মো: আল-আমিন (পটুয়াখালী): পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের সুগন্ধী কালোজিরা ধান। ফলন কম, বেশি খরচ ও কম লাভের কারণে এ ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন উপজেলার প্রান্তিক কৃষকরা। তারা বিকল্প হিসেবে আবাদ করেছেন গুটি স্বর্ণ, স্বর্ণ-৫,স্বর্ণ ৪৯, স্বর্ণ গোঠা, মাথা মোটা ও ব্রি-ধান ৪৩।
কৃষি বিভাগের মাধ্যমে কালোজিরা ধান আবাদে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা বা প্রদর্শনী প্লট প্রকল্প হাতে নেয়া হলে বিলুপ্তির হাত থেকে তা ফেরানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
জানা যায়, উপজেলায় সুগন্ধী কালোজিরা ধান স্থানীয় ভাষায় ঘুয়াধন (সুগন্ধী কালোজিরা) হিসেবে বেশ পরিচিত। এক সময় উপজেলার কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল এ ধান। সর্বত্র চাষও হতো। গ্রামীণ জীবনের এক প্রকার অপরিহার্য অংশ ছিল এ ধান। এ সুগন্ধী চাল দিয়ে বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে তৈরি হতো পিঠা-পুলি, পোলাও, বিরিয়ানি, খিচুড়ি, ক্ষির, পায়েস, ফিরনি ও জর্দাসহ আরো সুস্বাদু মুখরোচক নানা ধরনের খাবার।
কিন্তু এ সবই এখন স্মৃতি হয়ে যেতে বসেছে। এ ধান কাটার সময় গ্রামবাংলা মেতে উঠত নবান্নের উৎসবে। সেসব এখন অনেকটাই অতীত। বীজের অভাব, সার, শ্রমিকের মজুরি ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা কারণে হারিয়ে যাচ্ছে এ ধানের আবাদ। ২৫-৩০ বছরের ব্যবধানে এ ধানের জায়গা দখল করে নিয়েছে উফশী ও উচ্চফলনশীল জাতের ধান। উপজেলায় এক সময় কালোজিরা ধান চাষ হতো কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে। ক্রমবর্ধমান খাদ্যের চাহিদা মেটাতে দেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতিবান্ধব এমন হাজারও জাতের দেশী ধান।
কলাপাড়া কৃষি অফিস সূত্র জানায়, এ উপজেলায় ১২টি ইউনিয়ন ও দু’টি পৌরসভায় ৩৫ হাজার ৫০০ কৃষক পরিবার রয়েছেন। এ বছর ৩০ হাজার ৭০০হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে কালোজিরা ধান চাষ হয়েছে ৫০ হেক্টর জমিতে।
সরেজমিন উপজেলার ধুলাসার, নীলগঞ্জ, মিঠাগঞ্জসহ নীলগঞ্জ ইউনিয়নে বিভিন্ন জাতের ধান আবাদকারী কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কালোজিরা ধানের ফলন হয় কম। বিঘা প্রতি অন্য জাতের ধান যেখানে ১৫ থেকে সর্বোচ্চ ২০ মণ উৎপাদন হয়, সেখানে এ ধানের ফলন হয় সর্বোচ্চ ৮ মণ। তবে বাজারে দাম পাওয়া যায় দ্বিগুণ। সার, সেচ ও পরিচর্যাও লাগে কম। সে হিসেবে লোকসান হয় না বললেই চলে। এখনো প্রতি কেজি এ ধানের চাল বিক্রি হয় ১০০ থেকে ১২০ টাকা। তবে সচরাচর সব খানে পাওয়া যায় না। এ ধান চাষে কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ লক্ষ করা গেলেও বীজের অভাবে অনেকের পক্ষে আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। দূর থেকে ধানক্ষেত দেখলে মনে হবে এ যেন কোনো চিত্রশিল্পীর নিপুণ হাতে আঁকা ছবি। এ জাতের ধান সাধারণত কালো বর্ণের হয়। অন্য ধানের চেয়ে এর আকারও ছোট।
একসময় গ্রামীণ জীবনে এ ধান ছিল অপরিহার্য। প্রতিটি বাড়িতে সংরক্ষণ করা হতো কালোজিরা ধান। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিভিন্ন পূজা-পার্বণের ভোগ, মিষ্টান্ন রান্নার কাজে কালোজিরা চাল ব্যবহার করেন। উপজেলার হাটবাজারে এখন আর এ চাল তেমন একটা পাওয়া যায় না। আবহমান বাংলার ঐতিহ্য অনুযায়ী শ্বশুরবাড়িতে জামাই এলে এ চালের ভাত দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। নিম্ন, মধ্য, গরিব হলেও দিনে অন্তত একবেলা অবশ্যই এ চালের ভাত রান্না হতো।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ আর এম সাইফুল্লাহ বলেন, কালোজিরা ধান আগে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে চাষ হতো। কিন্তু উৎপাদন কম ও বীজ আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের জনপ্রিয় এই ধান। তুলনামূলক ফলন কম এবং লাভ কম হওয়ায় কৃষকরা এ ধান আবাদে দিনে দিনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। বাণিজ্যিক ভাবে কোনো কৃষক এখন আর কালোজিরা ধান চাষাবাদ করেন না।