দেশে প্রতিদিনই কমছে গ্যাসের উৎপাদন, যার ফলে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে সংকটের শঙ্কা। জানুয়ারি মাসে গ্যাস উৎপাদন কমেছে ১৯ মিলিয়ন ঘনফুট। ১ জানুয়ারি যেখানে মোট উৎপাদন ছিল ১৯২৯ মিলিয়ন ঘনফুট, ৩০ জানুয়ারিতে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯১১ মিলিয়নে। অথচ ২০২০ সালের ১ জানুয়ারিতে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি ৭০৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করলেও ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারিতে এটি নেমে এসেছে ৪৯৯ মিলিয়নে। একই সময়ে বহুজাতিক কোম্পানির অধীনে থাকা ৪টি গ্যাস ফিল্ড থেকে সরবরাহ পাওয়া যেত ১৬৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট, যা ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারিতে কমে দাঁড়িয়েছে ১১৬১ মিলিয়নে।
উৎপাদন হ্রাসের এই প্রবণতা বিদ্যমান থাকলে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হতে পারে। দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, যা ২০২৬ সালের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে বিবিয়ানার দৈনিক উৎপাদন ৯৭২ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও এই মজুদ শেষ হলে দেশীয় উৎসের গ্যাসের পরিমাণ এক লাফে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যাবে।
বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে, গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ফারাক ক্রমশ বাড়ছে। পেট্রোবাংলার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বিবিয়ানার অবশিষ্ট মজুদ দেখানো হয় ১৩৪ বিসিএফ। এরপর বলা হয়েছিল, বিবিয়ানার মজুদ আরও ১ টিসিএফ বাড়তে পারে। কিন্তু ১৯ মাস কেটে গেলেও মজুদ বেড়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো স্বচ্ছ তথ্য পাওয়া যায়নি।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সংস্কারের মাধ্যমে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে রশিদপুর-৭ এবং কৈলাশটিলা-৭ কূপগুলো সংস্কারের মাধ্যমে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। রশিদপুর-৭ কূপের মধ্যম স্তরে বিপুল গ্যাসের মজুদ রয়েছে, যা উত্তোলন করা হলে দৈনিক ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে। একইভাবে কৈলাশটিলা-৭ কূপের ওপরের স্তর থেকে গ্যাস উত্তোলনের জন্য ওয়ার্কওভার প্রয়োজন।
২০১১ সালে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্লামবার্জার পরিচালিত এক সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সংস্কারের মাধ্যমে দৈনিক ৪০০-৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব, যার জন্য সর্বোচ্চ ১২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হতে পারে। কিন্তু এক যুগ পেরিয়ে গেলেও সে অনুযায়ী কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের অদূরদর্শী নীতির কারণেই গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান সরকার ছাড়া আর কোনো সরকারই এই খাতে কার্যকর ভূমিকা নেয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মকবুল ই এলাহী চৌধুরী। তিনি বলেন, গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা করা হয়েছে, যার ফলে দেশ আজ ভয়াবহ সংকটের মুখে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “গ্যাস উৎপাদন ধরে রাখতে হলে বছরে কমপক্ষে ১০টি নতুন অনুসন্ধান কূপ খনন করা জরুরি। এলএনজি আমদানি সীমিত রাখা উচিত, কারণ এর ব্যয় আমাদের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে।”
অন্যদিকে ক্যাবের সিনিয়র সহসভাপতি ড. এম শামসুল আলম বলেছেন, “বিবিয়ানার মজুদ সংকট নিয়ে বহুবার সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু তা আমলে নেওয়া হয়নি। এখন জরুরি ভিত্তিতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন ও অনুসন্ধান কূপ খনন ছাড়া বিকল্প নেই।”
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, সম্ভাবনাময় কূপ রশিদপুর-৭, কৈলাশটিলা-৭ এবং সিলেট-৯-এর কাজ শুরু হয়েছে। দীর্ঘসূত্রিতা এড়াতে ডিপিপি ছাড়াই কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে।
নতুন অনুসন্ধান কূপ খনন: ২০২৬ সালের আগেই অন্তত ১০টি নতুন অনুসন্ধান কূপ খনন করতে হবে।
পুরাতন কূপ সংস্কার: রশিদপুর-৭, কৈলাশটিলা-৭ ও অন্যান্য কূপ সংস্কার করে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে হবে।
গ্যাসের অপচয় বন্ধ: সিস্টেম লস কমিয়ে গ্যাস চুরি রোধ করা জরুরি। বর্তমানে প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চুরি হচ্ছে, যা দেশের জন্য বিশাল ক্ষতি।
এলএনজি আমদানির বিকল্প খোঁজা: বিদেশি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
গ্যাস সংকট মোকাবেলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম