পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অন্যতম বড় বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবিসি) এবার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মুনাফা সংকটে পড়েছে। ঢাকা মহানগরের কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণে কোম্পানিটির ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) মুনাফা প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে পাওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিএটিবিসি’র শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে মাত্র ১ টাকা ৮০ পয়সা। গত বছরের একই সময়ে এই অংক ছিল ৯ টাকা ৪৮ পয়সা। ১৯৭৭ সালে কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে এটি কোনো একক প্রান্তিকে সবচেয়ে কম মুনাফা।
মুনাফার এই ধস অর্ধবার্ষিক হিসাবেও স্পষ্ট। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৭ টাকা ৬৯ পয়সা, যেখানে গত বছরের প্রথমার্ধে তা ছিল ১৭ টাকা ১৪ পয়সা।
কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঢাকার মহাখালীর কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সামগ্রিকভাবে বাজারে বিক্রি কমে যাওয়াই মুনাফায় এই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
গত ১ জুলাই থেকে মহাখালীর ডিওএইচএস এলাকায় বিএটিবিসির তামাক কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে কোম্পানির রেজিস্টার্ড অফিস স্থানান্তর করে নেওয়া হয় আশুলিয়ার দেওড়া এলাকায়। এই কারখানায় বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড যেমন ডানহিল, কেন্ট, পলমল, বেনসন, রথম্যান্স, কুল প্রভৃতি তামাকজাত পণ্য প্রস্তুত করা হতো। কোম্পানিটি বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম তামাক উৎপাদনকারী হিসেবে পরিচিত।
এদিকে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) দাবি জানিয়েছিল, আবাসিক এলাকায় তামাক কারখানা পরিচালনা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। বিশেষ করে শিশুস্বাস্থ্যে এর ক্ষতিকর প্রভাব এবং ডিওএইচএস এলাকায় যানজট, শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ বাড়ানোর মতো প্রভাব তুলে ধরেছিল সংগঠনটি। দাবি ছিল, কীভাবে এই কারখানা পরিবেশ ছাড়পত্র পেয়েছে তা তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
পবা আরও অভিযোগ করে, তামাক কোম্পানিগুলোর প্রভাবে ২০২৩ সালে তামাক শিল্পকে ‘লাল শ্রেণি’ থেকে ‘কমলা শ্রেণিতে’ নামিয়ে আনা হয় এবং তামাক চাষে শুল্কও শূন্যে নামিয়ে আনা হয়, যা দেশের পরিবেশবিষয়ক নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবাসিক এলাকার ভেতরে থাকা তামাক কারখানা ধ্বংস করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে পাবলিক পার্ক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ব্যাংককের বেঞ্জাকিট্টি ফরেস্ট পার্ক, এথেন্স ও কুর্দিস্তানের প্রাক্তন তামাক কারখানা এখন রূপান্তরিত হয়েছে জনকল্যাণমূলক স্থানে। অথচ বাংলাদেশে এখনো শহরের প্রাণকেন্দ্রে এমন ক্ষতিকর শিল্প প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা দেশের জন্য উদ্বেগজনক।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ তামাকজনিত কারণে মারা যায়। প্রায় ১৫ লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত হন ফুসফুস ক্যানসার, স্ট্রোক, হৃদরোগ ও অ্যাজমার মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুখে। ঢাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া ৯২% শিশুর মুখের লালায় উচ্চমাত্রার নিকোটিন পাওয়া যাওয়ার মতো তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
তামাক উৎপাদন পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। প্রতি একর জমিতে তামাক শুকাতে লাগে প্রায় ৫ টন কাঠ, যা দেশের বনভূমির ৩০ শতাংশ ধ্বংসে ভূমিকা রাখছে। ২০২৪ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সিগারেটের অবশিষ্টাংশ থেকেই দেশে ৪,১৩৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা মোট ঘটনার ১৫.৫২%।
সব মিলিয়ে মুনাফার ধস, সামাজিক চাপ এবং পরিবেশগত উদ্বেগ—সব দিক থেকেই ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ এখন কঠিন চাপে রয়েছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের সামনে বড় নীতিগত ও বাজারিক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম