বরিশালের একদিন, মুক্তিযুদ্ধের বহুদিন

মঙ্গলবারের সকালটা শুরু হয়েছিল নীরব শ্রদ্ধা আর গভীর আবেগে। ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ৯টা পেরিয়েছে। বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সংলগ্ন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিফলকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির সদস্যরা। লাল-সবুজের আবরণে মাথা নত করে তাঁরা যেন ফিরে তাকাচ্ছিলেন ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত অথচ গৌরবময় দিনগুলোর দিকে।
এরপর ইতিহাসের পথে হাঁটা শুরু হয় নতুনভাবে। সদর রোডে বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির নিজস্ব কার্যালয়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের তথ্য, চিত্র ও দলিলপত্রের ২১তম প্রদর্শনী। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে দিনব্যাপী এ আয়োজন যেন পরিণত হয় একটি জীবন্ত আর্কাইভে—যেখানে অতীত কথা বলে, স্মৃতি জেগে ওঠে।
প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান সরোয়ার। তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এ দেশের মানুষের স্মৃতিতে, চেতনায় তা বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নতুন প্রজন্মকে সেই ইতিহাসের কাছে পৌঁছে দিতেই এমন আয়োজন জরুরি।”
প্রদর্শনী কক্ষে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সারি সারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থ—তিন শতাধিক বই আর তিন শতাধিক দুর্লভ আলোকচিত্র। কোথাও যুদ্ধের অভিযানের দৃশ্য, কোথাও প্রশিক্ষণের মুহূর্ত, কোথাও শহীদদের মুখ। ইতিহাসের নীরব ভাষা যেন ছবিতে ছবিতে কথা বলে।
এক কোণে রাখা গানবোটের কামানের গোলা আর শত্রুপক্ষের নৌযান ধ্বংসে ব্যবহৃত মাইনের খণ্ডাংশ দর্শনার্থীদের কৌতূহল বাড়িয়ে তোলে। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা থমকে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে—এগুলো কি সত্যিই যুদ্ধে ব্যবহার হয়েছিল? উত্তরে ভেসে আসে ইতিহাসের নিরব সাক্ষ্য।
সম্মেলন কক্ষের পথে এগোলে দেখা মেলে রেডিও, সাইক্লোস্টাইল মেশিন, বরিশাল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে স্থাপিত দক্ষিণাঞ্চলীয় সচিবালয়ের মুক্তিযুদ্ধকালীন নথিপত্র। আলাদা করে দৃষ্টি কাড়ে হাতে লেখা বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান—কালির রেখায় রেখায় স্বাধীনতার শপথ।
প্রদর্শনীতে আরও রয়েছে চারটি বন্দুক, নৌ-কমান্ডোদের ব্যবহৃত পোশাক, মুক্তিযুদ্ধের পর বরিশালে নির্মিত প্রথম ভাস্কর্য ‘বিজয় বিহঙ্গ’-এর নকশা। পাশাপাশি রাখা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন বরিশাল থেকে প্রকাশিত পত্রিকা বিপ্লবী বাংলাদেশ এবং শান্তি কমিটির একটি চিঠি—ইতিহাসের দুই বিপরীত মুখ যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
মুক্তিযুদ্ধের স্থিরচিত্রের সামনে ভিড় করে দাঁড়ায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। কেউ মোবাইলে ছবি তোলে, কেউ নীরবে দেখে, কেউ প্রশ্ন করে শেখে। ইতিহাস যেন পাঠ্যবইয়ের পাতা ছেড়ে নেমে আসে চোখের সামনে।
এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আনিচুর রহমান খান স্বপন, সাধারণ সম্পাদক খালিদ সাইফুল্লাহ, বিজয় দিবস উদযাপন পর্ষদের আহ্বায়ক সুশান্ত ঘোষ, সদস্যসচিব রবিউল ইসলামসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
দিন শেষে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এটি শুধু একটি প্রদর্শনী নয়, এটি প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের সেতুবন্ধন। বরিশালের এই একদিনে মুক্তিযুদ্ধ যেন আবার হেঁটে গেছে সদর রোডের বুক চিরে, ইতিহাস হয়ে উঠেছে জীবন্ত।
এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫








