বরিশাল অফিস: দেশের যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে নাচ-গান পরিবেশনটা বাঙালিদের কাছে রীতির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই নাচ-গানে সচরাচর বাঙালিরা অংশ নিয়ে হয়ে থাকে। তবে এবার এ ধরণের আয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের এক দম্পতি ও তাদের সন্তানরা বাংলা ভাষায় গান গাওয়ার পাশাপাশি বাংলা গানের সঙ্গে নাচও পরিবেশন করেন।
শনিবার (০৭ অক্টোবর) বরিশালের সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপক সাজ্জাদ পারভেজ জানান, প্রথমবারের মতো কোনো বিদেশি দম্পতি নিজ ইচ্ছায় আমাদের এ কেন্দ্রে এলো।
তিনি বলেন, বিদেশি এই পরিবারের আগমন ঘিরে করা ছোট আয়োজনকে তারাই প্রাণবন্ত করেছে। কারণ, ওই আয়োজনে আমাদের কেন্দ্রের মেয়েদের সঙ্গে তাদের পাঁচ সন্তানকে বসিয়ে বাংলায় গান গেয়েছেন জ্যাকব বার্লিন ও তার স্ত্রী জয়া বার্লিন। এছাড়া তার তিন কন্যা বাংলা গানের সঙ্গে একাধিক নৃত্যও পরিবেশন করেছে।
তিনি আরও বলেন, দুপুরের খাবারের সময় মেয়েদের সঙ্গে সময়ও কাটিয়েছেন জয়া বার্লিন। আর পুরো সময়টাতেই বার্লিন দম্পতি ও তাদের সন্তানেরা বাংলায় কথা বলেছেন। এছাড়া তারা শাড়ি ও পাঞ্জাবিসহ বাংলা পোশাক পড়েছেন। এতে আমরাসহ কেন্দ্রের মেয়েরা খুবই খুশি ও উচ্ছ্বাসিত হয়েছে।
জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ,কে,এম আখতারুজ্জামান তালুকদার বলেন, জ্যাকব বার্লিন ও জয়া বার্লিন দম্পতি পজিটিভ চিন্তাভাবনার মানুষ। ‘অ্যাকশন জয় এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিইও জয়া বার্লিন এবং জ্যাকব বার্লিন তার ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তারা অসহায়, দারিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্বাবলম্বী করার জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে সমন্বয় করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যার ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন এতিমখানা, সেইফ হোম, সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন জায়গাতে যাচ্ছে। এ কারণে পঞ্চম জেলা হিসেবে তারা বরিশালে এসেছেন। আমরা আশা করছি, যেসব ছেলে-মেয়েদের পুনর্বাসন করার সুযোগ ছিল না, তাদের সহযোগিতায় সেটা সম্ভব হবে।
এদিকে বরিশালে এসে বেশ উচ্ছ্বাসিত জ্যাকব বার্লিন ও জয়া বার্লিন দম্পতি এবং তাদের সন্তানেরা। জয়া বার্লিন বলেন, ২০১১ সালের দিকে আমার স্বামী বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালীতে কাজের জন্য এসেছিল। তখন আমি আমেরিকার আলাক্সায় থাকতাম। আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠানের পর বাংলাদেশে আবার আসি। ১০ বছর আগে আমি যখন এখানে আসি, তখন আমরা জানতাম তিনবছর পর দেশে চলে যাব। তখন একটি সেইফ হোমের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। সেখানে অনেক ট্রাফিক ওমেন থাকতো। তারা অনেক অসহায় ছিল। তাদের পাশে দাঁড়ানোর চিন্তাভাবনা থেকেই আবার কোভিডের পর বাংলাদেশে আসি।
তিনি বলেন, আমি যদি একদিন একজনের মুখে হাঁসি ফোটাতে পারি তাহলেই আমি সন্তুষ্টি পাব। আর তাই বর্তমান কাজটিকে খুব ভালোবাসি আমি। আমাদের মূলত কোন এনজিও নেই, এটা হচ্ছে আমার একটি সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ (সামাজিক উদ্যোগ)। এরমধ্যে আমার অনেক প্যাশন রয়েছে। আমি কোনো মেয়ের সামনে যখন দাঁড়াই, তখন আমি তাদের বলি, আমি আপনাদের কোনো সাহায্য করব না, কিন্তু আপনার পাশে দাঁড়াব। আমরা তাদের প্রশিক্ষণ দেব। প্রশিক্ষণের মধ্যে আমরা তাদের সুতা ও কাপড় দেব। যেখানে আঁকা-বাঁকা স্ট্রিচিং করে তারা কষ্ট-দুঃখ প্রকাশ করবে। এভাবেই একদিন তারা স্বাভাবিক জীবনে চলে আসবে।
জয়ার স্বামী জ্যাকব বার্লিন বলেন, বরিশালে ভ্রমণ করতে এসে আমি খুবই খুশি ও আনন্দিত। ২০১১ সালে আমি প্রথম বাংলাদেশে আসি এবং বরিশালের পটুয়াখালীতে তিন মাস ছিলাম। তখন আমি এখানকার গভীর প্রেমে পরেছি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে অনেক অসহায় ছেলে-মেয়ে ও নারী আছে। এর ফলে আমার বউয়ের সঙ্গে একটা পরিকল্পনা করেছি। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, আমরা একটি কোম্পানি বানান। যেখানে তারা হস্তশিল্প বানানোর মধ্য দিয়ে ভালো সম্মানী পাবে। প্রয়োজনে পণ্যগুলো আমেরিকায় রপ্তানি করব।
আমেরিকান এই দম্পতির সন্তানদের মধ্যে একমাত্র ছেলে আনন্দ বাংলাদেশকে ভালোবাসে জানিয়ে বলেন, এখানে আমার অনেক বন্ধু আছে। বরিশালে এসে এখানকার ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলেছি। আর মেয়ে হাসি জানান, তিনি বাংলা গানের সঙ্গে নাচতে বেশি ভালোবাসেন।