পিলখানা হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে গুম-খুন, আয়নাঘর, শাপলা চত্বরের রক্তাক্ত অভিযান এবং একের পর এক বিতর্কিত নির্বাচনী প্রহসন—সবকিছুই দলিল আকারে সংরক্ষণ করা হচ্ছে আসন্ন জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে। দেশের ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায়গুলো প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যেই জাদুঘরটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে জাদুঘর নির্মাণ কর্তৃপক্ষ প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে এ অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করে। বৈঠকে জানানো হয়, আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যেই নির্মাণকাজ শেষ হবে এবং নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই জাদুঘরটি উদ্বোধন করা সম্ভব হবে।
সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বৈঠকে জানান, “ষোলো বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের যে অমানবিক রূপ, তা কিউরেট করে উপস্থাপন করা হবে এই জাদুঘরে। গুম, খুন, নির্যাতন, প্রহসনের নির্বাচন—সব কিছুরই প্রমাণ এখানে সন্নিবেশিত হবে, যেন ইতিহাস বিকৃত না হয়।”
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস জাদুঘরের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “এটি শুধু অতীতের দলিল নয়, বরং মানুষের মধ্যে প্রতিরোধের চেতনা জাগ্রত করার এক শক্তিশালী মাধ্যম হবে। যারা এখানে আসবেন, তারা ৫ আগস্ট গণভবনের সামনে জনতার ঢল অনুভব করতে পারবেন।”
জাদুঘরের চিফ কিউরেটর তানজীম ওয়াহাব জানান, নির্মাণকাজে আইসিটি প্রসিকিউশন টিম ও গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “এটি হবে একেবারেই অনন্য একটি জাদুঘর। ষোলো বছরের দুঃশাসনের ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে সাজানো থাকবে। দর্শনার্থীরা জানতে পারবেন কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল।”
ফারুকী আরও জানান, “গুম-খুনের নির্দেশ সম্পর্কিত বহু অডিও ইতোমধ্যেই জাদুঘর কর্তৃপক্ষের হাতে এসেছে। এসব অডিও প্রদর্শিত হবে। এমনকি কীভাবে পরিবারগুলোকে মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়া হতো, সেই ভয়াবহ বাস্তবতাও এখানে তুলে ধরা হবে।”
জাদুঘরে একটি আধুনিক স্ক্রিনিং সেন্টারও তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে জুলাই এবং দীর্ঘ ১৬ বছরের দুঃশাসনকে কেন্দ্র করে নির্মিত ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হবে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মফিদুর রহমান, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের গভর্নিং বডির চেয়ারপারসন মেরিনা তাবাসসুম।
এছাড়া গবেষক ড্যানিয়েল আফজালুর রহমান, কবি হাসান রোবায়েত, গবেষক মালিহা নামলাহা, শিল্পী তেজশ হালদার জশ, স্থপতি সালাউদ্দিন আহমেদ, সমন্বয়কারী হাসান এনামসহ জাদুঘরের বিভিন্ন গবেষক ও শিল্পীরা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর শুধু ইতিহাসের দলিলই নয়, বরং এটি হবে জনগণের জন্য শেখার জায়গা, যেখানে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার অনুপ্রেরণা মিলবে।
মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম