বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজের অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থার শর্ত মেনে আর কোনো ঋণ নেওয়ার পক্ষপাতী নয় সরকার। মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বাজেট সহায়তার অর্থ সাধারণত পাঁচ বছরের মধ্যে ফেরত দিতে হয়, যেখানে প্রকল্প সহায়তার মেয়াদ তুলনামূলক দীর্ঘ। তাই ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে সরকার সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তার ভাষায়, ডলার বিনিময় হারের ওঠানামা ঋণের প্রকৃত পরিশোধযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। ৩ বিলিয়নের ঋণ ৫ বিলিয়নে পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে। সেই কারণেই বাংলাদেশের আর আগের মতো ঋণনির্ভর নীতিতে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, আইএমএফের কাছ থেকে গত নয় মাসে কোনো অর্থ পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, “আমরাই শক্ত পদক্ষেপ নেব। ওদের চাকরি আছে, কিন্তু আমাদের দেশের অর্থনীতি নিয়ে দায়িত্ব আমাদের। ইন্দোনেশিয়ার মতো উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে, যেখানে ঋণ দিতে না পারায় চাকরি গেছে অনেকের।”
আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা আর আগের মতো তাদের ওপর নির্ভরশীল না। বিশ্বব্যাংক কিছু প্রকল্প সহায়তা চালু রাখবে বলে জানিয়েছে, তবে আইএমএফের প্রতিটি শর্ত মানা হবে না। তাদের কিছু কর সংক্রান্ত প্রস্তাব বা এনবিআর আলাদা করার প্রস্তাবেও সরকার পুরোপুরি একমত নয়। ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট একেবারে ওপেন না করলেও ধাপে ধাপে সংস্কার চলছে।”
বর্তমান সরকারের আমলে আইএমএফ থেকে কোনো অর্থ গ্রহণ ছাড়াই বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও রিজার্ভ স্থিতিশীল রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। সালেহউদ্দিন বলেন, “আমরা প্রমাণ করেছি যে শর্ত ছাড়াই অর্থনৈতিক ভারসাম্য আনা সম্ভব। আইএমএফ বিষয়টি বুঝেছে এবং আমাদের সাথে আলোচনায় মনোযোগী হয়েছে।”
প্রকল্প সহায়তা নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এআইআইবি, এনডিবি ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বাজেট সহায়তা নিয়ে আলোচনা এখনো চলমান, তবে সেখানেও সরকারের নিজস্ব কৌশলকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শর্ত প্রসঙ্গে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, “আমরা স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে ১ বিলিয়ন ডলার চেয়েছি, তারা দিতে চায় ৫০০ মিলিয়ন। আমরা চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেব। সব কিছু মিলিয়ে বলতেই পারি, হতাশার কোনো কারণ নেই।”
তিনি বলেন, “আমাদের উদ্দেশ্য কেবল অর্থ সংগ্রহ নয়, বরং নেগোশিয়েশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা। এবারের সফরে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এআইআইবি, আইওএম, আইএফসি, ওপেক ফান্ডসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার সাথে সফল বৈঠক হয়েছে।”
বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ নিয়েও কথা বলেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এখন অনেক দেশ বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি নতুন পথে হাঁটছে।
সবশেষে অর্থের সংস্থান নিয়ে উপদেষ্টা জানান, ওপেক ফান্ডের সঙ্গে ১০০ মিলিয়ন ডলারের এবং আইএফসির সঙ্গে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে, যা দেশের বেসরকারি খাতে অর্থ প্রবাহ নিশ্চিত করবে।
মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম