অরাজনৈতিকীকরণের পথে শিক্ষা ব্যবস্থা: অন্তর্বর্তী সরকারের নজরকাড়া সিদ্ধান্ত

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত ১০ মাসে দেশের মোট ২২৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সরকারের আমলে এত স্বল্প সময়ে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম বদলের ঘটনা ঘটল। এসব পরিবর্তনে বাদ পড়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা, তাঁদের পরিবার ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতাদের নাম।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, সর্বশেষ গত ৪ জুন ২৪টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।
নামকরণে পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গি
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণে এখন থেকে ব্যক্তিনির্ভরতার পরিবর্তে স্থানীয়তা ও গণগ্রাহ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পূর্ববর্তী সরকার যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম রাজনৈতিক বা পারিবারিক ভিত্তিতে নির্ধারণ করেছিল, সেগুলোর নাম সংশ্লিষ্ট জেলা, উপজেলা বা এলাকা অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে।
নাম পরিবর্তনের কিছু উদাহরণ
২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছয়টি সরকারি মেডিকেল কলেজের নাম পরিবর্তন করা হয়। এর মধ্যে মানিকগঞ্জের কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজের নতুন নাম রাখা হয়েছে ‘মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ’ এবং ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ’।
২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দেশের ১৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বদল করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নতুন নাম সংশ্লিষ্ট জেলার নামে নির্ধারিত হয়। যেমন, নেত্রকোনার ‘শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়’ এখন ‘নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং কিশোরগঞ্জের ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়’ এখন পরিচিত ‘কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে।
১৫ এপ্রিল অধ্যাদেশ জারি করে আরও তিনটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করা হয়। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নতুন নাম হয় ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’। খুলনার শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হয় ‘খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং সিলেটের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’।
২৯ মে প্রকাশিত আরেক প্রজ্ঞাপনে ৩৭ জেলার ৬৮টি সরকারি কলেজের নাম পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ ডিগ্রি কলেজের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এলাকায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করলে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জানান, ওই কলেজের নাম পরিবর্তন করা হবে না।
কারিগরি ও প্রাথমিক শিক্ষাতেও পরিবর্তন
১৩ এপ্রিল কারিগরি শিক্ষাক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। এদিন ১৫টি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে শেখ হাসিনা ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের নাম বাদ দেওয়া হয়। ২৪ এপ্রিল আরও ২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করা হয়, যার মধ্যে ছিল ১৬টি স্কুল, ৩টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ২টি কলেজ।
প্রাথমিক স্তরেও ব্যাপক নাম পরিবর্তন হয়েছে। গত ১০ মাসে পাঁচ দফায় মোট ৭৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম বদলানো হয়েছে। সর্বশেষ ১৮ মে ১১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
সরকারের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষকদের মত
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “জাতীয় প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনার নামকরণ কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের নামে হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে। আমরা সেই নীতিতেই কাজ করছি।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, এটি একটি ‘অরাজনৈতিকীকরণ প্রক্রিয়া’, যার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, কেউ কেউ এটিকে কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখছেন। তাঁদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিজেদের নিরপেক্ষতা এবং অরাজনৈতিক রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার তুলে ধরতে চাইছে।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সাল থেকে টানা তিন মেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকার তাদের শাসনামলে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের নামকরণে রাজনৈতিক ও পারিবারিক প্রতীক ব্যবহার করেছিল। শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নামে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেতু, রাস্তাঘাট, মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র, এমনকি প্রকল্প ও ভবনের নামকরণ করা হয়। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার সেই ধারা থেকে সরে এসে একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।











