায়রা, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, বিশখালি, আগুনমুখার মতো নান্দনিক নামের বেশ কয়েকটি নদী। ঔপনিবেশিক যুগে বরিশাল হয়ে উঠেছিল বাংলার আধুনিকতার প্রাণকেন্দ্র।

বরিশাল শহর থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরে মাধবপাশা দুর্গা সাগরদিঘি। ৫৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তীর্ণ দিঘিটিকে একনজর দেখতে ভিড় জমান দর্শনার্থীরা। সেখানে থেকে একটু এগুলেই চোখজুড়ানো বিভাগের সবচেয়ে নান্দনিক মসজিদ, বায়তুল আমান জামে মসজিদ। আছে আড়াইশ বছরের পুরানো গ্রিক স্থাপত্য শৈলীর অনুকরণে স্থাপনা, শহরের বগুড়া রোডে- অক্সফোর্ড মিশন চার্চ। দেখতে একতলা হলেও উচ্চতায় প্রায় ৫ তলা ভবনের সমান। শহর থেকে দক্ষিণে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরত্বে তালতলি এলাকায় কীর্তনখোলা নদীতে যে স্থায়ী বাঁধ দেয়া হয়েছে, তা এখন আরেক দর্শনীয় স্থান।

রাফি নামে এক পর্যটক জানান, বরিশালের অধিকাংশ পর্যটন এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার অভাব রয়েছে। যেমন রাস্তাঘাট অনুন্নত তেমনি অভাব রয়েছে সড়কবাতির। সরকার এ বিষয়ে নজরদারি বাড়াবে বলে আশা পর্যটকদের।

কুয়াকাটা দেশের একমাত্র সমুদ্র সৈকত যেখানে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখা যায়। এ সৈকতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভ্রমণের আরেক নতুন স্পট ‘চর বিজয়’। লাল কাঁকড়া ও পরিযায়ী পাখিদের মিলন মেলায় জায়গাটি মুখরিত থাকে প্রতিটি মুহূর্ত। সৈকত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা চরটিতে বাড়ছে পর্যটক।

আরিফ নামের এক পর্যটক জানান, সম্ভাবনাময় কুয়াকাটার দিকে আরও নজর দেয়া উচিত সরকারের। সরকারি উদ্যোগ বাড়লে আরও পর্যটক বান্ধব হয়ে উঠবে কুয়াকাটা।

দ্বীপ জেলা ভোলা প্রকৃতিপ্রেমীদের মন ভোলাবে তার অরুপ সৌন্দর্যে। জেলার চর কুকরীমুকরীতে প্রতিদিন ভিড় করেন হাজারো প্রকৃতিপ্রেমী। আকাশের বুকে অতিথি পাখির ছুটে চলার নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে নিজেকেও দুরন্ত করে মন। একইরকম রূপ মনপুরা ও ঢালচরেও।

তবে প্রতিবছরই পর্যটক সংখ্যা বাড়লেও, বাড়েনি কাঙ্ক্ষিত সুযোগ সুবিধা। বেসরকারি উদ্যোগে কিছু রেস্টহাউজ থাকলেও সরকারি কার্যক্রমে ভাটা। আবিদ নামে এক পর্যটক জানান, সম্ভাবনাময় এই জায়গা শুধু সরকারের উদ্যোগের অভাবে ভোগান্তিতে রয়েছে পর্যটকরা। আশা করছি সরকার দৃষ্টি দেবে।

সমুদ্রের ঢেউয়ের মিতালী নিয়ে বরগুনার হরিণঘাটা ইকোপার্ক এবং ট্যাংরাগিরি ইকো পার্কের মায়ায় পড়তে হবে যে কাউকে। জেলার তালতলী ও পাথরঘাটা উপজেলায় সম্ভাবনাময় পর্যটনের দ্বার উন্মোচন করেছে সবুজ বন। তালতলী উপজেলায় রয়েছে ২০০ বছরের পুরোনো আদিবাসী রাখাইন সম্প্রদায়ের ইতিহাস ঐতিহ্য এবং দৃষ্টিনন্দন ধর্মীয় উপাসনালয়। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ট্যাংরাগিরি বনাঞ্চল এবং এ বনে অবস্থিত বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র। এছাড়াও রয়েছে শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত। পাথরঘাটা উপজেলায় হরিণঘাটা ইকোপার্ক লালদিয়া চর বিহঙ্গ দ্বীপ রয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমৃদ্ধ এই স্থানগুলো পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় স্থান।

তবে নানা সংকটে বিকশিত হচ্ছে না জেলার পর্যটন শিল্প। জেলা পর্যটন উন্নয়ন উদ্যোক্তা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আরিফ খান বলেন, তালতলী টেংরাগিরি ইকোপার্ক, দুইশ’ বছরের পুরোনো রাখাইন আদিবাসীদের ইতিহাস ঐতিহ্য এবং দর্শনীয় উপাসনালয়, শুভসন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত, পাথরঘাটার হরিণঘাটা ইকোপার্ক, লালদিয়া চর, বিহঙ্গ দ্বীপ, বরগুনার সুরঞ্জনা ইকো ট্যুরিজম অ্যান্ড রিসোর্ট রয়েছে। এসব জায়গাগুলো ভ্রমণের জন্য উৎকৃষ্ট মানের। কিন্তু সরকারের এদিকে নজর নেই। যে কারণে এসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ স্থানগুলোর ভগ্নদশা।

আরও পড়ুন: দীর্ঘ সময় পর স্বস্তি, নীল জলরাশিতে মাতোয়ারা পর্যটকরা

এগুলোকে সংস্কার করলে বরগুনা জেলার পর্যটন শিল্প এগিয়ে যাবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে অনেকটা এগিয়ে থেকেও বিকশিত হচ্ছে না বরিশাল বিভাগের পর্যটনশিল্প। এ ক্ষেত্রে সরকারের উদাসীনতাকে দুষছেন সংশ্লিষ্টরা। জেলা পর্যটন উন্নয়ন উদ্যোক্তা কমিটির সভাপতি সোহেল হাফিজ বলেন, স্থানীয় বাসিন্দারা পর্যটনের বিষয়ে সচেতন নয়। তাছাড়া সরকারেরও এ বিষয়ে উদাসীনতা রয়েছে। এখানে উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে না। আবার উদ্যোক্তা তৈরির জন্য কোনো উদ্যোগও নেই। অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যটকরা এখানে আসলে পদে পদে ভোগান্তির শিকার হন। থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা নেই। যাতায়াত ব্যবস্থার করুন অবস্থা। এজন্য সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেরও প্রয়োজন। ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য মৌলিক কিছু চাহিদা পূরণ করলেই জেলাটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।

ভোলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আছাদুজ্জামান বলেন, পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে গুরুত্বপূর্ণ ও পর্যটকবান্ধব স্থানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন। সরকারি উদ্যোগের কারণে প্রতিনিয়ত আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে পর্যটন এলাকাগুলো। দ্রুত এ বিষয়ে আরও উদ্যোগ নেয়া হবে।

উল্লেখ্য, আকাশ ও সড়ক পথের পাশাপাশি রাজধানী থেকে বরিশালের ৬ জেলায় আসতে নদী পথের বিলাসবহুল লঞ্চ এখনও পছন্দের তালিকায় এ অঞ্চলে ঘুরতে আসা পর্যটকদের।

এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫