গরমে সতেজ থাকতে যে ৪ খাবার খাবেন




জায়েদ খানের সঙ্গে অভিনয় করতে চান টয়া




চুলে মধু ও কলা ব্যবহার করলে কী হয়?




বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রস্তুত পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র

পটুয়াখালী প্রতিনিধি :: বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত হয়েছে পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র। সেপ্টেম্বরে এ কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। আর ডিসেম্বরে জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হবে বাকি ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। সে লক্ষ্যে চলছে শেষ পর্যায়ের কাজ।

এ কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ হওয়া বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য এটি মাইলফলক বলে মনে করছেন এই প্রকল্পের কর্মকর্তারা।

২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নোরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরএনপিএল) যৌথ বিনিয়োগে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শুরু করে।

জেলার ধানখালী ইউনিয়নের লোন্দা গ্রামে ৯১৫ একর জমির উপর ২৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরে এর নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। করোনাসহ নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে টারবাইন, চুল্লি, কোল স্টোর, স্টিল স্ট্রাকচার, বয়লার, ওয়াটার ফিড ও জেনারেটর বসানোর কাজ। বর্তমানে দ্রুতগতিতে চলছে কনস্ট্রাকশন ও রঙের কাজ। ৪ হাজার বাঙালি ও দেড় হাজার চাইনিজ শ্রমিক এ নির্মাণ কাজ করছেন।

আরো পড়ুন : মহাসড়কে দুর্ঘটনায় ঢাকা-পটুয়াখালী রুটে যাত্রীদের মাঝে আতঙ্ক

ইতোমধ্যে বয়লারে ফায়ারিংও করা হয়েছে। মোট কথা বর্তমানে বিদুৎ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত এ পাওয়ার প্লান্ট। এ কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে নিজস্ব অর্থায়নে ২০ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন, ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন ও পার্শ্ববর্তী আমতলী উপজেলায় একটি সুইচিং স্টেশন তৈরি করা হয়েছে। এ সুইচিং স্টেশনের কাজও ৯২ ভাগ শেষ।

বর্তমানে শেষ পর্যায়ের টেস্টিং ও কমিশনিংয়ের কাজ চলমান। জুলাই মাসে ব্যাক ফিড পাওয়ার পেলে সেপ্টেম্বরে প্রথম ইউনিট থেকে ৬৬০ মেগাওয়াট ও ডিসেম্বরে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে আরও ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করতে চায় প্রকল্পটি।

পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী (তড়িৎ) আসিফ আহমেদ জানান, আমরা নিজস্ব অর্থায়নে ২০ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন, ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন ও পার্শ্ববর্তী আমতলী উপজেলায় একটি সুইচিং স্টেশন তৈরি করেছি। এ সুইচিং স্টেশনের কাজও ৯২ ভাগ শেষ হয়েছে।

অপর নির্বাহী প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল) শওকত ওসমান বলেন, ইতোমধ্যে আমাদের প্রথম ইউনিটের সকল কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আমরা বয়লারে ফায়ারিংও করেছি। মোটকথা আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত।

পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, আমরা আশা করছি, জুলাই মাসে ব্যাক ফিড পাওয়ার পাব। এ ব্যাক ফিড পাওয়ার পেলে সেপ্টেম্বরে ৬৬০ মেগাওয়াট ও ডিসেম্বরে আরও ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করতে পারব বলে আশা করছি।




মহাসড়কে দুর্ঘটনায় ঢাকা-পটুয়াখালী রুটে যাত্রীদের মাঝে আতঙ্ক

পটুয়াখালী প্রতিনিধি :: একের পর এক দুর্ঘটনা সড়ক পথে ঢাকা-বরিশাল-পটুয়াখালী রুটের যাত্রীদের মাঝে আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। তাই নিরাপত্তার খাতিরে অনেক যাত্রী আবার নৌ-পথে যাতায়াত শুরু করেছেন।

যার প্রমাণ মিলেছে বরিশাল ও পটুয়াখালীর নদী বন্দরে পবিত্র ঈদুল আযহার ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরা মানুষগুলোর ভিড় দেখে।

লঞ্চের যাত্রী ওমর ফারুক বলেন, গত কয়েকদিনে শুধু সড়কে দুর্ঘটনার খবরই শুনছি। নিজেও পটুয়াখালী আসার পথে একটুর জন্য দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে গেছি। তাই লঞ্চে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাসের থেকে অন্তত নিরাপদে তো যেতে পারবো।

যদিও পদ্মা সেতু চালুর পর সময় স্বল্পতার কারণে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা সড়ক পথে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিতের দাবি বেশিরভাগ যাত্রীর।

ঢাকা-পটুয়াখালী সড়কপথে নিয়মিত চলাচলকারী বাস যাত্রী ফাহিম রহমান বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর প্রতিনিয়ত যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ঢাকা থেকে বরিশাল ও পটুয়াখালী রুটের মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে কয়েকগুণ। তবে ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত দীর্ঘ মহাসড়কের ধারণক্ষমতা আছে ২০২২ সালের আগের মতোই। যদিও কিছু কিছু বাঁকে সড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে, তবে তা কার্যত তেমন উপকারে আসছে না এখনও। এই যাত্রীর মতে, প্রয়োজন অনুসারে মহাসড়ক প্রশস্ত না হওয়ায় গতির প্রতিযোগিতাই দুর্ঘটনার মূল কারণ।

সম্প্রতি দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি থেকে বেঁচে যাওয়া যাত্রী মিজানুর রহমানের মতে, ঈদ-কোরবানির সময়টায় চালকরা একটানা বেশি ডিউটি করায় ক্লান্ত থাকেন। আর যেখান থেকে ঘুমের ভাব হলেই দুর্ঘটনা ঘটে। যে কারণে তিনিও দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এখন নিয়মিত লঞ্চে যাতায়াত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এদিকে গণমাধ্যমও বলছে, ১৫ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত ছয়দিনে শুধু বরিশাল জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ৯ জন। পক্ষান্তরে নৌ-পথে দুর্ঘটনার কোনো খবর পাওয়া যায়নি এ কয়দিনে।

বাস চালকরা বলছেন, শুধুই গতি নয়, অনভিজ্ঞ চালকসহ মহাসড়কে বৈধ-অবৈধ ও মিশ্র প্রযুক্তির গাড়িই দুর্ঘটনার মূল কারণ।

বাসের চালক নয়ন বলেন, ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত একমাত্র মহাসড়ক, যেখানে অবাধে দূরপাল্লার গাড়িগুলোর সাথে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশা, টমটম, নছিমন, করিমন, সিএনজি, আলফাসহ সকল ধরনের থ্রি-হুইলার চলাচল করে। অথচ বিআরটিএর অনুমোদন পাওয়া-না পাওয়া এসব যানবাহন মহাসড়কে চলার কথা না। সেই সাথে বাজার-ঘাটে ঘেরা মহাসড়কে অটো ও ম্যানুয়াল প্রযুক্তির গাড়ির পাশাপাশি, তেলের- ব্যাটারির, নতুন-পুরাতন বিভিন্ন গতির গাড়ি চলাচল করছে।

আরো পড়ুন : পটুয়াখালীতে চাচার মারধরে ভাতিজার মৃত্যু

তিনি আরো বলেন, সবমিলিয়ে দিনের বেলা যেমন তেমনভাবে গেলেও রাতে তো আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে ভাঙ্গা-বরিশাল- কুয়াকাটা মহাসড়ক। ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশা, টমটম, নছিমন, করিমনের মতো অবৈধ অনেক যানবাহনের তো কোনো ধরনের বাতিই থাকে না, আবার যাদের আছে তাদের গাড়ির সামনে পেছনের সবগুলো বাতি ঠিকভাবে জ্বলে না। ফলে গাড়িটা কতখানি প্রশস্ত কিংবা চালক ব্রেক কষল কিনা তা বোঝা যায় না। সবমিলিয়ে যে অবস্থা তাতে এ মহাসড়কে বাস চালনা করতে একজন চালককে কতটা বেগ পেতে হয় তা বলে বোঝানো যাবে না। আর হিসেবের গড়মিল হলেই দুর্ঘটনা ঘটে যায়, তখন দোষ হয় পরিবহন চালকদের।

পরিবহন চালকদের মতে দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে মহাসড়ক প্রশস্ত করার পাশাপাশি সর্বপ্রথমে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে, নয়তো বিমুখ হবেন বাস যাত্রীরা। একই কথা জানালেন হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারাও।

গৌরনদী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রসুল মোল্লা মুঠো ফোনে বলেন, এ মহাসড়কে দুর্ঘটনা রোধে সর্বপ্রথম মহাসড়ক প্রশস্ত করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মানুষ চলাচলে জায়গায় জেব্রা ক্রসিংসহ রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা রাখা এবং মহাসড়কের পাশ ধরে হাঁটার জায়গা প্রয়োজন।

তিনি আরো বলেন, রাস্তা সরু হওয়ায় বর্তমান সময়ে ওভারটেক করতে গিয়ে যেমন দুর্ঘটনা ঘটছে, তেমনি রাস্তার পাশে চলাচলের জায়গা না থাকায় মানুষ যানবাহনে চাপা পড়ছে। গেল কোরবানির ঈদের আমরা গরুর গাড়ি নির্বিঘ্নে চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়ার পাশাপাশি যাত্রীবাহী যানবাহনের ছাদে লোক না নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক ছিলাম। সেইসাথে মহাসড়কে অতিরিক্ত গতিতে যানবাহন চলাচল রোধ, থ্রি-হুইলারসহ আনফিট গাড়ির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াও হয়েছে। আর এজন্য বিভিন্নভাবে মহাসড়কে আমাদের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছে। তবে নিজ নিজ পর্যায় থেকে সবাইকে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ এই কর্মকর্তার।

এদিকে এবারের ঈদে পটুয়াখালী-ঢাকামুখী যাত্রীদের চাপ বিগত দিনগুলোর থেকে বেশি থাকায় খুশি সংশ্লিষ্টরা।




কলাপাড়ার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ নিয়ে আতঙ্কে তিন লক্ষাধিক মানুষ

পটুয়াখালী প্রতিনিধি :: পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপকূলের তিন লক্ষাধিক মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। জলোচ্ছ্বাসে ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ দীর্ঘদিন ধরে মেরামত না করা, বছরের পর বছর বৃষ্টির পানিতে বেড়িবাঁধের উচ্চতা কমতে থাকলেও মাটি দিয়ে এর উচ্চতা বৃদ্ধি না করাই এই আতঙ্কের অন্যতম কারণ।

কলাপাড়া উপজেলার আয়তন ৪৯২.১০ বর্গ কি.মি। এখানে ১২টি ইউনিয়ন ও দু’টি পৌরসভায় ২৪৪টি গ্রাম রয়েছে। উপজেলা ২২টি স্পটে ৯.১৯ কি. মি বেড়িবাঁধ বেড়িবাঁধ জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড় ছাড়াও প্রতি অমাবস্যা আর পূর্ণিমার সময় এলাকার মানুষ জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কায় থাকে আতঙ্কিত।

জানা যায়, গত এক দশকে মে মাসে আটটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। ৪৭/৪ পোল্ডারের মিঠাগঞ্জ বেড়িবাঁধ ইতিমধ্যে বাঁধের রিভার সাইডের মূল বাঁধসহ জিওব্যাগ ধসে আন্ধারমানিক নদীতে পড়ে গেছে।
ভাঙন শুরু হয়েছে বাঁধের কান্ট্রি সাইডেও। সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় ফাঁটল। এ কারণে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে পাঁচটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ।

৪৬ পোল্ডারের নীলগঞ্জ ইউনিয়নে গইয়াতলা গ্রামের ভাঙা বাঁধ সংলগ্ন ছয়টি গ্রামের মানুষ রয়েছে আতঙ্কে। বাঁধসহ স্লুইসগেট ভেঙে পড়ার পর এবার বেড়িবাঁধ ভেঙে পড়ার চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছে এলাকার মানুষ। সোনাতলা নদীর ঢেউয়ের তোরে গইয়াতলা বেড়িবাঁধের রিভার সাইডের বাঁধ ভেঙে পড়েছে। বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা দিয়েছে ফাটল।

এদিকে, ৪৭ পোল্ডারের মহিপুর ইউনিয়নে সিডরের পর থেকে নিজামপুর ৫ গ্রামের মানুষ ১০ বছর ধরে জমিতে কোনো চাষ করতে পারেনি। এরপর পানি উন্নয়ন বোর্ড জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে এখানের রিং বেড়িবাঁধ করে দেয়। এখন আবার নতুন করে আতঙ্কে ভুগছে। হুমকিতে পড়ছে উপজেলা নিজামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিদিনই ভাঙছে নতুন করে একেকটি পরিবারের স্বপ্ন। সাগর ও নদীর প্রতিটি জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বসতঘর, আবাদি জমি ও মাথাগোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু। নিঃস্ব হতে হতে এই গ্রামের মানুষের শেষ সম্বল এখন শুধুই বেঁচে থাকার আকুতি। এভাবে পাউবোর পূর্ব গৈয়াতলা, লেমুপাড়া, চম্পাপুর, মঞ্জুপাড়া, মুন্সীপাড়া, নিজামপুর, জালালপুর, ধূলাসার, বালিয়াতলী, দেবপুর, নাচনাপাড়া, বড়কলবাড়ি, খ্রিস্টান পাড়ার বেড়িবাঁধ।

আরো পড়ুন : পূর্ব বিরোধের জেরে বাউফলে বৃদ্ধকে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ

এলাকাবাসীর দাবি, ত্রাণ চাই না শুধু বাঁধ চাই। অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় সিডরে নিশ্চিহ্ন আন্দারমানিক নদী তীরবর্তী এলাকার হাজারো পরিবারের দিন কাটছে চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের মধ্যদিয়ে। ভয়াবহ ভাঙন ও তীর রক্ষাবাঁধ ধসে যাওয়ায় ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কায় তাদের মধ্যে এ আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পুরো বাঁধ ভেঙে গেলে অরক্ষিত হয়ে পড়বে গোটা কলাপাড়া উপজেলা।

স্থানীয়রা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ সময়মতো মেরামতের উদ্যোগ নিলে কম খরচ ও কম সময়ের মধ্যে মানসম্মত কাজ সম্ভব। তবে বর্ষার আগ মুহূর্তে যখন নদীতে জোয়ারের পানি বেড়ে বাঁধ কানায় কানায় পূর্ণ হয়, পাউবো কর্তৃপক্ষ সে সময় এসে মেরামতের উদ্যোগ নেয়। এতে একদিকে খরচ বাড়ে, অন্যদিকে তড়িঘড়িতে কাজ হয় নিম্নমানের। প্রতি বছরের মে মাস এলেই পাউবো কর্তৃপক্ষ বাঁধ মেরামতের তোড়জোড় শুরু করে। কী কারণে তা কেউ বলতে পারে না। অথচ শীত মৌসুমে কাজ করার অনেক সুবিধা। বরাদ্দের টাকা আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টির জন্য পাউবোর লোকজন অসময়ে এসে কাজ ধরেন।

মহিপুর ইউপি চেয়ারম্যান হাজী ফজলু গাজী জানান, এ এলাকার বেশির ভাগ মানুষই মৎসজীবী। আবার কেউ কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। শুধু অমাবস্যা-পূর্ণিমাই নয়, জোয়ার ভাটার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয় তাদের। পূর্বের বেড়িবাঁধ নেই।

পাউবোর উপ-বিভাগীয় সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম জানান, পাউবোর পূর্ব গৈয়াতলা, লেমুপাড়া, চম্পাপুর, মঞ্জুপাড়া, মুন্সীপাড়া, নিজামপুর, জালালপুর, ধূলাসার, বালিয়াতলী, দেবপুর, নাচনাপাড়া, বড়কলবাড়ী, খ্রিস্টানপাড়া, চরান্ডা, চর মোন্তাজ, চালিতবুনিয়া বড় বাইশদিয়া বেড়িবাঁধের ২২টি স্পটে ৯.১৯ কি. মি. বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকতাদের সঙ্গে মিটিং হয়েছে। তারা বলছে বেড়িবাঁধগুলো পর্যায় ক্রমে মেরামত করা হবে।




যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছেন বরিশালের গৌরনদীর দধির সুখ্যাতি

বরিশাল অফিস :: ভারতের কলকাতার পূর্ব বর্ধমানের বাসিন্দা বলরাম ঘোষ প্রায়ই আসেন বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা বরিশালের গৌরনদী উপজেলায়। স্বজন-পরিচিতদের বাড়িতে বেড়ানো হয়ে গেলে যখন তল্পিতল্পাসহ কলকাতা ফেরেন তখন যে জিনিসটি নিতে কখনোই ভুল করেন না তা হলো গৌরনদীর দধি।

বলরাম ঘোষ বলেন, কলকাতায় মিষ্টান্নের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। বিশেষ করে মিষ্টি ও দধির আলাদা ঐতিহ্য আছে। কলকাতায় সাধারণত দুই ধরনের দধি হয়। সেসবের চেয়ে আমার কাছে গৌরনদীর ঘোষ মিষ্টান্ন ভান্ডারের দধি অনেক ভালো ও সুস্বাদু লাগে। গৌরনদীর দধির ঘনত্ব কলকাতার দধির চেয়ে পুরু। গৌরনদীর দধি এখনো মুখে দিলে খাটি গরুর দুধের অতুলনীয় স্বাদ জিভে লেগে থাকে। আমি যতবার এসেছি, সব কিছু ভুলে গেলেও গৌরনদীর দধি নিতে ভুল করিনি। আমার পরিবারেও এই দধির জনপ্রিয়তা ভাষায় প্রকাশের মতো নয়।

গৌরনদী হচ্ছে বরিশাল বিভাগের প্রবেশদ্বার। ঢাকা থেকে বরিশাল অভিমুখে রওয়ানা দিলে সবার প্রথম যে জনপদ আপনাকে স্বাগত জানাবে তা গৌরনদী। উপজেলাটি জেলার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এর ব্যবসায়িক সফলতার জন্য। এক সময়ে এই উপজেলার টরকি বন্দর পুরো জেলার ব্যবসায়িক কেন্দ্র ছিল। সড়ক পথের উন্নতি, টেলিকমিউনিকেশন সহজলভ্য হওয়ায় চাল, ডাল, পোশাকের জন্য সেই বিখ্যাত টরকি বন্দরের নাম ফিকে হয়ে এসেছে। কিন্তু সড়ক পথ আর টেলিকমিউনিকেশনের কারণে ব্যবসার প্রসার বেড়েছে দধির। প্রতিদিন উৎপাদনমুখী কারখানাগুলোতে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার অর্ডার আসে। ঈদ, পূজা বা বাংলা বর্ষবরণের মতো অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে চাহিদা বাড়ে আরও। তখন দম ফেলার ফুরসত পান না কারিগররা।

কারিগর গোকূল চন্দ্র রায় বলেন, সারা বছরই কারখানায় দধির অর্ডার থাকে। উৎসব-পার্বন এলে অর্ডারের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। তখন আমরা খাওয়া-দাওয়ারও সময় পাই না। যেহেতু এক কেজি দধি তৈরি করতে কমপক্ষে ৭২ ঘণ্টা থেকে ৯৬ ঘণ্টার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তার ওপরে গৌরনদীর দধির প্রতি মানুষের যে আস্থা তা মাথায় রেখে কষ্ট হলেও দধির মানে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। রমজানের ঈদ, কোরবানি, পূজা, পহেলা বৈশাখ এলে এক-দুই মাসের জন্য আমরা বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দেই। সকাল ৮টায় কারখানায় আসি আর রাত দেড়টা বা ২টায় ঘুমাতে যেতে পারি।

সুখ্যাতির গোপন রহস্য কী? ::

প্রায় দুইশ বছর ধরে স্বাদ আর সুখ্যাতির শীর্ষে রয়েছে গৌরনদীর দধি। দধির জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যবসায় নেমেছেন উদ্যোক্তা, মুনাফা খাটিয়ে ফেরাচ্ছেন সচ্ছলতা। বরিশাল বিভাগ ছাপিয়ে ঢাকা, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, খুলনা, মোড়েলগঞ্জ, চট্টগ্রাম, যশোরের অসংখ্য দোকানে প্রতিদিন দধি যাচ্ছে এখান থেকে। গৌরনদী উপজেলার সবচেয়ে পুরাতন দুজন ময়রার হাত ধরে দধির সুখ্যাতি আসে। একজন সচীন ঘোষ, আরেকজন ননী ঘোষ। এর মধ্যে সচীন ঘোষ বেঁচে নেই। ননী ঘোষ এখনো ব্যবসার হাল ধরে আছেন। এই ঘোষ বংশের কারিগর রানা ঘোষ ২০০০ সালে আমেরিকায় পারি জমান। সেখানেও তিনি দধি উৎপাদন শুরু করেছিলেন।

যতদূর জানা যায়, গৌরনদীর দধির ইতিহাস অনেক পুরোনো। প্রায় আড়াই শ বছর আগে ডাওরি ঘোষ নামে এক ব্যক্তি গৌরনদীতে দধি তৈরি করে বেশ সফলতা পান। বংশ পরম্পরায় সেই ধারা ধরে রেখেছেন শচীন ঘোষ, ননী ঘোষ, গেদু ঘোষ, সুশীল ঘোষ, দিলীপ দাসসহ আরও অনেকেই।

কারখানা মালিক গৌরাঙ্গ ঘোষ বলেন, গৌরনদীর দধির ইতিহাস দুইশ বছরেরও বেশি। আমি যে দোকানটি চালাচ্ছি সেটির বয়সই ৭৫ বছর হবে। তার আগে আমার বাবা, দাদা একই ব্যবসা করেছেন। গৌরনদীর দধি জনপ্রিয় হওয়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে উৎপাদন প্রক্রিয়া আলাদা। বিভিন্ন অঞ্চলে যে দধি তৈরি করা হয় তা ৭/৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রস্তুত শেষ হয়ে যায়। আমাদের গৌরনদীর দধি কমপক্ষে ৭২ ঘণ্টা সময় লাগে উৎপাদন প্রক্রিয়ায়। সেখান থেকে খাবারের জন্য পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত করতে আরও ২৪ ঘণ্টা নির্ধারিত তাপমাত্রায় রাখা হয়।

তিনি বলেন, গ্রামের গৃহস্থের গোয়ালের গরু থেকে আমাদের সরবরাহকারীরা দুধ দোহন করে নিয়ে আসেন। তার ঘনত্ব পরীক্ষা শেষে বড় কড়াইতে ১০০ ডিগ্রিরও বেশি তাপমাত্রায় ফুটাতে হয়। সকাল ৮টা থেকে শুরু করে রাত ৮টা-৯টা পর্যন্ত জ্বাল দিয়ে তারপর ঘন দুধ নামিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তা ঠান্ডা করে তাতে পরিমাণ মতো চিনি দিয়ে আবারো উনুনে উঠিয়ে জ্বাল দেওয়া হয়। এরপর তা নামিয়ে হাড়িতে ঢেলে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা করার জন্য রাখা হয়। ঠান্ডা করার পর সেই হাড়িভর্তি দধি চুলার অল্প আঁচে রাখা হয় ৬-৭ ঘণ্টা। সেখান থেকে নামিয়ে আবারও ২৪ ঘণ্টার জন্য ঠাণ্ডা করতে রাখা হয়।

আরেক কারখানা মালিক শ্যামল চন্দ্র ঘোষ বলেন, দধিতে স্বাদ আনতে এত দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আমাদের কারখানার বয়সও ৭০-৭৫ বছর হবে। বাবাকে দেখেছি স্বাদ ও সুখ্যাতি ধরে রাখতে খাঁটি দুধ কিনতে কখনো কার্পণ্য করেননি। তিনি এখনো এই ব্যবসার প্রধান। তার নির্দেশনা অনুসারেই আমরা ব্যবসায় সফলতা পেয়েছি। সারাদিন দধি কিনতে দোকানে লোকজন ভিড় করে থাকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অর্ডার আসে।

পুরাতন ব্যবসায়ী ননী ঘোষ বলেন, গৌরনদীর দধির স্বাদ আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। তারপরও যা আছে তা দেশের অন্য কোনো দধির নেই। স্বাদ কমার কারণ হচ্ছে আগে দেশি গরুর দুধ পাওয়া যেত। এখন সব খামারের গরুর দুধ। দেশি গরুর প্রধান খাবার হচ্ছে ঘাস। কিন্তু খামারে কৃত্রিম খাবার খাওয়ানো হয়।

কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা :

গৌরনদী উপজেলায় বেশ কয়েকটি স্থানে দধি উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ননী ঘোষের গৌরনদী ঘোষ মিষ্টান্ন ভান্ডার আর সচীন ঘোষের গৌরনিতাই মিষ্টান্ন ভান্ডার সবচেয়ে বড় আর নামকরা। এই কারখানায় দধির পাশাপাশি শুকনা মিষ্টি, রসগোল্লা, রস মালাই, ক্ষীরপুরি, রসমঞ্জুরী, চমচম, কালোজাম, সন্দেশ ও বালুশাহ্সহ ১৪ প্রকারের মিষ্টিজাত খাদ্যপণ্য তৈরি হয়। গ্রাম থেকে দুধ সংগ্রহকারী, কারখানার সহযোগী, কারিগর, বিপনন মিলিয়ে দুটি কারখানায় দুই শতাধিক জনবল কাজ করেন।

খোকন হাওলাদার নামে এক কর্মী বলেন, আমি গ্রামে গ্রামে হেঁটে দুধ সংগ্রহ করে কারখানায় দেই। এই কাজ করে আমার সংসার চলে। কারখানা না থাকলে আমার বেকার থাকতে হতো।

আরেক কর্মী রাজ্জাক হাওলাদার বলেন, দধির কারখানা চালু থাকায় বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাজের ব্যবস্থা হয়েছে। দধি উৎপাদন কারখানা কেন্দ্রিক কাজে অন্তত এলাকার মানুষ ভালো আছি। কাজের জন্য আমাদের দূর-দূরান্তে যেতে হয় না। অল্প হলেও কর্মসংস্থানের যে ব্যবস্থা হয়েছে তা সবার জন্য ভালো।

মিন্টু হাওলাদার নামে এক কর্মী বলেন বলেন, গৌরনদীর উন্নতির পেছনে দধির ব্যবসার বড় অবদান। এই অঞ্চলকে মানুষ এখন দধির জন্য গুরুত্ব দেয়।

জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দাবি ::

স্থানীয় একটি কলেজের শিক্ষক রাশিদা খানম বলেন, গৌরনদীর দধি, মিষ্টি, স্বাদে অসাধারণ। যুগ যুগ ধরে খাচ্ছি। কিন্তু এর স্বাদের কমতি হয়নি। বাবা-দাদার হাত ধরে যখন মিষ্টি খেতে আসতাম তখন যে স্বাদ ছিল এখনো দধি মুখে দিলে সেই আদি স্বাদ সুন্দর অনুভূতি দেয়। গৌরনদীর দধি দেশ ও দেশের বাইরে তার স্বনামে বিখ্যাত। এই দধিটির জিআই স্বীকৃতির দাবি জানাচ্ছি।

স্থানীয় বাসিন্দা জিএম জসীম হাসান বলেন, ১৫০ টাকা কেজি দরে দধি পাওয়াটা কিন্তু অনেক সাশ্রয়ী। এই দধি আমাদের উপজেলা, এই জনপদকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যাচ্ছে। সরকারের কাছে আবেদন গৌরনদীর দধিকে জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা করে যেন গৌরনদীর ঐতিহ্যবাহী এই ব্যবসাকে সম্মানিত করা হয়।




ভূতুড়ে কৃষি ঋণের ফাঁদে পটুয়াখালীর মৃতরা

পটুয়াখালী প্রতিনিধি :: বাউফলে স্বাধীনতার আগে মারা যাওয়া পাঁচজনসহ মোট ছয়জন মৃত ব্যক্তিকে ঋণ দিয়েছে ব্যাংক। মৃত ব্যক্তিদের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ২০১৪-১৫ সালে ব্যাংক থেকে বিভিন্ন অঙ্কের ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে আবার কারও কারও নামে রয়েছে একাধিক ঋণ।

পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলায় বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের কেশবপুর শাখায় এমন ঘটনা ঘটেছে।

ঋণ গ্রহীতা ব্যক্তিদের সবার বাড়ি উপজেলার সূর্য্যমনি ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনেরা কৃষি ব্যাংকের কেশবপুর শাখায় যোগাযোগ করলে কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করছেন বলে জানা গেছে।

ব্যাংক ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৪ সালের ১১ডিসেম্বর কৃষি ব্যাংকের কেশবপুর শাখার কার্যক্রম শুরু হয়।
ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাউফলের সূর্য্যমনি ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের কেতাব উদ্দিন হাওলাদারের ৩ ছেলে জবেদ আলী, হজরত আলী ও রহম আলী ২০১৪ সালে ওই শাখা থেকে কৃষি ঋণ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে জবেদ আলীর নামে ২৫ ও ৩০ হাজার টাকার দুটি, হজরত আলীর নামে ৪৫ হাজার ও রহম আলীর নামে ৫০ হাজার টাকার ঋণ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু জবেদ আলী ১৯৬০, হজরত আলী ১৯৬৫ ও রহম আলী ১৯৬৬ সালে মারা যান।

জবেদ আলীর ছেলের ঘরের নাতনি মোমেলা বেগম বলেন, তিনি তার দাদাকে দেখেননি। ২০১৪ সালে দাদার নামে ঋণ নেওয়া হয়েছে তাও তারা জানেন না।

হজরত আলী হাওলাদারের ছেলের ঘরের নাতি মো. ফকরুল ইসলাম (৫৭) বলেন, আমার ৩ দাদার নামে লোন। আমি জন্মের পরে তাদের দেখি নাই। ২০২০ সালে ব্যাংক থেকে নোটিশ আসার পরে আমরা লোন সম্পর্কে অবহিত হই। এরপর বারবার কৃষি ব্যাংকে যোগাযোগ করে প্রতিকার চাইলেও ম্যানেজাররা কোনো প্রতিকার করে নাই।

কালিকাপুর গ্রামের আহম্মদ আলী হাওলাদারের ছেলে মো. জয়নাল হাওলাদার মারা যান ১৯৬৯ সালে। তার নামে ২০১৪ সালে ৪০ হাজার টাকার কৃষি ঋণ তোলা হয়েছে।

জয়নালের ছেলে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য মো. আবুল বাশার (৬৪) বলেন, তার বাবার মৃত্যুর সময় ব্যাংকের শাখাই ছিল না। ঋণ পরিশোধের নোটিশ পেয়ে জানতে পারেন, বাবার নামে ২০১৪ সালে ঋণ তোলা হয়েছে।

অপর ঋণ গ্রহীতা জয়নাল আবেদীন হাওলাদারের ছেলে আসাল উদ্দিন হাওলাদার (৮০) বলেন, আমার বাবা মারা গেছেন ৭০/৮০ বছর আগে আমার বয়সও ৮০ বছর। সেই বাবার নামে একটা লোন, এই লোন তো আমরা নিই নাই, লোন সম্পর্কে কিছু জানি না। একি আজব ঘটনা।

আরো পড়ুন : বাউফলে চুরির অভিযোগে ২ যুবক গ্রেফতার

কালিকাপুর গ্রামের মো. বাবুল মৃধা (৪৪) ঢাকায় থাকেন। তিনি কোনো দিন কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নেননি। তার নামে কেশবপুর শাখা থেকে ২০১৪ সালে ১৭ হাজার ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে। তার ছোট ভাই ফারুক হোসেন মৃধার (৪২) নামে ৭৫ ও ১৭ হাজার টাকার দুটি ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে।

আবদুল করিম মৃধা নামের এক ব্যক্তির নামে ৩৫ হাজার টাকার ঋণ উত্তোলন দেখানো হয়েছে। গ্রাম কালিকাপুর উল্লেখ করা হলেও তার বাবার নাম উল্লেখ করা হয়েছে রুস্তম আলী মৃধা। অথচ এ নামের কাউকে কালিকাপুর গ্রামে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

অপরদিকে একই এলাকার মৃত আব্দুল ছত্তার মৃধার ছেলে বাবুল মৃধার নামে রয়েছে ১৭ হাজার টাকার ঋণ। বাবুল মৃধার স্ত্রী হামিদা বেগম জানান, তার স্বামী কৃষি ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ গ্রহণ করেননি। তবে ঋণের জন্য আবেদন করেছিলেন। তারপর একদিন ঋণ পাশ হয়েছে জেনে ব্যাংকে গেলে ব্যাংক থেকে জানানো হয় আজকে টাকা পাবেন না। এরপর আর কখনো কৃষি ব্যাংকে যাননি এবং কোনো টাকা নেননি।

২০১৪ সালে কেশবপুর শাখার মাঠ কর্মকর্তা ছিলেন মো. শফিউর রহমান। পাঁচ বছর আগে তিনি অবসরে চলে গেছেন। তাঁর দাবি, তিনি কোনো মৃত ব্যক্তি কিংবা নামে-বেনামে কারও ঠিকানা ব্যবহার করে ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করেননি।

এ প্রসঙ্গে উপজেলার সূর্য্যমনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন বাচ্চু বলেন, যাদের নামে লোন নেওয়া হয়েছে বলে জেনেছি তারা ৫০/৬০/৭০ বছর আগে মারা গেছেন। একটা চক্র এই কাজ করছে জানিয়ে লোন নেওয়ার ঘটনাকে তিনি মিথ্যা, বানোয়াট ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে মনে করেন।

কৃষি ব্যাংকের কেশবপুর শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক হুসাইন মো. তাইফ আলম জানান, গত সপ্তাহে (মঙ্গলবার) ৪/৫ জন লোক এসে তাকে বিষয়টি জানান। তারা ২০২০ সালে ঋণ পরিশোধের নোটিশ পেয়েছেন। এরপর খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ঋণগুলো ২০১৪-১৫ সালে অনুমোদন করা হয়েছে। এরপর তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা বিষয়টি খুবই গুরুত্ব সহকারে দেখছেন এবং বিষয়টি এখন তদন্তাধীন রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি ব্যাংকের বিভাগীয় মহা ব্যবস্থাপক গোলাম মাহবুব বলেন, মৃত ব্যক্তির নামে লোন মঞ্জুর হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি, তদন্ত রিপোর্ট পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।




রিমালে ঈদ আনন্দ ভেসে গেছে উপকূলবাসীর

বরিশাল  অফিস :: ‘ঘর-দুয়ার উডামু, না কুরমানি দিমু? ঘরডা পইররা গ্যালহে, ধারদেনা আইন্না কোনো রহম খানচাইরে খুডি দিয়া খারা হরছি, ব্যারাহ্যা দেতে পারি নাই। ঘরে চাউল দুগ্গা আছে, ক্ষ্যাতে আবার আডি লাগাইছি চারা কেবল ওটছে। ক্ষ্যাতে এহন কিছু নাই যে বেইচ্যা বাজার করমু। কৃষিবাদা যা দেলহাম সব বইন্যায় ঢইল্লা লইয়া গ্যাছে। আয় ইনকাম বন্ধ, কুরমানি দিমু ক্যামনে? ঈদের দিন একটা ব্রলার মুরহা আইন্না বউ-গুড়াগাড়া লইয়া খামু’। প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমালে ক্ষতিগ্রস্ত বরগুনা উপকূলবাসীর ঈদের খোঁজখবর নেওয়ার সময় কথাগুলো কালবেলাকে বলেন সদর উপজেলার ৪নং কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়নের ডৌয়াতলা এলাকার কৃষক আক্কাস মৃধা।

গত ২৬ মে বরগুনাসহ দেশের দক্ষিণ উপকূলীয় জেলাগুলোতে আঘাত হানে প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমাল। বরগুনা উপকূলে ২৬ মে থেকে ২৭ মে পর্যন্ত প্রায় ১৫ ঘণ্টা যাবত বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস সঙ্গে সাগর ও নদীতে পানি বৃদ্ধি করাসহ উত্তাল ঢেউ উপকূলে আছড়ে দিয়ে শক্তির দাপট দেখিয়ে গেছে রিমাল। ঘরবাড়ি, ক্ষেতের ফসল হারিয়ে একপ্রকার অসহায় জীবনযাপন করছেন এ জেলার অধিকাংশ মানুষ।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে জেলার আনুমানিক ৩ হাজার ৩৭৪টি ঘর সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হওয়াসহ ১৩ হাজার ৩৪টি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বরগুনার ৬টি উপজেলার প্রায় তিন শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ১২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের বেশি ক্ষতি হয়েছে। বরগুনা সদর উপজেলার আয়লা পাতাকাটা ইউনিয়নের রামরা ও আয়লা গ্রামের দুই পয়েন্টের বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়াও জেলাজুড়ে বড় বড় গাছ উপড়ে পড়ে সড়কে যানবাহন চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টিসহ বেশ কয়েকদিন জেলার বেশিরভাগ গ্রামেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।

জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঘুরে দেখা গেছে, ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে সরকারি সহায়তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্তরা পুনর্বাসিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। মাঠে মাঠে আবার বুনতে শুরু করেছে বিভিন্ন ফসলের বীজ। গামছায় চোখের জল মুছে শক্ত করে কোমর বেঁধে রঙিন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন প্রায় প্রতিবছর বন্যাকবলিত জেলা বরগুনার মানুষ। এরই মধ্যে বাঁধভাঙা খুশির জোয়ার নিয়ে এসেছে মুসলমানদের কোরবানির ঈদ।

দেশের অন্য জেলাগুলোতে যখন কোরবানির জন্য পশু ক্রয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে ঈদের আমেজ ছড়াচ্ছে। তখন বরগুনা জেলার বেশিরভাগ ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ছল ছল চোখে দেখে শুকনো মুখে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। অনেক পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ক্ষেতের ফসল রিমাল নষ্ট করে দিয়ে যেন তাদের ঈদের আনন্দটুকুও ধমকা হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে গেছে। আগের বছরের মতো আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত দিয়ে ছেলে-মেয়ে, ভাইবোন সবাই একসঙ্গে বসে গরু কিংবা ছাগলের মাংস খাওয়া হবে না তাদের, ব্রয়লার মুরগিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।

জেলার বামনা উপজেলার চলা ভাঙ্গা এলাকার জামাল কালবেলাকে বলেন, ‘কুরবানীর জন্য কোথায় ভাগ হবো? গরু কবে কিনবো? ঘরে গেলেই ছেলে মেয়েরা জানতে চায়। ঘূর্ণিঝড়ে এমন অবস্থা হইছে এবার কোরবানি দেওয়ার মতো কোনো কায়দা নাই’।

পাথরঘাটার পদ্মা এলাকার জেলে নাসির বলেন, ‘মহাজনের ট্রলারে থাহি। টাহাটোহা লাগলে মাঝে মধ্যে আনতাম। এহন মহাজনেই বিপদে আছে। বইন্নার সময় ঢ্যাফায় পিডাইয়া ট্রলারডারে অ্যাক্কালে নাজুক বানাইয়া হালাইছে। হুনছি এনজিওর লোন উডাইছে, হ্যারপর ধারদেনা আইন্না ট্রলারডার কাম হরায়, কুরবানীও দেবে না আবার। হ্যার দারেও বা কি কমু। ওই আল্লায় যা হরে’।

সদর উপজেলার মোল্লারহোড়া এলাকার প্রবাসীর স্ত্রী পারুল বেগম  বলেন, ‘বইন্নায় ঘরডা হালাইয়া দেলহে। এফির যে টাহা পাডাইছে হ্যাইদ্দা গাছ-খুডি কিন্না ঘরের কাাম ধরছি। কোরবানী দেওয়ার মতো টাহা হাতে নাই। কী কমু শরমের কথা নতুন বেয়াইবাড়ি দাওয়াত দিতে পারি নাই’।

সদরের ফুলঝুরি বাজারের লঞ্চঘাট এলাকার ফিরোজা বেগমের ঘূর্ণিঝড় রিমালে তাণ্ডবে ভাঙা ঘর এখনো সারতে পারেননি। ভাঙা ঘরেই ছেলেমেয়েকে নিয়ে বসবাস করছেন এখনও। ঘরের পাশে গালে হাত দিয়ে চিন্তিত মনে  বলেন, টাকার অভাবে ভাঙা ঘর এখনো সারাতে পারিনি, কোরবানি দেওবার কথা তো চিন্তাই করতে পারি না। কোরবানি দিনে ছেলে মেয়েদের সামনে যে একটা ব্রয়লার মুরগি কিনে সামনে দেব তার কোনো ব্যবস্থা নাই।

এ ছাড়াও জেলার অন্য উপজেলাগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বেশিরভাগ মানুষ পুনর্বাসিত হতে গিয়ে ঈদের আনন্দ মলিন হয়ে গেছে তাদের।




১৬ বছরের উন্নয়নে বদলে গেছে দ্বীপজেলা ভোলা

বরিশাল অফিস :: বঙ্গোপসাগর মোহনায় মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত দেশের একমাত্র সর্ববৃহৎ দ্বীপজেলা ভোলা গত ১৬ বছরের উন্নয়নে বদলে গেছে। এক সময়ে খ্যাতি ছিল ধান সুপারি আর ইলিশের ভাণ্ডার হিসেবে। কিন্তু ধান সুপারি আর ইলিশ এই তিনের মধ্যে এখন আর এই জেলার সীমাবদ্ধতা নেই। প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদে ভরপুর দেশের সর্বদক্ষিণের এই জেলা এখন বাংলাদেশের একটি অপার সম্ভাবনাময় জেলায় পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা চার মেয়াদে নতুন নতুন প্রকল্প আর উন্নয়নের জোয়ারে একদিকে যেমন এখানকার দৃশ্যপট বদলে গেছে, অন্যদিকে সৃষ্টি হচ্ছে বেকার যুবকদের কর্মস্থান।

সেই উন্নয়নের ছোঁয়া শুধু শহরই নয়, পৌঁছে গেছে প্রত্যন্ত গ্রাম গঞ্জেও। এমনকি এক সময়ের কাল্পনিক স্বপ্নও বাস্তবে রূপ নিয়েছে। জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দুর্গম চরাঞ্চলেও পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ সুবিধা। সাবমেরিন ক্যাবল এর মাধ্যমে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে এই বিদ্যুৎ। এখন দিনের আলো শেষে রাতের আঁধারে বিদ্যুতের আলোতে আলোকিত হয়ে উঠে মানুষের ঘরবাড়ি। এতে করে ঘুচে গেছে শহর-গ্রামের পার্থক্য। যা ছিল এখানকার মানুষের জন্য এক অকল্পনীয় অধ্যায়।

এছাড়া জেলার সর্বদক্ষিণের সাগর মোহনার দ্বীপ চর কুকরি-মুকরি ও মনপুরার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে সরকারী নানা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইতিমধ্যে সেখানে গড়ে উঠেছে পর্যটন কেন্দ্র। যা ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের কাছে নয়নাভিরাম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি নদী গর্ভে ঘরবাড়ি বিলীন হওয়ার আতঙ্ক আর নেই। মেঘনা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গন থেকে রক্ষা পেয়েছে ভোলার ভাঙ্গন কবলিত এলাকাবাসী। এছাড়া দ্বীপের ২০ লক্ষাধিক মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ভোলা-বরিশাল সেতু এখন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই সেতু নির্মাণ হলে শুধু ভোলাবাসীই নয় দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের অর্থনীতিতে বিশাল এক বিপ্লব ঘটবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ভোলায় একের পর এক জ্বালানি গ্যাস কূপের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। ভোলার ইলিশা-১ নামে নতুন একটি কূপ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু করেছে বাপেক্স। এ নিয়ে জেলার মোট ৯টি কূপে গ্যাসের সন্ধান পেল বাপেক্স। ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি সরেজমিন ভোলার সর্বত্র পরিদর্শন করে এই চিত্র দেখেছেন।

১৯৮৪ সালে মহাকুমা থেকে ভোলা জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে রয়েছে ৭টি উপজেলা, ৫টি পৌরসভা, ৭০টি ইউনিয়ন, ১০টি থানা। ৩ হাজার ৪০৩.৪৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে নদী ভাঙ্গন। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলেও সুপরিকল্পিত কার্যকরী কোন পদক্ষেপ বা কাজ বাস্তবায়ন হয়নি। যা বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের টানা চার মেয়াদে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং অনেক প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক সহযোগিতায় তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদের প্রচেষ্টায় সরকারের একের পর এক উন্নয়নে ভোলা বাংলাদেশের মধ্যে একটি শ্রেষ্ঠ জেলায় রূপান্তরিত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এতে করে পাল্টে যাচ্ছে চিরচেনা দ্বীপ জেলা ভোলার সেই পুরনো চিত্র। দেড় যুগ আগের পিছিয়ে থাকা ভোলা শহর এখন পরিণত হয়েছে আধুনিক পরিকল্পিত নগরীতে। ভোলা জেলা শহর ছাড়াও উন্নয়নের ছোঁয়া গেছে সব উপজেলাতেও। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে আমূল পরিবর্তনের ফলে সুফল পাচ্ছে এলাকার জনগণ। দ্বীপজেলা ভোলায় ইতোপূর্বে নদী ভাঙ্গন রোধে কার্যকরী তেমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। তাই নদী ভাঙ্গনে বহু এলাকা বিলীন হয়ে যায়। ভোলা সদরের ইলিশা জংশন এলাকায় যখন রাক্ষুসে মেঘনার ভয়াবহ ভাঙ্গনে যখন হাজার হাজার বসত ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা, বাজার বিলীন হওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল ঠিক তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় প্রায় ৪ কিলোমিটার এলাকা সিসি ব্লক স্থাপনের মাধ্যমে ইলিশা বাজারসহ বহু সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা রক্ষা পায়। ভোলায় অসংখ্য রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, জেলা শহরে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, পৌরভবনসহ সরকারী অসংখ্য বহুতল ভবন, ভোলা খেয়াঘাটে আধুনিক টার্মিনাল, নদী বন্দর স্থাপনসহ ব্যাপক উন্নয়নে গত ১৬ বছরে পাল্টে গেছে ভোলার চিত্র।

ভোলার চরফ্যাসনের বাসিন্দা রাহাত হোসেন (৬২) জানান, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় চরফ্যাসন আধুনিক ও পর্যটন উপজেলায় রূপান্তরিত হয়েছে। চর কুকরি মুকরিতে আধুনিক রেস্ট হাউস নির্মাণ করা হয়েছে। চর কুকরিতে বঙ্গবন্ধু ইকোপার্ক নির্মাণ করা হচ্ছে। তাছাড়াও চরফ্যাসন মনপুরায় প্রায় হাজার কিলোমিটার পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। চরফ্যাসন ও মনপুরাবাসীকে রক্ষা করার জন্য হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ব্লকবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। চরফ্যাসনে শতভাগ ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এমনকি চরফ্যাসনের বিচ্ছিন্ন দ্বীপচর ইউনিয়ন মুজিবনগর ও কুকরি মুকরিতে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চরফ্যাসনে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে।

এদিকে লালমোহন ও তজুমদ্দিন উপজেলায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হয়েছে। লালমোহন ও তজুমদ্দিনে মেঘনার ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষায় প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সিসি ব্লক স্থাপন করা হয়েছে। অসংখ্য রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স, থানা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। লালমোহন ও তজুমদ্দিনে ঘুরলে বর্তমান সরকারের অসংখ্য জনবান্ধবমুখী উন্নয়ন পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে। গ্যাসভিত্তিক ভোলায় বিভিন্ন শিল্পকলকারখানা স্থাপন শুরু হয়।দ্বীপবাসীকে ঝড় জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষার জন্য ভোলা জেলার ৭ উপজেলায় ৫২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৭টি সাইক্লোন সেল্টার নির্মাণ করা হচ্ছে। ভোলার প্রাকৃতিক সম্পদককে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা।

পর্যটকদের হাতছানি দিচ্ছে চরফ্যাশন: ভোলার চরফ্যাসনের কুকরি মুকরির ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল যেন এক মিনি সুন্দরবনে পরিণত হয়েছে। সেখানে এক সঙ্গে সাগরের ঢেউ, সূর্যদয়, বিশাল সমুদ্রের জলরাশি আর সমুদ্য সৈকত, লাল কাঁকড়া, বনের হরিণ, নানা পশু পাখির সমারোহ ভ্রমণপিপাসুদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। জেলাটির বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে ছোট-বড় চর। এরমধ্যে আয়তনে বড় এবং একইসঙ্গে ঘুরে দেখার মতো উপজেলাটির নাম চরফ্যাশন। বলা হয়ে থাকে, সবুজ শ্যামলিমায় ভোলা জেলাকে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখতে হলে আসতে হবে চরফ্যাশনে। অর্থাৎ চরফ্যাশনে অবস্থিত সু-উচ্চ ১৮ তলা জ্যাকব টাওয়ারে উঠলেই দেখা মিলবে পুরো জেলা। ১০০ টাকার টিকেট কেটে লিফটের সাহায্যে উপরে উঠে সর্বোচ্চ স্থান থেকে চারদিকে তাকানোর সুন্দর সুযোগ রয়েছে। ওখান থেকে যেদিকেই চোখ পড়ে দেখা মিলবে সবুজের সমারোহ। যেন, প্রকৃতির অপূর্ব লীলাভূমি হাতছানি দিয়ে ডাকে।

টাওয়ারের একেবারে পাশে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন মসজিদ এবং শহীদ শেখ রাসেল শিশু পার্ক। প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের এখানে ভীড় করতে দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চরফ্যাশনে পর্যটকদের কথা চিন্তা করে তৈরি হয়েছে হোটেল ও রিসোর্ট। বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

ঢাকা থেকে চরফ্যাশনে আসা একজন ভ্রমন পিপাষু মানুষের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা হয়। লোকটির নাম নাজমুল করিম পেশায় ব্যাংকার। তিনি জানান, একটি চওড়া এবং সোজা সড়ককে ঘীরে ভোলা জেলা। ভোলা সদর থেকে চরফ্যাশন যেতে ভিন্ন পথের প্রয়োজন পড়ে না। তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা জেলার নাম ভোলা।

এদিকে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বেশকিছু চর। আর এসব চর ঘিরেই পর্যটনশিল্প অপার সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছে ভোলাবাসী। এই যেমন চর কুকরি-মুকরি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে চমকপ্রদ ও আকর্ষণীয়। ইতোমধ্যে এখানকার জীববৈচিত্র্য ও দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের নজর কাড়তে শুরু করেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, চর কুকরি-মুকরিতে রোপণ করা হয়েছে নানা ধরনের গাছ।

এরমধ্যে কেওরা গাছ বৃহত্তর এলাকা জুড়ে দাপটের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আর কৃত্রিম এই বনে ছাড়া হয়েছে বন্য মহিষ, হরিণ ও বানর। আছে গরুও। চর স্বল্প পরিমাণে বসতিও আছে। যাদের প্রায় সবাই মৎস্যজীবী।

এলাকাটির বিভিন্ন পর্যায়ের লোকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এটি এক পাশে মেঘনা অন্যপাশে বঙ্গোপসাগরের জলরাশি। লবণাক্ত এবং মিঠাপানির জলের মিশ্রণ চর কুকরি-মুকরিতে জোয়ার ভাটার খেলা করে। ওখানের ওয়াচ টাওয়ারে তাকালে পুরো বনটি দেখতে সৌন্দর্য অবলোকন করা হয় সহজেই। চরফ্যাশন সদর থেকে থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্ব এই চর। স্বল্প খরচে একা বা যৌথভাবে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে স্পিডবোর্ডে গেলে খরচ বাড়লেও দ্রুত পৌঁছে যাওয়া যায়। মাঝেমধ্যে সমুদ্র গর্জন তুললেও বেশিরভাগ সময় জুড়ে থাকে খুব নিবীর এবং নিরাপদ।

চরফ্যাশনে ব্যক্তিগতভাবে গড়ে ওঠা আরেকটি দর্শনীয় এবং বিনোদন কেন্দ্রের নাম খামারবাড়ি রিসোর্ট। আগে থেকে যোগাযোগ করে সেখানে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বৃহদায়তন এই রিসোর্টে আছে খাওয়া, থাকা এবং ঘুরে বেড়ানোর সু-ব্যবস্থা।

একই উপজেলায় আকর্ষণীয় স্থান হলো ঢাল চরের তারুয়া সমুদ্রসৈকত। এখানে পর্যটকদের চোখে ধরা দেয় লাল কাঁকড়াসহ নানা প্রজাতির অতিথি পাখি। বেতুয়া প্রশান্তি পার্কও দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মেঘনা নদীর পাড়ে গড়া ওঠা এ পার্কে পর্যটকদের আনাগোনা সব সময় লেগেই থাকে।

চরফ্যাশনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ সালেক মূহিদ জানান, মানুষ একসময় উন্নয়নে পিছিয়ে থাকলেও এখন উন্নয়নের হাওয়া লেগেছে কমবেশি সবখানে। মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে পরিবর্তন। ব্যবসা-বাণিজ্য হচ্ছে গতিশীল। শিক্ষার আলো, বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। রাস্তাঘাটের চেহারায়ও লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। চরফ্যাশনের মতো একটি সম্ভাবনাময় উপজেলা পর্যটন খাতকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাবে, এটাই প্রত্যাশা।

চরফ্যাশন এলাকার অটোরিকশা চালক রিপন জানান, এখানে রাত বিরাতে নির্ভরে মানুষ চলাচল করে। অতীতে কিছু জটিলতা ছিলো এখান একেবারেই শান্ত ও শৃঙ্খল।