সিপিআর হতে পারে হার্ট অ্যাটাকের বিরুদ্বে মোক্ষম হাতিয়ার বাচতে পারে লাখো প্রাণ

চন্দ্রদ্বীপ নিউজ: দেশে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে (হৃদ্যন্ত্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া) মৃত্যুর হার ভয়াবহভাবে বাড়ছে। আক্রান্ত রোগীর জীবন বাঁচাতে প্রথম পাঁচ মিনিট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টায় আশপাশের সাধারণ মানুষ যদি সিপিআর (কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন) দিতে পারেন, তাহলে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। তাই সবাই যেন জরুরি মুহূর্তে ‘প্রথম পাঁচ মিনিটের ডাক্তার’ হয়ে উঠতে পারে। সামান্য একটি পদ্ধতি সিপিআর জানা থাকলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের লাখো প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কর্মস্থল সবখানে সিপিআর পদ্ধতির প্রশিক্ষণ ছড়িয়ে দেওয়া দরকার বলেও মত তাদের।
মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে সিপিআর প্রশিক্ষণ কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
সামরিক চিকিৎসা সার্ভিস মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএমএস) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল কাজী মো. রশিদ-উন-নবী বলেন, উন্নত দেশগুলোতে স্কুল লেভেলেই সিপিআর শেখানো হয়। কখন কার দরকার হবে, কেউ জানে না। সবাই সিপিআর জানলে অন্তত একজনকে বাঁচিয়ে ডাক্তারখানায় পাঠানোর সুযোগ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ডাক্তাররা ভুল করলে তা বলা অবশ্যই দরকার। কিন্তু তাদের কঠোর পরিশ্রম ও ভালো কাজগুলোও সংবাদে আসা উচিত। এতে স্বাস্থ্যকর্মীরা অনুপ্রাণিত হবেন, আর সমাজও সঠিক বার্তা পাবে। অনেক সময় আমরা ১০ মিনিটের সাক্ষাৎকার দিই, কিন্তু ৩০ সেকেন্ড কভার হয়, সেটাতেও শুধু নেতিবাচক অংশটাই তুলে ধরা হয়। সমাজে যখন ইতিবাচক সংবাদ থাকে, তখন মানুষ তেমন মনোযোগ দেয় না। অথচ ভালো খবর দিলে ডাক্তাররা স্বীকৃতি পাবেন, কাজে আরও উৎসাহী হবেন।
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মহসীন আহমেদ বলেন, হার্ট অ্যাটাক হয় রক্তনালীতে ব্লক হলে। এতে ব্যথা হয়, কিন্তু রোগী হাসপাতালে যাওয়ার সময় পান। অন্যদিকে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলো হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার মতো। তখন হার্ট থেমে যায়, পালস থাকে না, শ্বাস থাকে না। ৯–১০ মিনিটের মধ্যে মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি হয়। পৃথিবীতে এমন কোনো রোগ নেই যা পাঁচ মিনিটের মধ্যে জীবন কেড়ে নেয়। তাই সঙ্গে সঙ্গে সিপিআর শুরু করা ছাড়া বিকল্প নেই। হার্ট অ্যাটাক ধীরে ধীরে সময় দেয়, কিন্তু কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বিদ্যুতের মতো—এক মুহূর্তেই সব বন্ধ হয়ে যায়। তখন পাশে থাকা স্বামী, স্ত্রী, সন্তান বা সহকর্মীকেই ডাক্তার হয়ে উঠতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে তিনি চেইন অব সারভাইভাল’এর চারটি ধাপ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। প্রথম ধাপ, রোগী শনাক্ত করে সাহায্য চাওয়া। দ্বিতীয় ধাপ, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট নিশ্চিত হলে সিপিআর শুরু করা। তৃতীয় ধাপ, অন্তত ৩০ মিনিট ধরে সিপিআর চালিয়ে যাওয়া বা অ্যাম্বুলেন্সে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া। চতুর্থ ধাপ, হাসপাতালে পৌঁছে উন্নত চিকিৎসা শুরু করা। তার ভাষায়, সিপিআর মানে আসলে হার্টের পাম্পিং কাজটা হাতে করা—চাপ দেওয়া ও ছাড়ার মাধ্যমে ব্লাড সার্কুলেশন চালিয়ে যাওয়া।
তার মতে, স্কুল পাঠ্যক্রমে বিষয়টি যুক্ত করা জরুরি। এজন্য তিনি নবম শ্রেণির বইয়ে দুই পৃষ্ঠা সংযোজনের চেষ্টা করেছিলেন। তার বিশ্বাস, এর ফলে বাংলাদেশে বিশাল পরিবর্তন আসবে। বিদেশে স্কুলে স্কুলে সিপিআর শেখানো হয়। আমাদের ছেলে-মেয়েরা ইউটিউব দেখে অনেক কিছু শিখছে। পাঠ্যবইয়ে সিপিআর ঢুকিয়ে দিলে পুরো প্রজন্মই স্মার্ট হয়ে উঠবে, আশা প্রকাশ করেন তিনি।
হেলদি হার্ট হ্যাপি লাইফ অর্গানাইজেশনের সহযোগিতায় আয়োজিত কর্মশালায় আরও বক্তব্য রাখেন সিএমএইচ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের চিফ ফিজিশিয়ান জেনারেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অধ্যাপক ডা. সায়েদা আলেয়া সুলতানা, হেলদি হার্ট হ্যাপি লাইফ অর্গানাইজেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আবু রেজা মো. কাইয়ুম খান ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি রাশেদ রাব্বি। সিপিআর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মহসীন আহমেদ।








