কাফনের কাপড় হাতে পার্কের বেঞ্চে শুয়ে জীবন ছুঁয়ে দেখা বরিশালে তরুণীর বিষপানে হৃদয়বিদারক গল্প

মানুষ বাঁচতে চায়। প্রতিদিনের কোলাহলে সে খোঁজে একটু আশ্বাস, একটু ভালোবাসা, আগামী দিনের ছোট্ট একটি স্বপ্ন। কিন্তু যখন সেই স্বপ্নগুলো একে একে ভেঙে যায় অপমান, অবহেলা আর মানসিক নির্যাতনের ভারে—তখন কিছু মানুষ বেছে নেয় এমন পথ, যা ভাবতেই শিউরে ওঠে মন।

বরিশালে তেমনই এক তরুণী সোমবার (১২ জানুয়ারি) দুপুরে নগরীর মুক্তিযোদ্ধা পার্কে কাফনের কাপড় ও দাফনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাশে রেখে বিষপান করেন। পার্কের একটি বেঞ্চে শুয়ে পড়া তার নিস্তেজ দেহ দেখে মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ। পরে তাকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, তার অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বরিশাল সদর উপজেলার বাসিন্দা ওই তরুণীর সঙ্গে প্রকৌশলী সিদ্দিকুর রহমান সাগরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরিবারের অসম্মতিতে ২০২৫ সালের মে মাসে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। শুরুটা ছিল স্বপ্নে মোড়া। কিন্তু সেই স্বপ্ন বেশিদিন টিকেনি। বিয়ের মাত্র চার মাস পর গোপনে তাকে তালাক দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

তরুণীর অভিযোগ, এর আগেই তিনি অন্তঃসত্ত্বা হলে শ্বশুরবাড়ির লোকজন জোরপূর্বক তার গর্ভপাত করান। মাতৃত্বের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ক্ষত তখনই তার হৃদয়ে গেঁথে যায়। সোমবার ছিল সেই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি মামলার শুনানির দিন। আদালতে হাজির হয়ে ন্যায়ের আশায় দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শুনানি শেষে আদালত চত্বর থেকে বের হওয়ার সময় শ্বশুর ও দেবরের কটাক্ষ ও অশালীন মন্তব্যের শিকার হন।

সেই মুহূর্তের অপমান, মানুষের ভিড়ে একাকিত্ব আর জমে থাকা মানসিক যন্ত্রণা—সব মিলিয়ে যেন ভেঙে পড়ে তার ভেতরের শক্ত শেষ দেয়ালটিও। আদালত থেকে বের হয়ে বাজারে যান তিনি। কেনেন কাফনের কাপড়, দাফনের সামগ্রী। তারপর হেঁটে যান মুক্তিযোদ্ধা পার্কে। বেঞ্চে শুয়ে পড়ে এক চুমুক বিষ—জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বকে প্রশ্ন করেন তিনি।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বরিশাল জেলা পুলিশের সদস্য মো. জীবন জানান, পার্কের একটি বেঞ্চে শুয়ে তরুণী কাতরাচ্ছিলেন। শিশু-কিশোরদের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পাশে পড়ে ছিল একটি বিষের বোতল ও দাফনের সামগ্রী। দ্রুত ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিলে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মেহেদী হাসান বলেন, তিনি কীটনাশকজাতীয় বিষ পান করেছেন। হাসপাতালে আনার পর তার পাকস্থলী পরিষ্কার করা হয়েছে। বর্তমানে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা এখনো সন্তোষজনক নয়।

এই ঘটনায় নগরজুড়ে নেমে এসেছে গভীর নীরবতা ও চাঞ্চল্য। সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন উঠছে—একজন নারী কতটা ভেঙে পড়লে কাফনের কাপড় হাতে নিয়ে পার্কের বেঞ্চে শুয়ে পড়ে মৃত্যুকে ডাকতে পারে? অনেকেই বলছেন, সামাজিক অবহেলা, পারিবারিক চাপ, আইনি জটিলতা আর মানসিক নির্যাতনের বোঝা বহন করতে গিয়েই এমন চরম সিদ্ধান্তের পথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন নারীরা।

এই তরুণীর গল্প কেবল একটি ঘটনার বিবরণ নয়—এটি আমাদের সমাজের আয়না। যেখানে ভালোবাসা ভেঙে যায়, ন্যায় পেতে গিয়ে মানুষ অপমানিত হয়, আর জীবনের শেষ আশাটুকুও যখন নিভে যায়—তখন কেউ কেউ কাফনের কাপড় হাতেই জীবনের শেষ অধ্যায় লিখতে বসে।

আমরা কি পারি না, এমন আরেকটি বেঞ্চে যেন আর কোনো তরুণী মৃত্যুর অপেক্ষায় শুয়ে না পড়ে—সেই সমাজটা গড়ে তুলতে?


মো: তুহিন হোসেন,
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম




নৌকার গায়ে লেখা থাকে জীবনের গল্প, ভেসে চলে শত পরিবারের স্বপ্ন

ভোরের আলো ফুটতেই নদীপাড়ের বাতাসে মিশে যায় হাতুড়ির ঠকঠক শব্দ। করাতের ঘ্রাণে ভরে ওঠে গজারিয়া বাজার। কাঠের টুকরোর ফাঁকে ফাঁকে জমে ওঠে ঘামের গল্প, স্বপ্নের রং। এখানে প্রতিদিন জন্ম নেয় নতুন নৌকা—আর সেই নৌকার গায়ে ভেসে ওঠে শত শত পরিবারের জীবনের গল্প।

ভোলার লালমোহন ও চরফ্যাশন এলাকার গজারিয়া বাজারে নৌকা শুধু যাতায়াতের বাহন নয়, এটি জীবনের অবলম্বন। যারা এই নৌকা বানান, স্থানীয়ভাবে তারা পরিচিত ‘নৌকা ব্যাপারী’ নামে। বাপ-দাদার হাত ধরে শেখা এই পেশাই যুগের পর যুগ ধরে টিকিয়ে রেখেছে অসংখ্য পরিবারকে।

চার দশকের কারিগর আলতাফ হোসেন আজও চোখে ভাসান শৈশবের দিনগুলো। বাবার পাশে দাঁড়িয়ে কাঠ ঘষা, নৌকার গায়ে প্রথম পেরেক ঠোকার মুহূর্ত—সেই স্মৃতি এখনো তাকে শক্তি জোগায়। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তিনি এই পেশায় যুক্ত। তার কারখানায় বর্তমানে কাজ করেন চারজন মিস্ত্রি। চরফ্যাশন, দক্ষিণ আইচা, শশীভূষণ, মনপুরা থেকে জেলেরা এসে তার কাছে নৌকা বানান।

আলতাফ বলেন,
“জেলেদের চাহিদামতো নৌকা বানাই। বর্ষায় কাজ বেশি, শীতে কিছুটা কমে যায়। তবুও এই কাজেই আমাদের সংসার চলে।”

গজারিয়া বাজারে আলতাফ একা নন। মো. নাগর, কালাম, আলমগীর, বেল্লাল, হাসান, মিলন, আল-আমিন, শানু, ইকবাল, জুয়েল, শেখ ফরিদ, আমির—এমন অন্তত ১৫ জন নৌকা ব্যাপারী এখানে প্রতিদিন কাঠ আর ঘামের বন্ধনে গড়ে তুলছেন ভবিষ্যৎ। তাদের কারখানায় কাজ করেন শতাধিক শ্রমিক।

ব্যাপারী ফয়সাল বলেন,
“সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ চলে। নৌকা বানিয়ে জেলেরা নিয়ে যায়। সরকারিভাবে কোনো সহায়তা পাইনি। যদি আর্থিক সহযোগিতা পাওয়া যেত, এই শিল্প আরও এগিয়ে যেত।”

চরফ্যাশন-ভোলা মহাসড়কের পাশে গজারিয়া বাজারে প্রায় অর্ধশত বছর ধরে টিকে আছে এই নৌ-শিল্প। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ ধরতে নৌকা অপরিহার্য হওয়ায় বছরের অন্তত ছয় মাস এখানে ব্যস্ততা থাকে তুঙ্গে। মূলত দুই ধরনের নৌকা তৈরি হয়—ডিঙি ও কোষা। কোষা সাধারণত ৯ থেকে ১০ ফুট, আর ডিঙি ১৫ থেকে ১৬ ফুট লম্বা হয়।

রেইনট্রি, কড়ই, চাম্বুল, সুন্দরী কিংবা মেহগনি কাঠ ব্যবহার করা হয় নৌকা বানাতে। সঙ্গে লাগে পেরেক, তারকাটা ও জলুয়া। একটি ১২ হাতের নৌকা বানাতে তিনজন শ্রমিকের মজুরি পড়ে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। কাঠে লাগে প্রায় ৪ হাজার, আনুষঙ্গিকে আরও ৩ হাজার। সব মিলিয়ে ৯-১০ হাজার টাকায় তৈরি নৌকা বিক্রি হয় ১৪-১৫ হাজার টাকায়। লাভ খুব বেশি নয়, তবুও থামে না তাদের লড়াই। অনেকেই ঋণ নিয়ে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক রিয়াজুর কবির বলেন,
“প্রায় ৪০ বছর ধরে এই শিল্প চলছে। শতাধিক পরিবার এর সঙ্গে যুক্ত। তারা পরিবার চালাচ্ছে, দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে। কিন্তু সরঞ্জামের দাম বেড়েছে, লাভ কমেছে। ধারদেনা করে তারা শিল্প টিকিয়ে রেখেছেন। এই নৌ-শিল্প বাঁচাতে এখন সরকারি সহায়তার বিকল্প নেই।”

নদীমাতৃক বাংলাদেশে যখন অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, তখন গজারিয়ায় এখনো বেঁচে আছে নৌকার স্বপ্ন। হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় তৈরি প্রতিটি নৌকা যেন বলে—এই নদীর পাড়ে মানুষ এখনো স্বপ্ন বানায়, কাঠে খোদাই করে ভবিষ্যৎ।


এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




স্বেচ্ছাশ্রমে গড়া দুই সেতু, ছয় বছরের দুর্ভোগের অবসান মঠবাড়িয়ায়

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের পর কেটে গেছে দীর্ঘ ছয় বছর। এই সময়জুড়ে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেছেন হাজারো মানুষ। স্কুলে যেতে শিশুদের পা কাঁপত, অসুস্থ রোগীকে কোলে নিয়ে পার হতে হতো খাল, বাজারে যেতে বৃদ্ধদের চোখে থাকত ভয়। অবশেষে সেই কষ্টের দিন ফুরালো। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত হলো দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ—যা একসঙ্গে যুক্ত করেছে সাতটি গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা।

মঠবাড়িয়া উপজেলার ধনীসাফা ইউনিয়নের আলগীপাতাকাটা খাল ও মিরুখালী ইউনিয়নের বাদুরা খালের ওপর নির্মিত কাঠের এই দুটি ব্রিজ উদ্বোধন করা হয় সোমবার (১২ জানুয়ারি) দুপুরে। উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক এ আর মামুন খান।

এই সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ওহিদুজ্জামান মিল্টন, উপজেলা যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব তাহসিন জামাল রুমেল, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি ইমরান হোসেন মনি ও ইউনিয়ন যুবদলের নেতাকর্মীরা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে এই দুটি ব্রিজ ভেঙে পড়ে। এরপর দীর্ঘ সময়েও তা পুনর্নির্মাণ হয়নি। ফলে ধনীসাফা ও মিরুখালী ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত সাতটি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। স্কুল-মাদ্রাসায় যাতায়াত, বাজার করা কিংবা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়ার মতো সাধারণ কাজও হয়ে ওঠে বিপজ্জনক।

ধনীসাফা ইউনিয়নের আলগীপাতাকাটা খালের ওপর ৭৫ ফুট এবং মিরুখালী ইউনিয়নের বাদুরা খালের ওপর ২৫ ফুট দৈর্ঘ্যের ব্রিজ দুটি ভেঙে থাকায় হাজারো পথচারী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো বা ভাঙা কাঠের ওপর দিয়ে পার হতেন। অনেক সময় শিশু ও বৃদ্ধরা পড়ে গিয়ে আহতও হয়েছেন।

এই দুরবস্থার চিত্র স্থানীয় যুবদলের নজরে আসে। সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষায় না থেকে ইউনিয়নের যুবদল নেতাকর্মীরা নিজেরাই এগিয়ে আসেন। স্বেচ্ছাশ্রমে, নিজেদের উদ্যোগ ও সহযোগিতায় তারা ব্রিজ দুটি পুনর্নির্মাণ করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ আর মামুন খান বলেন,
“ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে সেতু দুটি ভেঙে পড়ার পর থেকে হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগে ছিলেন। বিষয়টি আমাদের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে নজরে আসে। সাধারণ মানুষের চলাচলের সুবিধার্থেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুবদল সবসময় মানুষের কল্যাণে কাজ করতে চায়।”

ব্রিজ দুটি চালু হওয়ার পর স্থানীয়দের মুখে ফিরে এসেছে স্বস্তির হাসি। একজন বৃদ্ধ বাসিন্দা বলেন,
“এতদিন মনে হতো আমরা যেন আলাদা হয়ে গেছি। এখন আবার সহজে বাজারে যেতে পারব, নাতি-নাতনিরা স্কুলে যেতে পারবে। এই সেতু শুধু কাঠের নয়, আমাদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত।”

স্বেচ্ছাশ্রমে গড়া এই দুটি সেতু এখন শুধু পথ নয়—এগুলো হয়ে উঠেছে মানুষের আশার প্রতীক।


এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




ধানের দামে ধস, মাঠের ঘামে ভাসছে হতাশা পটুয়াখালীর হাটে কৃষকের কান্না

ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙে কৃষকের। কাঁধে নেমে আসে বছরের পর বছরের ক্লান্তি, হাতে তুলে নেয় ঘামের ফসল—ধানের বস্তা। আশা থাকে, আজ হয়তো পরিশ্রমের ন্যায্য দাম মিলবে। কিন্তু পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের সাপ্তাহিক ধান হাটে সেই আশাই ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। এখানে ধানের বস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আজ কৃষকের চোখে শুধু হতাশা, মুখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ছায়া।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকাল থেকেই হাটে জড়ো হন শত শত কৃষক। নৌকা, ভ্যান কিংবা কাঁধে করে বস্তাবন্দি ধান নিয়ে তারা অপেক্ষায় থাকেন ক্রেতার। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে একে একে ফিরছেন বিমর্ষ মুখে। বাজারে এক মণ ধানের দাম ঘুরপাক খাচ্ছে মাত্র ১,১০০ থেকে ১,১৫০ টাকার মধ্যে—যেখানে উৎপাদন খরচই উঠে না।

গলাচিপা উপজেলার উলানিয়া এলাকার ষাট বছর বয়সী কৃষক আবু জাফর বলেন, “চাল, তেল, ডাল—সব কিছুর দাম বাড়ছে। কিন্তু ধানের দাম বাড়ছে না। একজন শ্রমিক খাটাতে দিনে ৭০০-৮০০ টাকা দিতে হয়, সঙ্গে তিন বেলা খাবার। এক মণ ধান বিক্রি করেও সেই খরচ ওঠে না। এভাবে চলতে থাকলে কিছুদিন পর আমরা আর খাইতেই পারব না।”

কালাইয়া হাটের আরেক কৃষক কাওসার আলী (৫৬) ভাঙা কণ্ঠে জানান, “এই বছর যে দামে ধান বিক্রি হচ্ছে, তাতে লাভ তো দূরের কথা, খরচই ওঠে না। ১,১৫০ টাকায় এক মণ ধান বিক্রি করে কী হবে? যদি এমন চলতে থাকে, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই জমি বিক্রি করে খেতে হবে।”

হাটে ঘুরে দেখা যায়, সারি সারি ধানের বস্তা। কেউ বসে আছেন বস্তার ওপর, কেউ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন সম্ভাব্য ক্রেতার দিকে। কিন্তু মুখে কারও হাসি নেই। কৃষকদের অভিযোগ, চলতি মৌসুমে সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর দাম বেড়েছে। অথচ ধানের বাজারদর সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে প্রতিদিনই তারা পড়ছেন আর্থিক চাপে।

চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চর ডিয়ারা গ্রামের কৃষক আরিফুর রহমান (৩৫) জানান, ১৯০ কড়া জমিতে ধান করেছি। আজ ৪০ মণ ধান বিক্রি করতে এনেছি। কিন্তু বাজারদর আর উৎপাদন খরচের হিসাব মিলালে লাভ তো নেই-ই, বরং লোকসান। প্রতিদিনের পরিশ্রমের মূল্য না পেয়ে ভীষণ হতাশ লাগছে।”

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন বলেন,“চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৩৪ হাজার ৭১০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার মেট্রিক টন। কৃষক যেন তার পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পায়, সে বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। সার, বীজ ও অন্যান্য উপকরণ সহজলভ্য রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।”

তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। হাটের প্রতিটি ধানের বস্তা যেন কৃষকের জীবনের গল্প বহন করছে—ঘাম, শ্রম আর অনিশ্চয়তার গল্প। ন্যায্য দাম না পেলে সেই গল্প যে আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠবে, তা বুঝতে কারও বাকি নেই।


এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




মঠবাড়িয়ায় অবৈধ ইটভাটায় প্রশাসনের কঠোর অভিযান, গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো কাঁচা ইট

পরিবেশ ধ্বংসের নীরব কারখানা হয়ে ওঠা অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিল প্রশাসন। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় অনুমোদনহীনভাবে পরিচালিত একটি ইটভাটায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বিপুল পরিমাণ কাঁচা ইট। একই সঙ্গে ভাটার মালিককে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে উপজেলার সাপলেজা ইউনিয়নের ভাইজোড়া গ্রামে বলেশ্বর নদীর তীরবর্তী এলাকায় অবস্থিত ‘মেসার্স মক্কা ব্রিকস’-এ এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের নেতৃত্ব দেন মঠবাড়িয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রাইসুল ইসলাম।

অভিযান চলাকালে দেখা যায়, সরকারি অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই ইটভাটাটি দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছিল। আইন অমান্য করে নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাটা স্থাপন করায় পরিবেশ ও কৃষিজমির ওপর মারাত্মক হুমকি তৈরি হচ্ছিল। এসব অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রাইসুল ইসলাম জানান,
“অবৈধভাবে ইটভাটা পরিচালনার দায়ে ভাটার মালিক মো. ইউসুফ মুন্সিকে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রস্তুত করা কাঁচা ইট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, পরিবেশ রক্ষা ও জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে। কোনোভাবেই আইন লঙ্ঘন করে ইটভাটা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই ভাটার ধোঁয়ায় আশপাশের ফসল নষ্ট হচ্ছিল, বাতাস দূষিত হচ্ছিল এবং নদীর তীর ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছিল। প্রশাসনের এই উদ্যোগে তারা স্বস্তি প্রকাশ করেন এবং নিয়মিত অভিযান চালানোর দাবি জানান।

পরিবেশ রক্ষায় অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে প্রশাসনের এমন কঠোর পদক্ষেপ এলাকাবাসীর মধ্যে সচেতনতা বাড়াবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




পানিতে পড়লেই বাঁচবে জীবন ভোলার তরুণের যুগান্তকারী ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’

এক মুহূর্তের অসাবধানতা, আর তাতেই নিভে যায় একটি ছোট্ট প্রাণ। নদী–খাল আর পুকুরে ঘেরা উপকূলীয় জনপদে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু যেন নিত্যদিনের ভয়াবহ বাস্তবতা। সেই বাস্তবতাকে বদলাতে স্বপ্ন দেখেছেন ভোলার মনপুরার তরুণ উদ্ভাবক মো. তাহসিন। আর সেই স্বপ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’—একটি লকেট আকৃতির প্রযুক্তি, যা শিশু পানিতে পড়লেই বেজে উঠবে সাইরেন, আর সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবকের মোবাইলে পৌঁছে যাবে সতর্কবার্তা।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে ভোলা পৌরসভার পুকুরে এই ডিভাইসের পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেখা যায়, সাঁতার না জানা এক শিশু পানিতে নামার সঙ্গে সঙ্গেই ডিভাইসটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। মুহূর্তেই চারপাশে বেজে ওঠে বিপদ সংকেত। শব্দ শুনে ছুটে আসেন মানুষ, উদ্ধার করা হয় শিশুটিকে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে রক্ষা পায় একটি প্রাণ।

এই ডিভাইসটি শিশুর গলায় লকেটের মতো ঝুলিয়ে রাখা যাবে। অভিভাবকের কাছে থাকবে একটি ছোট পোর্টেবল রিসিভার। শিশু পানির সংস্পর্শে এলেই রিসিভার থেকে সাইরেন বাজবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিভাবকের মোবাইলে কল যাবে। শুধু তাই নয়, এতে যুক্ত আছে জিপিএস প্রযুক্তি—যার মাধ্যমে জানা যাবে শিশুটি ঠিক কোন স্থানে পানিতে পড়েছে।

প্রদর্শনী দেখতে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ। উপস্থিত ছিলেন ভোলার সিভিল সার্জন ডা. মনিরুল ইসলাম ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান। তারা উদ্ভাবনটির প্রশংসা করেন এবং এর প্রসারে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

সিভিল সার্জন ডা. মনিরুল ইসলাম বলেন,“ভোলার মতো পানিবেষ্টিত এলাকায় শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি। এই উদ্ভাবন মানুষের জন্য আশার আলো। এর প্রসারে আমরা সব ধরনের সহায়তা করব।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন,“এই ডিভাইস যদি একজন শিশুর জীবনও রক্ষা করতে পারে, সেটাই হবে এর সবচেয়ে বড় সাফল্য। তরুণ তাহসিনের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়।”

উদ্ভাবক তাহসিন জানান, পানিতে ডুবে তার দুই খালাতো বোনের মৃত্যুই তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। সেই বেদনা থেকেই তিনি ভাবতে শুরু করেন—কীভাবে প্রযুক্তির মাধ্যমে এই মৃত্যু রোধ করা যায়। বিজ্ঞানপ্রেমী তাহসিন নিজের ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেন ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’-এ।

তিনি বলেন,
“আমি চাই আর কোনো পরিবার যেন পানিতে ডুবে শিশুকে হারিয়ে শোকে ভেঙে না পড়ে। এই ডিভাইস শিশুর সঙ্গে থাকলে দুর্ঘটনার মুহূর্তেই সবাই জানতে পারবে।”

ডিভাইসটি তৈরি করতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা, যা পরিবারের সহায়তায় জোগাড় করা হয়েছে। শুরুতে লকেটটির আকার ও ওজন বেশি ছিল। কিন্তু এখন সেটি মাত্র ২ গ্রাম ওজনের—শিশুর গলায় ঝোলানো একেবারেই সহজ।

ইউনিসেফের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৪ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে উপকূলীয় এলাকার ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুরা। সচেতনতা ও সাঁতার শেখানোর পাশাপাশি প্রযুক্তির এই ব্যবহার নতুন আশার দুয়ার খুলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাহসিনের উদ্ভাবন যেন শুধু একটি যন্ত্র নয়—এ যেন অসংখ্য শিশুর ভবিষ্যৎ বাঁচানোর এক নীরব প্রতিশ্রুতি।


এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




মঞ্জু হত্যার বিচার দাবিতে উত্তাল গৌরনদী, অবরোধে অচল ঢাকা–বরিশাল মহাসড়ক

বরিশালের গৌরনদীতে ভ্যানচালক মঞ্জু বেপারী হত্যার বিচার দাবিতে ঢাকা–বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয়রা। ঘণ্টাব্যাপী এই অবরোধে মহাসড়কের প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। দুর্ভোগে পড়েন শত শত যাত্রী ও চালক।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে গৌরনদী উপজেলার কাসেমাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এলাকাবাসী এ কর্মসূচি পালন করেন। হঠাৎ মহাসড়কের ওপর অবস্থান নিয়ে তারা যান চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে ঢাকাগামী ও বরিশালগামী যানবাহন দীর্ঘ সারিতে আটকে পড়ে।

বিক্ষুব্ধ স্থানীয়দের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো রহস্য উদঘাটন কিংবা প্রকৃত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক বাড়ছে।

অবরোধে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা জব্বার হোসেন বলেন,
“একজন নিরীহ ভ্যানচালককে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। অথচ কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও অপরাধীরা ধরা পড়ছে না। যদি খুনিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? দ্রুত মঞ্জুর হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার না করা হলে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হব।”

খবর পেয়ে গৌরনদী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলে। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিলে প্রায় এক ঘণ্টা পর অবরোধ প্রত্যাহার করেন স্থানীয়রা। এরপর ধীরে ধীরে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

গৌরনদী মডেল থানার তদন্ত কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জানান,
“এ ঘটনায় ইতোমধ্যে আমিনুল ইসলাম নামে একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। আমরা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে কাজ করছি। অবরোধকারীদের আশ্বস্ত করার পর তারা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন। বর্তমানে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।”

প্রসঙ্গত, গত শনিবার (১০ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে যাত্রী নামিয়ে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হন ভ্যানচালক মঞ্জু বেপারী। তিনি গৌরনদী উপজেলার কাসেমাবাদ গ্রামের মৃত আব্দুর রশিদের ছেলে। মঞ্জুর মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া, এলাকায় বিরাজ করছে ক্ষোভ ও আতঙ্ক।

স্থানীয়দের ভাষায়, মঞ্জু ছিলেন একজন সহজ-সরল পরিশ্রমী মানুষ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে আজ অসহায় তার স্বজনরা। দ্রুত বিচার না হলে এ ক্ষোভ আরও বিস্তৃত হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এলাকাবাসী।


এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়: বদিউল আলম মজুমদার

নির্বাচনি প্রস্তুতি দৃশ্যত এগোলেও এখনো শঙ্কা কাটেনি—এমন মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া দেশে কোনো সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) দুপুরে বরিশালে সুজন আয়োজিত বিভাগীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “নির্বাচনি ট্রেন ট্র্যাকে উঠে গেছে ঠিকই, তবে ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। রাজনীতিবিদ এবং তাঁদের মনোনীত প্রার্থীরাই চাইলে এই ট্রেনকে আবার ট্র্যাকচ্যুত করতে পারেন। তারা যদি সদাচরণ করেন, সহিংসতা থেকে বিরত থাকেন এবং অসৎ কৌশল পরিহার করেন, তাহলে নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা থাকবে না।”

তিনি আরও বলেন, “রাজনীতিতে উত্তেজনা কমাতে হবে, সংঘাত ও সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। এমপি হওয়ার জন্য নানা অপকৌশল অবলম্বন বন্ধ না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। বাস্তবতা হলো—নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া এই দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা যায় না।”

সুশাসনের অভাবের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, “যদি রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে প্রতিবারই জনগণকে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে নামতে হবে। এতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।”

বিভাগীয় এই সংলাপে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও নেতারাও এতে মতামত তুলে ধরেন।

সংলাপে বক্তারা বলেন, নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও এটি একমাত্র শর্ত নয়। নির্বাচনের পর গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে হলে স্বাধীন ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এজন্য সুশাসন নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা অপরিহার্য।

বক্তারা আরও বলেন, জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনে নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে।

এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




নির্বাচন ঘিরে বরিশালে যৌথ বাহিনীর কড়া অভিযান, বসানো হলো ১৩ চেকপোস্ট

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বরিশাল নগরীতে শুরু হয়েছে যৌথ বাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তা অভিযান। নগরজুড়ে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি, বসানো হয়েছে একাধিক চেকপোস্ট। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চিহ্নিত অপরাধী গ্রেপ্তার এবং যেকোনো নাশকতামূলক তৎপরতা রোধ করাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ও ব্যস্ত এলাকাগুলোতে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা তল্লাশি কার্যক্রম চালাচ্ছেন।

যেসব এলাকায় চেকপোস্ট বসানো হয়েছে সেগুলো হলো—নথুল্লাবাদ, গড়িয়ারপাড়, আমতলার মোড়, জিলা স্কুল মোড়, জেলখানার মোড়, তালতলী ব্রিজ, কাশিপুর, দিনারের পুল, মরখোলার পোল, চৌমাথা, দপদপিয়া ব্রিজ, কালিজিরা ও রহমতপুর।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, নগরীতে মোট ১৩টি চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। এসব চেকপোস্ট প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকবে। নিয়মিত পুলিশি টহলের পাশাপাশি বাড়তি তল্লাশি ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

তিনি বলেন, “সরকারের প্রধান লক্ষ্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্য অর্জনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত পূরণ করা প্রয়োজন। যৌথ বাহিনীর এই অভিযান তারই অংশ। নির্বাচনকে অস্থিতিশীল করতে পারে—এমন ঝুঁকিপূর্ণ উপাদানগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হুমকি অবৈধ অস্ত্র ও পেশাদার অপরাধীরা।”

পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, অভিযানে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে এবং দাগী আসামিদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য ও সহিংসতায় জড়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—এমন ব্যক্তিদেরও নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী তল্লাশি আরও জোরদার করা হবে।

নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ভোটের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে এই অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫




বিজয় নিশ্চিত, এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা: নুর

পটুয়াখালী-৩ (দশমিনা–গলাচিপা) আসনের বিএনপি জোট মনোনীত প্রার্থী ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেছেন, “বিজয় আমাদের হয়েই গেছে, এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা হবে। আমি আপনাদের নিয়েই কাজ করতে চাই, আপনাদের পাশেই থাকতে চাই।”

রোববার (১১ জানুয়ারি) রাতে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের গছানী গ্রামে হযরত গেদু শাহ চিশস্তি (রহ.)-এর ৪৯তম বাৎসরিক ওরস মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ওরসের মঞ্চে নুর বলেন, ওয়াজ মাহফিল যেমন আমাদের সংস্কৃতির অংশ, তেমনি ওরস মাহফিলও এই দেশের বৈচিত্র্যের প্রতিচ্ছবি। এখানে বাউলসহ নানা সম্প্রদায় ও সংগঠনের মানুষ একত্রিত হয়েছেন। প্রত্যেক মানুষেরই কথা বলার, অনুষ্ঠান করার স্বাধীনতা রয়েছে। এই বৈচিত্র্যই বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কাউকে বাধা দেওয়া, গায়ের জোরে হামলা করা কিংবা কোনো অনুষ্ঠান ভাঙচুর করার রাজনীতি তারা করেন না। এসব করলে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য বাড়ে। “আমি এখানে এসেছি আপনাদের প্রতি সংহতি ও সমবেদনা জানাতে। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আপনাদের পাশেই থাকব,”—বলেন নুর।

দশমিনা ও গলাচিপা অঞ্চলের সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও তারা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস ও ব্যবসা-বাণিজ্য করে আসছেন। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কোথাও কোথাও তাদের ব্যবসা ও ঘরবাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নুর বলেন, ৫ আগস্টের পর গলাচিপায় তিনি বেশিরভাগ হিন্দু ব্যবসায়ীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাদের আশ্বস্ত করেছেন—ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ আক্রান্ত হলে যেন সরাসরি তাকে জানান। “ব্যবসা করতে গেলে কাউকে এক পয়সাও চাঁদা দিতে হবে না। আমাদের দলের কেউ যদি চাঁদাবাজি বা হয়রানির সঙ্গে জড়িত থাকে, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না,”—হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে নুর জানান, দশমিনা ও গলাচিপাকে তিনি রাজনৈতিক সম্প্রীতির একটি রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে চান। সেখানে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিএনপি, গণঅধিকার পরিষদ, আওয়ামী লীগ, জামায়াতসহ সব দলের নেতাকর্মীরা একসঙ্গে অংশ নেবেন, কুশল বিনিময় করবেন। রাজনৈতিক মতভেদের কারণে কেউ কারও ওপর হামলা করবে না, মামলা দেবে না, জুলুম করবে না—এমন ন্যায় ও ইনসাফের সমাজ গড়াই তাদের লক্ষ্য।

গণতান্ত্রিক অধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের অধিকার রয়েছে। গায়ের জোরে বাধা দেওয়া কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।

ওরস মাহফিলে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসল্লি উপস্থিত ছিলেন।

এস এল টি / চন্দ্রদ্বীপ নিউজ২৪.কম /২০২৫