কাফনের কাপড় হাতে পার্কের বেঞ্চে শুয়ে জীবন ছুঁয়ে দেখা বরিশালে তরুণীর বিষপানে হৃদয়বিদারক গল্প
মানুষ বাঁচতে চায়। প্রতিদিনের কোলাহলে সে খোঁজে একটু আশ্বাস, একটু ভালোবাসা, আগামী দিনের ছোট্ট একটি স্বপ্ন। কিন্তু যখন সেই স্বপ্নগুলো একে একে ভেঙে যায় অপমান, অবহেলা আর মানসিক নির্যাতনের ভারে—তখন কিছু মানুষ বেছে নেয় এমন পথ, যা ভাবতেই শিউরে ওঠে মন।
বরিশালে তেমনই এক তরুণী সোমবার (১২ জানুয়ারি) দুপুরে নগরীর মুক্তিযোদ্ধা পার্কে কাফনের কাপড় ও দাফনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাশে রেখে বিষপান করেন। পার্কের একটি বেঞ্চে শুয়ে পড়া তার নিস্তেজ দেহ দেখে মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ। পরে তাকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, তার অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বরিশাল সদর উপজেলার বাসিন্দা ওই তরুণীর সঙ্গে প্রকৌশলী সিদ্দিকুর রহমান সাগরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরিবারের অসম্মতিতে ২০২৫ সালের মে মাসে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। শুরুটা ছিল স্বপ্নে মোড়া। কিন্তু সেই স্বপ্ন বেশিদিন টিকেনি। বিয়ের মাত্র চার মাস পর গোপনে তাকে তালাক দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
তরুণীর অভিযোগ, এর আগেই তিনি অন্তঃসত্ত্বা হলে শ্বশুরবাড়ির লোকজন জোরপূর্বক তার গর্ভপাত করান। মাতৃত্বের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ক্ষত তখনই তার হৃদয়ে গেঁথে যায়। সোমবার ছিল সেই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি মামলার শুনানির দিন। আদালতে হাজির হয়ে ন্যায়ের আশায় দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শুনানি শেষে আদালত চত্বর থেকে বের হওয়ার সময় শ্বশুর ও দেবরের কটাক্ষ ও অশালীন মন্তব্যের শিকার হন।
সেই মুহূর্তের অপমান, মানুষের ভিড়ে একাকিত্ব আর জমে থাকা মানসিক যন্ত্রণা—সব মিলিয়ে যেন ভেঙে পড়ে তার ভেতরের শক্ত শেষ দেয়ালটিও। আদালত থেকে বের হয়ে বাজারে যান তিনি। কেনেন কাফনের কাপড়, দাফনের সামগ্রী। তারপর হেঁটে যান মুক্তিযোদ্ধা পার্কে। বেঞ্চে শুয়ে পড়ে এক চুমুক বিষ—জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বকে প্রশ্ন করেন তিনি।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বরিশাল জেলা পুলিশের সদস্য মো. জীবন জানান, পার্কের একটি বেঞ্চে শুয়ে তরুণী কাতরাচ্ছিলেন। শিশু-কিশোরদের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পাশে পড়ে ছিল একটি বিষের বোতল ও দাফনের সামগ্রী। দ্রুত ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিলে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মেহেদী হাসান বলেন, তিনি কীটনাশকজাতীয় বিষ পান করেছেন। হাসপাতালে আনার পর তার পাকস্থলী পরিষ্কার করা হয়েছে। বর্তমানে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা এখনো সন্তোষজনক নয়।
এই ঘটনায় নগরজুড়ে নেমে এসেছে গভীর নীরবতা ও চাঞ্চল্য। সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন উঠছে—একজন নারী কতটা ভেঙে পড়লে কাফনের কাপড় হাতে নিয়ে পার্কের বেঞ্চে শুয়ে পড়ে মৃত্যুকে ডাকতে পারে? অনেকেই বলছেন, সামাজিক অবহেলা, পারিবারিক চাপ, আইনি জটিলতা আর মানসিক নির্যাতনের বোঝা বহন করতে গিয়েই এমন চরম সিদ্ধান্তের পথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন নারীরা।
এই তরুণীর গল্প কেবল একটি ঘটনার বিবরণ নয়—এটি আমাদের সমাজের আয়না। যেখানে ভালোবাসা ভেঙে যায়, ন্যায় পেতে গিয়ে মানুষ অপমানিত হয়, আর জীবনের শেষ আশাটুকুও যখন নিভে যায়—তখন কেউ কেউ কাফনের কাপড় হাতেই জীবনের শেষ অধ্যায় লিখতে বসে।
আমরা কি পারি না, এমন আরেকটি বেঞ্চে যেন আর কোনো তরুণী মৃত্যুর অপেক্ষায় শুয়ে না পড়ে—সেই সমাজটা গড়ে তুলতে?
মো: তুহিন হোসেন,
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম








