বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন—এমন দাবি করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। তাদের ইনভেস্টিগেটিভ ইউনিট (আই-ইউনিট) শেখ হাসিনার একাধিক ফোনালাপ ফাঁস করে বলেছে, এসব নির্দেশ তিনি প্রকাশ্যেই দিয়েছিলেন এবং ফোনালাপে তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) প্রকাশিত আল জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনা নিরাপত্তা বাহিনীকে যে কোনো স্থানে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অনুমতি দিয়েছিলেন। ফোনালাপে তাকে বলতে শোনা যায়, “আমি সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ্যে আদেশ দিয়েছি। এখন তারা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করবে, যেখানেই পাবে গুলি চালাবে।”
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, শেখ হাসিনার সঙ্গে ওই সময়কার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের ফোনালাপে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
যদিও সরকার পক্ষ এই অডিওর সত্যতা অস্বীকার করেছে, আল জাজিরার দাবি—ফোনালাপগুলো ফরেনসিকভাবে যাচাই করা হয়েছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি নয় বলেই বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন। ভয়েস-ম্যাচিংয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তও করা হয়েছে।
আল জাজিরা আরও জানায়, আন্দোলনের সময় চিকিৎসকরা বিক্ষোভকারীদের শরীরে অস্বাভাবিক গুলির ক্ষত দেখতে পান। রাজধানীর পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শাবির শরীফ জানান, “হেলিকপ্টার থেকে হাসপাতালের প্রবেশপথ লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়।”
রংপুরে আন্দোলনকারী আবু সাঈদের মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পরিবর্তনের চাপের কথাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। সেখানে দাবি করা হয়, পুলিশের চাপে এক চিকিৎসককে পাঁচবার রিপোর্ট বদলাতে বাধ্য করা হয়।
আসন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় শেখ হাসিনার এসব ফোনালাপ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে গত ১০ জুলাই শেখ হাসিনা ও তার দুই ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। আগামী আগস্টে বিচার শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।
আল জাজিরার দাবি, শেখ হাসিনা নিজেও জানতেন তার ফোনালাপ রেকর্ড হচ্ছে। এক জায়গায় তাকে বলতে শোনা যায়, “হ্যাঁ, আমি জানি, রেকর্ড হচ্ছে। কোনো সমস্যা নেই।”
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, “তিনি (হাসিনা) অন্যদের জন্য গর্ত খুঁড়েছিলেন, এখন নিজেই তাতে পড়ে গেছেন।”
তবে আওয়ামী লীগের একজন মুখপাত্র এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “শেখ হাসিনা কখনও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেননি। ফোনালাপগুলো বিকৃত বা খণ্ডিতভাবে প্রচার করা হয়েছে।”
২০২৪ সালের কোটা বিরোধী আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থী আবু সাঈদের পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে যান বলে দাবি করেছে আল জাজিরা।