২০২৪ সাল বাংলাদেশের জন্য একটি ঘটনাবহুল বছর। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন—সবই ঘটেছে এই বছরে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের এ সময়ে বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যের প্রচারও ছিল নজিরবিহীন।
তথ্য যাচাইকারী সংস্থা রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে, ২০২৪ সালে ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তত ১৪৮টি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি আড়াই দিনে একটি করে ভুল তথ্য প্রচারিত হয়েছে। এর মধ্যে ৭২টি ভারতীয় গণমাধ্যম এবং অসংখ্য সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট বাংলাদেশকে নিয়ে ভুল তথ্য প্রকাশ করেছে।
—
আগস্ট-ডিসেম্বর: অপতথ্যের উচ্চ প্রবাহ
২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসে ১২টি অপতথ্য প্রচার হলেও, আগস্ট মাসে ৫৩টি অপতথ্য ছড়ানো হয়। এরপর ডিসেম্বরে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস গ্রেফতারের ঘটনায় ফের ৫৩টি অপতথ্য ছড়ায়।
রিউমর স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে প্রকাশিত ১৪৮টি অপতথ্যের মধ্যে ১০২টি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা, ৪২টি ছিল বিভ্রান্তিকর, এবং ৪টি ছিল বিকৃত তথ্য।
—
সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের প্রভাব
ভারতীয় অপতথ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল সাম্প্রদায়িক অপতথ্য, যার সংখ্যা ১১৫টি। এসব অপতথ্যের বেশিরভাগই প্রচারিত হয় মাইক্রোব্লগিং সাইট এক্সে (সাবেক টুইটার)। রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে, এক্সে ছড়ানো এসব অপতথ্য অন্তত ২৫ কোটি বার দেখা হয়েছে।
অগাস্ট মাসে সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের মাত্রা ছিল চরমে। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও লুটপাটের ঘটনাকে ঘিরে ব্যাপকভাবে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ছড়ানো হয়।
—
সোশ্যাল মিডিয়ায় অপতথ্যের প্রসার
২০২৪ সালে ভারতীয়দের ছড়ানো অপতথ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচার হয়েছে এক্সে (১০৭টি)। এছাড়া, ফেসবুকে ছড়ানো হয়েছে অন্তত ৫০টি অপতথ্য, যা ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমেও ছড়িয়ে যায়।
রিউমর স্ক্যানারের তথ্যমতে, ৫ থেকে ১৩ আগস্টের মধ্যে এক্সে এমন ৫০টি অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা হয়, যেগুলো থেকে বাংলাদেশবিরোধী সাম্প্রদায়িক পোস্ট করা হয়েছে।
—
অপতথ্যের ধরন
ভারতীয় অপতথ্যের মধ্যে কয়েকটি বিশেষ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে:
1. মুসলিমকে হিন্দু বানিয়ে অপপ্রচার: অন্তত ৩৬টি ঘটনায় মুসলিমদের হিন্দু দাবি করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়।
2. ভিন্ন দেশের ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেছে বলে প্রচার: ১৩টি ঘটনায় ভারতের ভেতরকার ঘটনাকে বাংলাদেশের বলে উপস্থাপন করা হয়।
3. রাজনৈতিক সহিংসতাকে সাম্প্রদায়িক হামলা হিসেবে দেখানো: এসব ঘটনা ব্যবহার করে ভারতের গণমাধ্যম বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে।
—
গণমাধ্যমের ভূমিকা
ভারতের ৭২টি গণমাধ্যম ২০২৪ সালে বাংলাদেশ নিয়ে ১৩৭টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার অধিকাংশই অপতথ্য ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য প্রচার করেছে:
রিপাবলিক বাংলা (১০টি প্রতিবেদন)
হিন্দুস্তান টাইমস
জি ২৪ ঘণ্টা
আজত
—
ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অপতথ্য
২০২৪ সালে অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি ব্যক্তি:
চিন্ময় কৃষ্ণ দাস: ৪টি অপতথ্য
ড. মুহাম্মদ ইউনূস: ২টি অপতথ্য
শেখ হাসিনা: ২টি অপতথ্য
এছাড়া, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং বিমান বাহিনীকে নিয়েও বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে।
—
২০২৪ সালে বাংলাদেশ নিয়ে ভারতীয় অপতথ্যের প্রবাহ রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বিভ্রান্তি তৈরির পরিকল্পনার অংশ বলে মনে করা হয়। রিউমর স্ক্যানারের গবেষণা থেকে স্পষ্ট যে, এসব অপতথ্য শুধু সামাজিক অস্থিরতা নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করেছে।
“মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম”