- নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে ৮ ফেব্রুয়ারি। এই সময়ের মধ্যে সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের সংস্কারে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিচারব্যবস্থার উন্নয়ন ও ডিজিটালাইজেশনে নেওয়া হয়েছে যুগান্তকারী উদ্যোগ।
বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয়ের উদ্যোগ
অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা বাড়াবে।
‘গায়েবি’ মামলা চিহ্নিত ও প্রত্যাহারের উদ্যোগ
বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের করা ‘গায়েবি’ মামলা চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া চলছে। একইসঙ্গে হয়রানিমূলক ফৌজদারি মামলাগুলোও বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আইন প্রক্রিয়ায় ডিজিটালাইজেশন
আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৩৬ ধরনের ডকুমেন্টের সত্যায়ন প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা হয়েছে, যা জনসাধারণের সময় ও খরচ সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখবে। একইসঙ্গে উচ্চ আদালতে ই-ফাইলিং চালু হয়েছে এবং মডেল ই-কোর্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে সারাদেশে সম্প্রসারিত হবে।
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ
৩ অক্টোবর বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন গঠন করা হয় এবং সম্প্রতি কমিশন প্রধান সাবেক বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান সরকারের কাছে ২৮ দফা সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছেন। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ, শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ অন্যতম।
অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠন
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং তদন্ত সংস্থার নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চলমান মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রসিকিউশন টিমকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
বিচারক ও আইন কর্মকর্তাদের নিয়োগ
সুপ্রিম কোর্টে আপিল বিভাগে ৫ জন, হাইকোর্ট বিভাগে ২৩ জন এবং অধঃস্তন আদালতে ১০৯ জন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এটর্নি জেনারেল অফিসে ২৩৯ জন আইন কর্মকর্তা ও দেশের বিভিন্ন জেলার আদালতে প্রায় ৪ হাজার আইন কর্মকর্তা নিয়োগ পেয়েছেন।
বিচার ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন
২৩টি জেলার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবন, ৬টি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ভবন, ৫টি মহানগর দায়রা জজ ভবন ও ১০টি জেলা জজ আদালত ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২৩টি জেলা জজ আদালতের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে।
গুম বিরোধী তদন্ত কমিশন ও সনদ অনুসমর্থন
গুম বিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ অনুসমর্থনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং অতীতে গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে।
সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি
আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিদ্যমান আইনগুলো যুগোপযোগী করার পাশাপাশি সাইবার আইন সংশোধন বা বাতিলের বিষয়েও কাজ চলছে।
এই ছয় মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আইনি সংস্কারে যে অগ্রগতি দেখিয়েছে, তা ভবিষ্যতে দেশের বিচার ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও জনবান্ধব করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
—
মো: আল-আমিন