তালেবান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাতে নতুন কৌশলগত বাস্তবতা

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে তালেবান শাসিত আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের চলমান সীমান্ত সংঘাত। শনিবার গভীর রাতে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ রবিবার সকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এ ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক আবারও উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে, যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তানের সেনা মুখপাত্র আইএসপিআর জানায়, আফগান ভূখণ্ড থেকে তালেবান এবং তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)—যাদের তারা ‘ফিতনা আল-খাওয়ারিজ’ বলে অভিহিত করেছে—তাদের হামলার জবাবে পাকিস্তানি বাহিনী পাল্টা অভিযান চালায়। আইএসপিআর দাবি করেছে, এতে ২০০-রও বেশি সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। পাল্টা হামলায় আফগান সীমান্তের একাধিক ঘাঁটি, প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও অবস্থান লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়।
অন্যদিকে, আফগান সরকারের দাবি—তাদের পাল্টা হামলায় ৫৮ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে। তবে পাকিস্তান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি। সৌদি আরব ও কাতারের অনুরোধে আফগানিস্তান আপাতত অভিযান “অস্থায়ীভাবে স্থগিত” রেখেছে বলে জানিয়েছেন আফগান ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি।
মুত্তাকি বলেন, “আমরা আমাদের সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছি। তবে কাতার ও সৌদি আরবের আহ্বানে আপাতত সংঘাত বন্ধ রেখেছি।” তিনি আরও দাবি করেন, “আমাদের ভূখণ্ডে কোনো পাকিস্তানি তালেবান ঘাঁটি নেই; বরং অতীতে পাকিস্তানই এই গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়েছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংঘাত কেবল সামরিক বিষয় নয়, বরং কৌশলগত পুনর্গঠনের প্রতিফলন। তালেবান সরকার এখন পাকিস্তানের ছায়া থেকে বেরিয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গঠনের পথে হাঁটছে। তারা চীন, কাতার, ইরান এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে—যা পাকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী প্রভাববলয়ে বড় পরিবর্তন নির্দেশ করছে।
এদিকে ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্কও দিন দিন উষ্ণ হচ্ছে। সম্প্রতি আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির নয়াদিল্লি সফর দক্ষিণ এশিয়ার নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছে। নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তিনি আফগানিস্তানের খনিজ, কৃষি, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান জানান। এছাড়া ইরানের চাবাহার বন্দর ও আফগান-ভারত ওয়াঘা সীমান্ত পুনরায় চালুর বিষয়েও আলোচনা করেন।
তালেবান সরকারের এই অবস্থান পাকিস্তানের জন্য কৌশলগত উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আফগানিস্তানের ওপর পাকিস্তানের “কৌশলগত গভীরতা” নীতির অবসান ঘটছে। একসময় আফগান ভূখণ্ডকে ভারতের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাফার হিসেবে ব্যবহার করলেও এখন কাবুল সেই অবস্থান থেকে সরে এসে ভারতমুখী কূটনীতিতে মনোযোগ দিচ্ছে।
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথমে ভারত কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখলেও এখন তারা বাস্তববাদী কূটনীতি অবলম্বন করছে। মানবিক সহায়তা, খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা পুনরায় শুরু করেছে নয়াদিল্লি। এবার তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর সেই সম্পর্কের রাজনৈতিক স্বীকৃতি ও আস্থার সূচনা করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তালেবানও বুঝতে পেরেছে, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অপরিহার্য। কাশ্মীর ইস্যুতে তাদের সাম্প্রতিক নীরবতা সেই নতুন বাস্তবতারই প্রতিফলন।
এই ভূরাজনৈতিক পুনর্গঠনের ফলে পাকিস্তান একদিকে নিরাপত্তাজনিত অস্বস্তিতে পড়েছে, অন্যদিকে ভারত ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে কৌশলগতভাবে দুর্বল অবস্থানে চলে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার প্রান্তে আফগানিস্তানের এই অবস্থান ভবিষ্যতে পুরো অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্য পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম









