ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান তার নতুন বই ‘আয়নাঘরের সাক্ষী: গুম জীবনের আট বছর’-এ দাবি করেছেন, গুম হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে থেকেই তাকে বিভিন্ন সূত্র থেকে বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বলা হয়েছিল। বইয়ে তিনি লেখেন, শেখ পরিবার, একটি শীর্ষ বিএনপি নেতার সন্তান ও এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা জেনারেল—এই তিন সূত্র থেকে আলাদা আলাদা সতর্কবার্তা পেতেন তিনি। তবুও বাবা মীর কাশেম আলীর প্রতি শিষ্টাচার এবং পরিবারের পাশে থাকার সংকল্পে দেশেই থাকায় ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট তাকে তুলে নেওয়া হয় বলে বইতে বর্ণিত আছে। পরে দীর্ঘ আট বছর ‘আয়নাঘরে’ বন্দী থাকতে হয় তাকে; ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মুক্তি পান তিনি।
পাঠকের জন্য বইটির বর্ণনা থেকে সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো—
প্রাথমিক সতর্কবার্তা
বইতে ব্যারিস্টার আরমান জানান, তিনি ইংল্যান্ডে বার অ্যাট লের পড়াশোনা চলাকালীন সময়ে শেখ পরিবারের এক সদস্যের সঙ্গে বান্ধবসম্মত সম্পর্ক গড়ে উঠে। ওই সদস্য একদিন গোপনে ডেকে বলে যে—“তোমার নাম ওই কিছু লোকের মুখে শুনছি, দ্রুত দেশের বাইরে চলে যাও”। এটিই ছিল প্রথম সতর্কতা।
এর কয়েক দিনের মধ্যে বিএনপির এক শীর্ষ নেতার ছেলেও আরমানকে নিরাপদ জায়গায় ডেকে একই রকম সতর্ক করে বলেন—“তোমাকে নিয়ে সরকারখবর করছে, দ্রুত চলে যাও।” এরপরই তৃতীয় বার্তা হিসেবে এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা জেনারেল যোগাযোগ করে, এনএসআই প্রধানের এ কথার উল্লেখ করে—“তোমাকে ছেড়ে দেওয়া যাবে না”—এমন কথা শোনান এবং যত দ্রুত সম্ভব দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
বাবার প্রতি আনুগত্যেই দেশের থাকাই চয়েস
তিন পক্ষের বার্তা পেয়ে নিজ আত্মপর্যালোচনার পর আরমান লিখেন, তিনি প্রথমে ভেবে দেখেন—নিজেকে বাঁচালে কি তিনি বাবাকে বিপদের মুখে ছেড়ে দেবেন? আদালতের রায় ও পিতা-ক্ষমার পরিস্থিতি সব কিছু মাথায় রেখে অবশেষে বাবাকে সবটা জানিয়ে দেশেরই পক্ষে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। সাক্ষাতে বাবার কাছ থেকে তিনি সাহস পান; বাবা বলেন, “আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো, তুমি এখানে থাকো—পরিবারের জন্য তোমার থাকা দরকার।” সেই সিদ্ধান্ত থেকেই পরবর্তী ঘটনাগুলো ঘটে।
আয়নাঘরের দিনগুলি ও মুক্তি
বইটিতে আরমান গুম-পর্যায়, আটক থাকার সময়কার শারীরিক-মানসিক কষ্ট ও আইনি-মানবিক প্রেক্ষাপট বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন—নির্বাচিত সময়ে উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে তাকে তুলে নেওয়া হয় এবং দীর্ঘদিন কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলায় এবং তিনি আয়নাঘর থেকে মুক্তি পান—এই অভিজ্ঞতার বর্ণনাই মূলধারায় বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে।
লেখকের প্রতিপাদ্য ও প্রভাব
আরমানের লেখায় স্থান পেয়েছে ব্যক্তিগত বাস্তবতা, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার-প্রতিষ্ঠানের উদ্বেগের কথাও। তিনি বইয়ে জানান, বিদেশি ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা বিষয়টি নিয়ে সাড়া দিয়েছেন এবং এই ধরনের ঘটনার আন্তর্জাতিক দিকগুলোর প্রতিফলনও আছে। বইটি প্রকাশের পর থেকে প্রাসঙ্গিক আলোচনার খোরাক তৈরিতে ভূমিকা রাখছে—আইনি মহল, তথ্যমাধ্যম ও নাগরিক অংশগ্রহণকারীরা এর প্রতি নজর দিয়েছেন।
প্রকাশনা ও প্রাসঙ্গিকতা
‘আয়নাঘরের সাক্ষী: গুম জীবনের আট বছর’ গ্রন্থটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে এবং এতে আরমানের ব্যক্তিগত বিবরণ ও অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক তথ্য রয়েছে। বইটি দেশের রাজনৈতিক, আইনগত ও মানবাধিকার পরিবেশ সম্পর্কে তীব্র প্রশ্ন ও প্রতিফলন তোলে। প্রকাশনার সঙ্গে সঙ্গে এই বর্ণনা সংবাদমাধ্যমে উঠে আসায় পাঠক-চর্চা ও সমালোচনামূলক আলোচনা দেখা যাচ্ছে।
সংক্ষেপে, বইটিতে ব্যারিস্টার আরমানের যে দাবি ও বর্ণনা এসেছে—সেগুলো তিনি নিজের অভিজ্ঞতা ও সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এসব বিবরণ সমালোচনারও কেন্দ্রবিন্দু বটে; তবু বইটি দেশের বিচার ও মানবাধিকার সংক্রান্ত বিতর্কে একটি নতুন কণ্ঠ যুক্ত করেছে।
“মো: আল-আমিন
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চন্দ্রদ্বীপ নিউজ ২৪ ডট কম “