বরিশালের মিষ্টি মরিচ বা ক্যাপসিকাম, যা বাংলাদেশের কৃষি খাতে একটি সম্ভাবনাময় এবং রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য হিসেবে পরিচিত, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। তবে, কৃষকরা এই পণ্যটির ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, যা তাদের জন্য হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক বছরে এই পণ্যটির আবাদ বৃদ্ধি পেলেও, দাম কম হওয়া এবং অন্যান্য সমস্যার কারণে কৃষকরা তাদের উৎপাদন ব্যয় পর্যন্ত পূর্ণ করতে পারছেন না।
বরিশাল অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ৩শ একর জমিতে ‘ক্যালিফোর্নিয়া ওয়ান্ডার’ জাতের ক্যাপসিকামের আবাদ করা হয়েছে। তবে এই মরিচগুলি মাঠ পর্যায়ে ১৫-২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা অনেক কম। অথচ এই একই পণ্য বরিশালের খোলা বাজারে ৪০-৫০ টাকা এবং সুপার শপে ১২০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দামে বিক্রি হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, ভোক্তারা জানিয়েছেন যে, দুই মাস পর বাজারে এই মিষ্টি মরিচ ৪০০ টাকা কেজি দামে বিক্রি হবে। কিন্তু কৃষকরা উৎপাদন ব্যয়ও তুলতে পারছেন না, ফলে তারা হতাশ এবং আবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতি আরও বিপদজনক হয়ে উঠেছে, কারণ ক্যাপসিকাম একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর কৃষিপণ্য। এর বীজ উত্তোলন থেকে শুরু করে আবাদ এবং উৎপাদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এর জন্য নিবিড় নজরদারি এবং বিশেষ পরিচর্যা প্রয়োজন। খরা এবং জলাবদ্ধতা এই ফসলের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তার গুরুত্ব এখানেই, যাতে তারা সঠিকভাবে এই ফসলের আবাদ ও পরিচর্যা করতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ক্যাপসিকাম ভিটামিন এ এবং ভিটামিন সি সমৃদ্ধ একটি পণ্য, যা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এর মধ্যে ফাইবার, আয়রন এবং অন্যান্য খনিজ উপাদানও রয়েছে, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। যদিও এটি আমাদের দেশে এখনও খুব জনপ্রিয় হয়নি, তবে সারাবিশ্বে এটি টমেটোর পরেই দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সবজি হিসেবে অবস্থান তৈরি করেছে।
গত দশক ধরে আমাদের দেশে ‘ক্যালিফোর্নিয়া’, ‘টেন্ডারবেল’ এবং ‘ইয়েলো ওয়ান্ডার’ জাতের ক্যাপসিকামের আবাদ শুরু হয়েছে। বরিশালের চরে, বিশেষ করে নদী বেষ্টিত এলাকাগুলোতে, এই জাতের ক্যাপসিকামের আবাদ সম্প্রতি ৫ বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, সমস্যা হলো, কৃষকরা এখনো যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং উন্নত বীজ সরবরাহ পাচ্ছেন না, যার কারণে আবাদ কাঙ্খিত মাত্রায় সম্প্রসারণ হয়নি।
এই মরিচের গাছ খরা এবং জলাবদ্ধতা কোনটিই সহ্য করতে পারে না। উৎপাদন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিশেষভাবে এর পরিচর্যার জন্য কৃষকদেরকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এবং কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এখনও যথাযথ মনোযোগী হয়নি বলে কৃষকরা হতাশা প্রকাশ করেছেন।
তবে, ডিএই’র বরিশাল অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী ও অতিরিক্ত পরিচালক জানিয়েছেন, খুব শীঘ্রই মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণ এবং অবহিতকরণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান যে, বারী ইতোমধ্যে ক্যাপসিকামের উন্নতজাত উদ্ভাবন করেছে, এবং ডিএই ও বারী মিলে কৃষকদের জন্য উন্নত মানের বীজ সরবরাহ করবে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
এমনকি, একাধিক কৃষিবিদের মতে, বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে ক্যাপসিকামের জনপ্রিয়তা এখনও কম হলেও, আন্তর্জাতিক বাজারে এর বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। যদি আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়, তবে ক্যাপসিকাম বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য হিসেবে পরিণত হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে, বিশ্বব্যাপী শতাধিক দেশে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানি হচ্ছে, এবং ক্যাপসিকামের অবস্থান তৈরি করা কোন কষ্টসাধ্য কাজ নয়।
কৃষিবিদরা বলছেন, আমাদের দেশের মতো অন্য দেশের কৃষকরা সারা বছরই ক্যাপসিকাম আবাদ করতে সক্ষম। এটি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানী পণ্য হতে পারে, যদি কৃষকদের সঠিক প্রশিক্ষণ এবং উন্নত বীজ সরবরাহ করা হয়।
এই লক্ষ্য পূরণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে অবিলম্বে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন মাঠ পর্যায়ের কৃষিবিদগণ।
মো: তুহিন হোসেন,
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম